ঢাকা ১২:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৬ বিঘা জমিতে আবাদ : পানির ভয়াবহ সংকটে কলাপাড়ার ধান চাষিরা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৫৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
  • ৮৭ Time View
১২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরাবরের মতো এ বছরও ১৬ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন কৃষক নির্মল চন্দ্র মিস্ত্রি (৫০)। চারাগুলো লকলক করে বেড়ে উঠছে। গোটা মাঠটি গাঢ় সবুজের আস্তরণে পরিণত হয়েছে। বাম্পার ফলনের আশায় দিন গুনছেন নির্মল চন্দ্র। এখন পর্যন্ত তার প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে অন্তত ৪০০ মণ ধান পাওয়ার আশা পোষণ করছেন এই কৃষক। কিন্তু তাকে এখন সেচ সংকটের আশঙ্কা প্রবলভাবে শঙ্কিত করে তুলেছে।

শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সংলগ্ন পাখিমারার খাল থেকে পানি সেচ দিয়েছেন। কিন্তু এখন খালের পানি তলদেশে পৌঁছেছে। শেষ পর্যন্ত পানি থাকবে কি না তা নিয়ে মহাঅনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তারপরও যতটুক পানি আছে তা আবার অপর গ্রাম এলেমপুরের কৃষক অসংখ্য পাম্প লাগিয়ে তাদের খালে নিয়ে যাচ্ছে। এটিও তাকে আরেক দফা শঙ্কায় ফেলেছে।

একই শঙ্কায় রয়েছেন গ্রামটির মুকুল মৃধা। তিনি চাষ করেছেন ৬ বিঘা জমিতে। নয়ন হাওলাদার আবাদ করেছেন ৮ বিঘা জমি। সুখ কুলু ৪ বিঘা ও মহাদেব হাওলাদার ১০ বিঘায় বেরোর (হাইব্রিড) আবাদ করেছেন। সবার শঙ্কা শেষ পর্যন্ত সেচের পানি থাকবে কি না। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নেয়ামতপুর গ্রামের অধিকাংশ বোরো চাষি এখন পানির সংকটের শঙ্কায় রয়েছেন। বোরোর ফলন শেষ পর্যন্ত ঘরে তোলা নিয়ে তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বোরোর ফসল নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এলেমপুর গ্রামের চাষিরা। তাদের খালটিতে এক ফোঁটা পানিও নেই। পানি নিয়ে যেন কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছে।

সবজিসহ কৃষি আবাদের হাবখ্যাত নীলগঞ্জ ইউনিয়নের চাষিদের সেচ দেওয়ার মতো সবচেয়ে বড় মিঠা পানির জলাধার পাখিমারার দীর্ঘ খালটি। এই খালের পানি এখন আছে তলদেশে। খালটির পঞ্চায়েত বাড়ির বাঁধের পূর্ব-উত্তরদিকের প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ শুকিয়ে গেছে। পানি আগেই এলেমপুর গ্রামের কৃষকরা সবজি ও বোরোর খেতে সেচ দিয়েছেন। এখন সংকট কিছুটা লাঘব করতে পাখিমারা খালের পশ্চিম অংশ থেকে শুক্রবার হতে ১২টি পাম্প লাগিয়ে পানি নেওয়া হচ্ছে তাদের অংশে। এই কাজে তদারকি করা কৃষক সাইফুল ইসলাম জানালেন, তাদের গ্রামের কম করে হলেও অন্তত ৫০-৬০ কানি (প্রায় ৫০০ বিঘা) জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়েছে। তিনিও করেছেন ৫ বিঘায়।

 

কিন্তু খালে এখন এক ফোঁটাও পানি নাই। তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) পারমিশন নিয়ে খালের এক পাশের পানি তাদের অংশে নিচ্ছেন। সাইফুল জানান, যেখান থেকে পানি নেওয়া হচ্ছে তা দিতে অসম্মতি ছিল কুমিরমারা ও নেয়ামতপুরের কৃষকের। কারণ তাদের খেতে সেচ সমস্যা হতে পারে তাই তারা বাধা দেয়। তাই বিরোধের কারণে উপজেলা থেকে পারমিশন নিয়েছেন। খালের যতটুকু (৮-৫ ফুট) পানি যা আছে তার থেকে এক-দেড় ফুট পানি তারা নিবেন বলে জানালেন। এ পানিতে কতটুকু সেচ সংকট মিটবে তা জানেন না অধিকাংশ কৃষক।

 

এভাবে পাখিমারা খালের দুই পাড়ের পাঁচ গ্রামের চাষিরা এ বছর বোরোর আবাদ ঘরে তোলা নিয়ে আগাম সেচ সংকটের শঙ্কায় মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন। এলেমপুর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে অধিকাংশ খেতে কৃষকরা আগেভাগেই খাল থেকে পাম্প লাগিয়ে সম্পূর্ণ পানি খেতে দিয়ে রেখেছেন। বোরোর খেতে এক-তিন ইঞ্চি পর্যন্ত পানি রয়েছে। অনেকে আবার পুকুর ডোবায় পানি সংরক্ষণ করেছেন।

