ঢাকা ০১:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সার সংকটে বিপাকে কৃষক

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:০২:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
  • ২ Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক : সারাদেশের কৃষকেরা এখন আমন ধানের জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই দেশের বিভিন্ন জেলায় দেখা দিয়েছে সারের তীব্র সংকট। কৃষকদের অভিযোগ, অসাধু ডিলার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে বাজারে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সংকট।

 

অতিরিক্ত টাকা না দিলে মিলছে না প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমনের উৎপাদনে। এ ছাড়া অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কারসাজিতে কৃষকের গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। তারপরও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছে না কৃষক। সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে কৃষকরা অনেক স্থানে আন্দোলন করছে। এর মধ্যে গত ১০ আগস্ট সার না পাওয়ার অভিযোগে লালমনিরহাটে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে কয়েক হাজার কৃষক। তারা জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যে প্রতি বস্তা টিএসপি সার ১ হাজার ৩৫০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে তা ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

ডিএপি সারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও তা ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা। কুষ্টিয়ায় কৃষকরা সারের তীব্র সঙ্কট ও চড়া দামে বিপাকে পড়েছেন। কৃষকদের স্পষ্ট অভিযোগ, ডিলাররা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি হাতিয়ে নিচ্ছেন। যদিও ডিলাররা সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করছেন, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করছেন। অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে রাজশাহী, কুমিল্লাসহ আরও কয়েকটি জেলায়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। তবুও মাঠপর্যায়ে অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা চাহিদামত সার পাচ্ছে না। কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ বলছে যে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

 

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসাধু ব্যবসায়ী চক্র কৃত্রিমভাবে সারের সঙ্কট তৈরী করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। এটি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর আগে ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশে সারের দাবিতে আন্দোলন ও বিক্ষোভ করতে গিয়ে গাইবান্ধা ও উত্তর অঞ্চলে পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ১৮জন কৃষক নিহত হয়েছিল। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও সারের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের প্রাণ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সব বিষয় বিবেচনায় রেখে সারের কৃত্রিম সঙ্কট নিরসনে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবেবলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশে বর্তমানে সারের কোনো ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তবে একটি মহল সার সঙ্কটের রিউমার ছড়াচ্ছে। সারের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং ন্যায্য মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে। বিষয়টি সরকার কঠোরভাবে নজরদারি করছে।

সার সঙ্কটের সার্বিক চিত্র নিয়ে আমাদের সংবাদদাতাদের পাঠানো রিপোর্ট নিচে তুলে ধরা হলো।

রাজশাহী থেকে রেজাউল করিম রাজু জানান, বৃষ্টি ও সেচের পানি দিয়ে রাজশাহী অঞ্চলে চলছে রোপা আমন আবাদ। রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলায় চারলাখ বারো হাজার হেক্টর জমির আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চলছে আমন আবাদের কার্যক্রম। এরমধ্যে রাজশাহীতে চুরাশি হাজার আড়াইশো হেক্টর, নওগায় একলাখ ছিয়ানব্বই হেক্টর, চাপাইনবাবগঞ্জে সাড়ে চুয়ান্ন গাজার হেক্টর ও নাটোরে সাড়ে ছিয়ানব্বই হাজার হেক্টর জমিতে। এ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে।

আমন মৌসুমে সরকারি বরাদ্দ বাড়িয়েও কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। তবে অনুমোদিত ডিলাররা দাবি করছেন, সরবরাহ পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ অনুমোদিত ডিলারের কাছে ভর্তুকির সার পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা বিক্রেতারা প্রকাশ্যে চড়া দামে সেই একই সার বিক্রি করছে।

সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ট্রিপল সুপার ফসফেট বা টিএসপি ১৩৫০ টাকায় এবং ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি ১০৫০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে কৃষকরা বলেছেন, অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে সরবরাহ না পাওয়ায় তারা টিএসপির জন্য ১৭০০-১৮০০ টাকা এবং ডিএপির জন্য প্রায় ১৬০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা দোকান খোলার অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মজুত শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়ে দিচ্ছেন। এবং তারা ক্যাশ মেমো দিতে অস্বীকার করছেন। নওহাটা বাজারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজে কোনো ভর্তুকির সার পাওয়া যায়নি। দোকান মালিক ও ডিলার আব্দুল হক বলেন, ৪২টি মৌজাজুড়ে কয়েক হাজার কৃষককে সার সরবরাহ করতে হচ্ছে। জুলাই মাসে মাত্র ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা মিউরেট অফ পটাশ বা এমওপি এবং ১১০ বস্তা ডিএপি পেয়েছেন। এই সার দুই তিনদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।