দেড় বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন কৃষক দেলোয়ার হোসেন। তিনি গ্রামেই দোকান করেন। জানালেন, সংলগ্ন হুআইর‌্যার খালটি শুকিয়ে গেছে। ফেটে চৌচির হয়ে আছে। আগেভাগেই এই কৃষক একটি ডোবায় পানি মজুদ করেছেন। দেলোয়ার জানালেন, অনেক বলে-কয়ে সবাই চাঁদা তুলে এখন পাখিমারার বড় খাল থেকে কিছু পানি আনছেন। কারেন্ট খরচ বাবদ কমবেশি টাকা দিয়েছেন। ভরসা ওই পানি। তারপরও বৃষ্টি না হলে বোরোর ফলন ঘরে তোলা নিয়ে সবাই মহাঅনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এভাবে সেচ সংকটের কারণে পাঁচটি গ্রামের সহ¯্রাধিক বোরো চাষির এ বছর ফসল ঘরে তোলা নিয়ে মহাঅনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে অধিকাংশ কৃষকের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নাহিদ হাসান জানান, এ বছর কলাপাড়ায় পাঁচ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। যেখানে গত বছর আবাদ হয়েছিল ৩৩৮০ হেক্টরে। চাষির সংখ্যা অন্তত সাত হাজার। এ বছর সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে নীলগঞ্জ ইউনিয়নে। সেখানকার কৃষকরা কোনো ধরনের চিন্তা ধারণা ছাড়াই আবাদ করেছেন। খালে যে পরিমাণ পানি ছিল তাতে যতটুকু জমিতে বোরোর আবাদ করা যাবে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি জমিতে আবাদ করেছেন।

ফলে ফলন মার খাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, বোরোর আবাদকাল প্রায় ১৫০ দিন। তাতে এখনো ফলন ঘরে তুলতে আরও ৪০-৫০ দিন সময় লাগবে। তাতে বৃষ্টি না হলে রিস্ক থেকেই যাবে। কৃষকরা পরিকল্পনা ছাড়াই এ বছর নীলগঞ্জে বোরোর বেশি আবাদ করেছে। তারপরও যতটুকু পানি সংরক্ষণ আছে তা ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য একটা শৃঙ্খল নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, কৃষকের সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে সেচের পানি নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি না হয় এমন নির্দেশনা রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

পটুয়াখালীতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বেগম জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী পালিত

১৬ বিঘা জমিতে আবাদ : পানির ভয়াবহ সংকটে কলাপাড়ার ধান চাষিরা

Update Time : ০২:৫৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
১২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরাবরের মতো এ বছরও ১৬ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন কৃষক নির্মল চন্দ্র মিস্ত্রি (৫০)। চারাগুলো লকলক করে বেড়ে উঠছে। গোটা মাঠটি গাঢ় সবুজের আস্তরণে পরিণত হয়েছে। বাম্পার ফলনের আশায় দিন গুনছেন নির্মল চন্দ্র। এখন পর্যন্ত তার প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে অন্তত ৪০০ মণ ধান পাওয়ার আশা পোষণ করছেন এই কৃষক। কিন্তু তাকে এখন সেচ সংকটের আশঙ্কা প্রবলভাবে শঙ্কিত করে তুলেছে।

শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সংলগ্ন পাখিমারার খাল থেকে পানি সেচ দিয়েছেন। কিন্তু এখন খালের পানি তলদেশে পৌঁছেছে। শেষ পর্যন্ত পানি থাকবে কি না তা নিয়ে মহাঅনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তারপরও যতটুক পানি আছে তা আবার অপর গ্রাম এলেমপুরের কৃষক অসংখ্য পাম্প লাগিয়ে তাদের খালে নিয়ে যাচ্ছে। এটিও তাকে আরেক দফা শঙ্কায় ফেলেছে।

একই শঙ্কায় রয়েছেন গ্রামটির মুকুল মৃধা। তিনি চাষ করেছেন ৬ বিঘা জমিতে। নয়ন হাওলাদার আবাদ করেছেন ৮ বিঘা জমি। সুখ কুলু ৪ বিঘা ও মহাদেব হাওলাদার ১০ বিঘায় বেরোর (হাইব্রিড) আবাদ করেছেন। সবার শঙ্কা শেষ পর্যন্ত সেচের পানি থাকবে কি না। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নেয়ামতপুর গ্রামের অধিকাংশ বোরো চাষি এখন পানির সংকটের শঙ্কায় রয়েছেন। বোরোর ফলন শেষ পর্যন্ত ঘরে তোলা নিয়ে তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বোরোর ফসল নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এলেমপুর গ্রামের চাষিরা। তাদের খালটিতে এক ফোঁটা পানিও নেই। পানি নিয়ে যেন কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছে।