বগুড়া থেকে মহসিন রাজু জানান, আমন মৌসুম শুরু হতেই বগুড়ার কৃষকদের মধ্যে সার পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ধানের চারা রোপণ ও পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার সময়মতো না পাওয়া গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি সারের সরবরাহ ও বাজারদর নিয়ে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। গত আমন মৌসুমেও বগুড়ায় সার নিয়ে সংকটের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জেলার প্রায় ৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ এবং চাহিদার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির ডিলারের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। বগুড়ার আমন চাষীদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দামে ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে তাদের খোলা বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আবার অনেক সময় দোকানে সার থাকলেও চাহিদামতো না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গত বছর বগুড়ায় ডিএপি সার নিয়েও সংকট ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল।

 

এদিকে চলতি বর্ষা মৌসুমে বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত জেলার প্রায় ৪০০ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় ৪ হাজার ৯৬১ জন কৃষক। একই সময়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে আমনের বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে আমন আবাদে নামার সময় যদি সারের সরবরাহে সমস্যা হয়, তাহলে তাদের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে। তাই উপজেলা পর্যায়ে ডিলারদের গুদাম পরিদর্শন, বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন ও বিক্রির হিসাব যাচাই এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আমন মৌসুমে সারের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কোথাও সংকট দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। বগুড়ার কৃষকরা বলছেন, ধানের উৎপাদন ঠিক রাখতে শুধু সার বরাদ্দ দিলেই হবে না; সেই সার যেন প্রকৃত কৃষকের হাতে নির্ধারিত দামে পৌঁছায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কুষ্টিয়া থেকে এস এম আলী আহসান পান্না জানান, আমন আবাদের শুরুতেই কুষ্টিয়ায় সারের তীব্র সংকট ও চড়া দামে চরম বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজিপ্রতি পাঁচ থেকে নয় টাকা বেশি দামে সার বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ইউরিয়া, টিএসপি এবং এমওপি বা পটাশ সারের ক্ষেত্রে ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।

 

সার কিনতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা। আমন চাষি সাঈদ হাসানের অভিযোগ, ডিলাররা দোকানে সার না থাকার অজুহাত দেখিয়ে কৃষকদের দিনের পর দিন ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অথচ রাতের আঁধারে সেই সার বেশি দামে ভ্যানে করে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার ন্যায্যমূল্যে সার দেওয়ার কথা বললেও ডিলারদের কারসাজিতে এক কেজি ঢ্যাপ কিনতে ২৫ টাকা এবং সার কিনতে ৪০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।

অতিরিক্ত দামের বিষয়ে খুচরা বিক্রেতারা সরাসরি দুষছেন ডিলারদের। খুচরা সার বিক্রেতা তপন জানান, ডিলাররা সারের অপ্রতুলতার কথা বলে প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে সার সংগ্রহ করার কারণেই তারা বাধ্য হয়ে কৃষকদের কাছে বাড়তি দামে তা বিক্রি করছেন।

 

তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ সার ডিলাররা। তাদের দাবি, সরকার নির্ধারিত মূল্যেই সার বিক্রি করা হচ্ছে। সার ডিলার শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতি বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি ১২৫০ টাকা, ডিএপি ৯৫০ টাকা এবং এমওপি ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর সাথে ১০০ টাকা পরিবহন খরচ যুক্ত থাকে। তার মতে, খুচরা বিক্রেতারা অনেক সময় কৃষকদের কাছে বাকিতে সার বিক্রি করেন এবং ছয় মাস বা এত বছর পর ফসল উঠলে টাকা নেন। মূলত এই বকেয়া বিক্রির কারণেই খুচরা বিক্রেতারা কেজিতে ২-৩ টাকা বেশি নিচ্ছেন।

 

মাঠ পর্যায়ে সারের এই নৈরাজ্য চললেও স্থানীয় কৃষি বিভাগের কাছে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান জানান, সারের দাম বেশি নেওয়ার বিষয়টি তারা সদ্য অবগত হয়েছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত করে ডিলার ও সাব-ডিলারদের কার্যক্রমের সত্যতা যাচাই করে দেখা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