সবজিসহ কৃষি আবাদের হাবখ্যাত নীলগঞ্জ ইউনিয়নের চাষিদের সেচ দেওয়ার মতো সবচেয়ে বড় মিঠা পানির জলাধার পাখিমারার দীর্ঘ খালটি। এই খালের পানি এখন আছে তলদেশে। খালটির পঞ্চায়েত বাড়ির বাঁধের পূর্ব-উত্তরদিকের প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ শুকিয়ে গেছে। পানি আগেই এলেমপুর গ্রামের কৃষকরা সবজি ও বোরোর খেতে সেচ দিয়েছেন। এখন সংকট কিছুটা লাঘব করতে পাখিমারা খালের পশ্চিম অংশ থেকে শুক্রবার হতে ১২টি পাম্প লাগিয়ে পানি নেওয়া হচ্ছে তাদের অংশে। এই কাজে তদারকি করা কৃষক সাইফুল ইসলাম জানালেন, তাদের গ্রামের কম করে হলেও অন্তত ৫০-৬০ কানি (প্রায় ৫০০ বিঘা) জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়েছে। তিনিও করেছেন ৫ বিঘায়।

 

কিন্তু খালে এখন এক ফোঁটাও পানি নাই। তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) পারমিশন নিয়ে খালের এক পাশের পানি তাদের অংশে নিচ্ছেন। সাইফুল জানান, যেখান থেকে পানি নেওয়া হচ্ছে তা দিতে অসম্মতি ছিল কুমিরমারা ও নেয়ামতপুরের কৃষকের। কারণ তাদের খেতে সেচ সমস্যা হতে পারে তাই তারা বাধা দেয়। তাই বিরোধের কারণে উপজেলা থেকে পারমিশন নিয়েছেন। খালের যতটুকু (৮-৫ ফুট) পানি যা আছে তার থেকে এক-দেড় ফুট পানি তারা নিবেন বলে জানালেন। এ পানিতে কতটুকু সেচ সংকট মিটবে তা জানেন না অধিকাংশ কৃষক।

 

এভাবে পাখিমারা খালের দুই পাড়ের পাঁচ গ্রামের চাষিরা এ বছর বোরোর আবাদ ঘরে তোলা নিয়ে আগাম সেচ সংকটের শঙ্কায় মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন। এলেমপুর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে অধিকাংশ খেতে কৃষকরা আগেভাগেই খাল থেকে পাম্প লাগিয়ে সম্পূর্ণ পানি খেতে দিয়ে রেখেছেন। বোরোর খেতে এক-তিন ইঞ্চি পর্যন্ত পানি রয়েছে। অনেকে আবার পুকুর ডোবায় পানি সংরক্ষণ করেছেন।

দেড় বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন কৃষক দেলোয়ার হোসেন। তিনি গ্রামেই দোকান করেন। জানালেন, সংলগ্ন হুআইর‌্যার খালটি শুকিয়ে গেছে। ফেটে চৌচির হয়ে আছে। আগেভাগেই এই কৃষক একটি ডোবায় পানি মজুদ করেছেন। দেলোয়ার জানালেন, অনেক বলে-কয়ে সবাই চাঁদা তুলে এখন পাখিমারার বড় খাল থেকে কিছু পানি আনছেন। কারেন্ট খরচ বাবদ কমবেশি টাকা দিয়েছেন। ভরসা ওই পানি। তারপরও বৃষ্টি না হলে বোরোর ফলন ঘরে তোলা নিয়ে সবাই মহাঅনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এভাবে সেচ সংকটের কারণে পাঁচটি গ্রামের সহ¯্রাধিক বোরো চাষির এ বছর ফসল ঘরে তোলা নিয়ে মহাঅনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে অধিকাংশ কৃষকের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নাহিদ হাসান জানান, এ বছর কলাপাড়ায় পাঁচ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। যেখানে গত বছর আবাদ হয়েছিল ৩৩৮০ হেক্টরে। চাষির সংখ্যা অন্তত সাত হাজার। এ বছর সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে নীলগঞ্জ ইউনিয়নে। সেখানকার কৃষকরা কোনো ধরনের চিন্তা ধারণা ছাড়াই আবাদ করেছেন। খালে যে পরিমাণ পানি ছিল তাতে যতটুকু জমিতে বোরোর আবাদ করা যাবে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি জমিতে আবাদ করেছেন।

ফলে ফলন মার খাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, বোরোর আবাদকাল প্রায় ১৫০ দিন। তাতে এখনো ফলন ঘরে তুলতে আরও ৪০-৫০ দিন সময় লাগবে। তাতে বৃষ্টি না হলে রিস্ক থেকেই যাবে। কৃষকরা পরিকল্পনা ছাড়াই এ বছর নীলগঞ্জে বোরোর বেশি আবাদ করেছে। তারপরও যতটুকু পানি সংরক্ষণ আছে তা ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য একটা শৃঙ্খল নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, কৃষকের সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে সেচের পানি নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি না হয় এমন নির্দেশনা রয়েছে।