কুমিল্লা থেকে সাদিক মামুন জানান, চলতি আমন মৌসুমে কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় হঠাৎ করেই সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলার। সরকারিভাবে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। অসাধু চক্রের এই অপতৎপরতা শুধু কৃষকদেরই সংকটে ফেলছে না, বরং কৃষি খাতে সরকারের বড় সাফল্য এবং ভাবমর্যাদা নষ্ট করার একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লার বুড়িচং, দেবিদ্বার, চান্দিনা ও আদর্শ সদর উপজেলার বিভিন্ন বাজারে টিএসপি (ঞঝচ), ডিএপি (উঅচ) এবং ইউরিয়া সারের জন্য কৃষকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও খুচরা বাজারে তা অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ডিলাররা কাগজ-কলমে মজুত শেষ দেখালেও গোপনে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বেশি দামে সার পাচার করে দিচ্ছেন, যা পরে চড়া দামে সাধারণ কৃষকদের কিনতে হচ্ছে। সম্প্রতি সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দাম রোধে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া, গত ১৬ জুলাই অধিক দামে সার বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কুমিল্লার নিমসার বাজারের বিসিআইসি সার ডিলার শিমু এন্টারপ্রাইজকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। যা সারের বাজারে সিন্ডিকেটের উপস্থিতির বড় প্রমাণ বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এদিকে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কুমিল্লা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।

লালমনিরহাট জেলা সংবাদদাতা জানান, আমন মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার না পাওয়ার অভিযোগে গত ১০ আগস্ট লালমনিরহাটে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কয়েক হাজার কৃষক। আন্দোলনকারী কৃষকদের অভিযোগ, আমন চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সার সরকার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলারদের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সার না মিললেও খুচরা দোকানে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। কৃষকেরা জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যে প্রতি বস্তা টিএসপি সার ১ হাজার ৩৫০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে তা ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ডিএপি সারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও তা ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে রাসায়নিক সার সংকটের প্রতিবাদে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ করেছেন রহনপুর ইউনিয়নের কৃষকেরা। গতকাল বুধবার সকালে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা উপজেলা পরিষদে এসে বিক্ষোভ করেন। পরে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিল্লুর রহমানের কাছে সার সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।

কৃষকেরা জানান, আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফসলের উৎপাদন নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাদের দাবি, সার নিয়ে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার সরবরাহ এবং নির্ধারিত মূল্যে সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) উম্মে সালমা রুমা, রহনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সদস্য ও স্থানীয় কৃষকেরা উপস্থিত ছিলেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

কুয়াকাটায় সাগরে জালে উঠলো বিরল কাঁকড়া, দেখে অবাক জেলেরা

সার সংকটে বিপাকে কৃষক

Update Time : ০৫:০২:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : সারাদেশের কৃষকেরা এখন আমন ধানের জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই দেশের বিভিন্ন জেলায় দেখা দিয়েছে সারের তীব্র সংকট। কৃষকদের অভিযোগ, অসাধু ডিলার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে বাজারে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সংকট।

 

অতিরিক্ত টাকা না দিলে মিলছে না প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমনের উৎপাদনে। এ ছাড়া অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কারসাজিতে কৃষকের গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। তারপরও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছে না কৃষক। সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে কৃষকরা অনেক স্থানে আন্দোলন করছে। এর মধ্যে গত ১০ আগস্ট সার না পাওয়ার অভিযোগে লালমনিরহাটে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে কয়েক হাজার কৃষক। তারা জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যে প্রতি বস্তা টিএসপি সার ১ হাজার ৩৫০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে তা ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

ডিএপি সারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও তা ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা। কুষ্টিয়ায় কৃষকরা সারের তীব্র সঙ্কট ও চড়া দামে বিপাকে পড়েছেন। কৃষকদের স্পষ্ট অভিযোগ, ডিলাররা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি হাতিয়ে নিচ্ছেন। যদিও ডিলাররা সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করছেন, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করছেন। অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে রাজশাহী, কুমিল্লাসহ আরও কয়েকটি জেলায়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। তবুও মাঠপর্যায়ে অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা চাহিদামত সার পাচ্ছে না। কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ বলছে যে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

 

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসাধু ব্যবসায়ী চক্র কৃত্রিমভাবে সারের সঙ্কট তৈরী করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। এটি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর আগে ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশে সারের দাবিতে আন্দোলন ও বিক্ষোভ করতে গিয়ে গাইবান্ধা ও উত্তর অঞ্চলে পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ১৮জন কৃষক নিহত হয়েছিল। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও সারের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের প্রাণ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সব বিষয় বিবেচনায় রেখে সারের কৃত্রিম সঙ্কট নিরসনে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবেবলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশে বর্তমানে সারের কোনো ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তবে একটি মহল সার সঙ্কটের রিউমার ছড়াচ্ছে। সারের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে এবং ন্যায্য মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে। বিষয়টি সরকার কঠোরভাবে নজরদারি করছে।

সার সঙ্কটের সার্বিক চিত্র নিয়ে আমাদের সংবাদদাতাদের পাঠানো রিপোর্ট নিচে তুলে ধরা হলো।

রাজশাহী থেকে রেজাউল করিম রাজু জানান, বৃষ্টি ও সেচের পানি দিয়ে রাজশাহী অঞ্চলে চলছে রোপা আমন আবাদ। রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলায় চারলাখ বারো হাজার হেক্টর জমির আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চলছে আমন আবাদের কার্যক্রম। এরমধ্যে রাজশাহীতে চুরাশি হাজার আড়াইশো হেক্টর, নওগায় একলাখ ছিয়ানব্বই হেক্টর, চাপাইনবাবগঞ্জে সাড়ে চুয়ান্ন গাজার হেক্টর ও নাটোরে সাড়ে ছিয়ানব্বই হাজার হেক্টর জমিতে। এ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে।

আমন মৌসুমে সরকারি বরাদ্দ বাড়িয়েও কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। তবে অনুমোদিত ডিলাররা দাবি করছেন, সরবরাহ পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ অনুমোদিত ডিলারের কাছে ভর্তুকির সার পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা বিক্রেতারা প্রকাশ্যে চড়া দামে সেই একই সার বিক্রি করছে।

সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ট্রিপল সুপার ফসফেট বা টিএসপি ১৩৫০ টাকায় এবং ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি ১০৫০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে কৃষকরা বলেছেন, অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে সরবরাহ না পাওয়ায় তারা টিএসপির জন্য ১৭০০-১৮০০ টাকা এবং ডিএপির জন্য প্রায় ১৬০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা দোকান খোলার অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মজুত শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়ে দিচ্ছেন। এবং তারা ক্যাশ মেমো দিতে অস্বীকার করছেন। নওহাটা বাজারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজে কোনো ভর্তুকির সার পাওয়া যায়নি। দোকান মালিক ও ডিলার আব্দুল হক বলেন, ৪২টি মৌজাজুড়ে কয়েক হাজার কৃষককে সার সরবরাহ করতে হচ্ছে। জুলাই মাসে মাত্র ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা মিউরেট অফ পটাশ বা এমওপি এবং ১১০ বস্তা ডিএপি পেয়েছেন। এই সার দুই তিনদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।

বগুড়া থেকে মহসিন রাজু জানান, আমন মৌসুম শুরু হতেই বগুড়ার কৃষকদের মধ্যে সার পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ধানের চারা রোপণ ও পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার সময়মতো না পাওয়া গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি সারের সরবরাহ ও বাজারদর নিয়ে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। গত আমন মৌসুমেও বগুড়ায় সার নিয়ে সংকটের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জেলার প্রায় ৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ এবং চাহিদার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির ডিলারের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। বগুড়ার আমন চাষীদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দামে ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে তাদের খোলা বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আবার অনেক সময় দোকানে সার থাকলেও চাহিদামতো না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গত বছর বগুড়ায় ডিএপি সার নিয়েও সংকট ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল।

 

এদিকে চলতি বর্ষা মৌসুমে বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত জেলার প্রায় ৪০০ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় ৪ হাজার ৯৬১ জন কৃষক। একই সময়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে আমনের বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে আমন আবাদে নামার সময় যদি সারের সরবরাহে সমস্যা হয়, তাহলে তাদের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে। তাই উপজেলা পর্যায়ে ডিলারদের গুদাম পরিদর্শন, বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন ও বিক্রির হিসাব যাচাই এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আমন মৌসুমে সারের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কোথাও সংকট দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। বগুড়ার কৃষকরা বলছেন, ধানের উৎপাদন ঠিক রাখতে শুধু সার বরাদ্দ দিলেই হবে না; সেই সার যেন প্রকৃত কৃষকের হাতে নির্ধারিত দামে পৌঁছায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কুষ্টিয়া থেকে এস এম আলী আহসান পান্না জানান, আমন আবাদের শুরুতেই কুষ্টিয়ায় সারের তীব্র সংকট ও চড়া দামে চরম বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজিপ্রতি পাঁচ থেকে নয় টাকা বেশি দামে সার বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ইউরিয়া, টিএসপি এবং এমওপি বা পটাশ সারের ক্ষেত্রে ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।

 

সার কিনতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা। আমন চাষি সাঈদ হাসানের অভিযোগ, ডিলাররা দোকানে সার না থাকার অজুহাত দেখিয়ে কৃষকদের দিনের পর দিন ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অথচ রাতের আঁধারে সেই সার বেশি দামে ভ্যানে করে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার ন্যায্যমূল্যে সার দেওয়ার কথা বললেও ডিলারদের কারসাজিতে এক কেজি ঢ্যাপ কিনতে ২৫ টাকা এবং সার কিনতে ৪০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।

অতিরিক্ত দামের বিষয়ে খুচরা বিক্রেতারা সরাসরি দুষছেন ডিলারদের। খুচরা সার বিক্রেতা তপন জানান, ডিলাররা সারের অপ্রতুলতার কথা বলে প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে সার সংগ্রহ করার কারণেই তারা বাধ্য হয়ে কৃষকদের কাছে বাড়তি দামে তা বিক্রি করছেন।

 

তবে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ সার ডিলাররা। তাদের দাবি, সরকার নির্ধারিত মূল্যেই সার বিক্রি করা হচ্ছে। সার ডিলার শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতি বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি ১২৫০ টাকা, ডিএপি ৯৫০ টাকা এবং এমওপি ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর সাথে ১০০ টাকা পরিবহন খরচ যুক্ত থাকে। তার মতে, খুচরা বিক্রেতারা অনেক সময় কৃষকদের কাছে বাকিতে সার বিক্রি করেন এবং ছয় মাস বা এত বছর পর ফসল উঠলে টাকা নেন। মূলত এই বকেয়া বিক্রির কারণেই খুচরা বিক্রেতারা কেজিতে ২-৩ টাকা বেশি নিচ্ছেন।

 

মাঠ পর্যায়ে সারের এই নৈরাজ্য চললেও স্থানীয় কৃষি বিভাগের কাছে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান জানান, সারের দাম বেশি নেওয়ার বিষয়টি তারা সদ্য অবগত হয়েছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত করে ডিলার ও সাব-ডিলারদের কার্যক্রমের সত্যতা যাচাই করে দেখা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

কুমিল্লা থেকে সাদিক মামুন জানান, চলতি আমন মৌসুমে কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় হঠাৎ করেই সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলার। সরকারিভাবে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। অসাধু চক্রের এই অপতৎপরতা শুধু কৃষকদেরই সংকটে ফেলছে না, বরং কৃষি খাতে সরকারের বড় সাফল্য এবং ভাবমর্যাদা নষ্ট করার একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লার বুড়িচং, দেবিদ্বার, চান্দিনা ও আদর্শ সদর উপজেলার বিভিন্ন বাজারে টিএসপি (ঞঝচ), ডিএপি (উঅচ) এবং ইউরিয়া সারের জন্য কৃষকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও খুচরা বাজারে তা অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ডিলাররা কাগজ-কলমে মজুত শেষ দেখালেও গোপনে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বেশি দামে সার পাচার করে দিচ্ছেন, যা পরে চড়া দামে সাধারণ কৃষকদের কিনতে হচ্ছে। সম্প্রতি সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দাম রোধে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া, গত ১৬ জুলাই অধিক দামে সার বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কুমিল্লার নিমসার বাজারের বিসিআইসি সার ডিলার শিমু এন্টারপ্রাইজকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। যা সারের বাজারে সিন্ডিকেটের উপস্থিতির বড় প্রমাণ বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এদিকে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কুমিল্লা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।

লালমনিরহাট জেলা সংবাদদাতা জানান, আমন মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার না পাওয়ার অভিযোগে গত ১০ আগস্ট লালমনিরহাটে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কয়েক হাজার কৃষক। আন্দোলনকারী কৃষকদের অভিযোগ, আমন চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সার সরকার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলারদের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সার না মিললেও খুচরা দোকানে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। কৃষকেরা জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যে প্রতি বস্তা টিএসপি সার ১ হাজার ৩৫০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে তা ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ডিএপি সারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও তা ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে রাসায়নিক সার সংকটের প্রতিবাদে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ করেছেন রহনপুর ইউনিয়নের কৃষকেরা। গতকাল বুধবার সকালে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা উপজেলা পরিষদে এসে বিক্ষোভ করেন। পরে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিল্লুর রহমানের কাছে সার সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।

কৃষকেরা জানান, আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফসলের উৎপাদন নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাদের দাবি, সার নিয়ে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার সরবরাহ এবং নির্ধারিত মূল্যে সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) উম্মে সালমা রুমা, রহনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সদস্য ও স্থানীয় কৃষকেরা উপস্থিত ছিলেন।