ঢাকা ১২:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই অভ্যুত্থান দমনে ৩ লাখের বেশি গুলি ছুড়েছিল

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:৫৭:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
  • ০ Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমনে পুলিশ ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ দাবি করেছে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় ছোড়া হয় ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড। গতকাল মঙ্গলবার কাদেরসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সাত নেতার বিরুদ্ধে মামলায় পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্কে এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় ৭.৬২ মিমি গোলাবারুদসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে এলএমজি, এসএমজি, চীনা রাইফেল, শটগান, রিভলভার ও পিস্তলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ৪০টির বেশি জেলায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের তথ্যও যুক্তিতর্কে তুলে ধরা হয়।

 

প্রসিকিউটর তামীম বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে ৭.৬২ মিমি গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছিল। তার দাবি, এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী ধরনের গোলাবারুদ এবং সাধারণত সামরিক বা আধাসামরিক বাহিনীর ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক অনুসন্ধানেও আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর ৭.৬২ মিমি রাইফেল ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে।

 

জাতিসংঘের অনুসন্ধানে পুলিশ বাহিনীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ৭.৬২ মিমি রাইফেল, এসএমজি ও গ্লক পিস্তল আন্দোলন দমনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, কক্সবাজার, কুমিল্লা, চাঁদপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, মাগুরা, ভোলা, ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছিল।

 

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি বিশেষ কমিটিও পরবর্তী সময়ে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার সীমিত করার সুপারিশ করেছে। কমিটি ৭.৬২ মিমি অস্ত্রের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম পাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি দীর্ঘ নলের আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার কমানোর সুপারিশ করে। কমিটির প্রাথমিক বিশ্লেষণেও জুলাই আন্দোলনে দীর্ঘ নলের অস্ত্র ও ৭.৬২ মিমি অস্ত্র ব্যবহারের কারণে ব্যাপক হতাহতের কথা উঠে আসে।

পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্কে যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলে ধরে প্রসিকিউশন। তাদের দাবি, শেখ হাসিনার নির্দেশে আন্দোলন দমনে যুবলীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো, হামলায় উসকানি এবং বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় তাদের ভূমিকা ছিল। ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে পরশের কথোপকথনকেও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনানের বিরুদ্ধেও আন্দোলন দমনে নির্দেশনা ও উসকানির অভিযোগ তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষ। প্রসিকিউশনের দাবি, ১৪ জুলাই সাদ্দাম হোসেনের বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতার ধারাবাহিকতায় ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা হয়। পরে এসব নির্দেশনা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।

 

প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, চার আসামির সাংগঠনিক অবস্থান ও অধীনস্থ নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের ওপর ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বর্তায়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গুলি ও হত্যাকাণ্ডে তাদের নির্দেশনা, প্ররোচনা এবং সাংগঠনিক ভূমিকা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ের সঙ্গে যুক্ত।

এর আগে জাতিসংঘের অনুসন্ধানেও জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নথিবদ্ধ করা হয়। বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, গুলি ও শটগানের ছররার আঘাত জুলাই আন্দোলনে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। তবে কোন বাহিনী, কোন স্থানে এবং কোন অস্ত্র দিয়ে প্রতিটি ঘটনায় গুলি চালানো হয়েছিল—এ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো সব ক্ষেত্রে শেষ হয়নি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই অভ্যুত্থান দমনে ৩ লাখের বেশি গুলি ছুড়েছিল

Update Time : ০৪:৫৭:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমনে পুলিশ ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ দাবি করেছে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় ছোড়া হয় ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড। গতকাল মঙ্গলবার কাদেরসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সাত নেতার বিরুদ্ধে মামলায় পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্কে এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় ৭.৬২ মিমি গোলাবারুদসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে এলএমজি, এসএমজি, চীনা রাইফেল, শটগান, রিভলভার ও পিস্তলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ৪০টির বেশি জেলায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের তথ্যও যুক্তিতর্কে তুলে ধরা হয়।

 

প্রসিকিউটর তামীম বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে ৭.৬২ মিমি গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছিল। তার দাবি, এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী ধরনের গোলাবারুদ এবং সাধারণত সামরিক বা আধাসামরিক বাহিনীর ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক অনুসন্ধানেও আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর ৭.৬২ মিমি রাইফেল ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে।

 

জাতিসংঘের অনুসন্ধানে পুলিশ বাহিনীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ৭.৬২ মিমি রাইফেল, এসএমজি ও গ্লক পিস্তল আন্দোলন দমনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, কক্সবাজার, কুমিল্লা, চাঁদপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, মাগুরা, ভোলা, ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছিল।

 

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি বিশেষ কমিটিও পরবর্তী সময়ে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার সীমিত করার সুপারিশ করেছে। কমিটি ৭.৬২ মিমি অস্ত্রের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম পাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি দীর্ঘ নলের আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার কমানোর সুপারিশ করে। কমিটির প্রাথমিক বিশ্লেষণেও জুলাই আন্দোলনে দীর্ঘ নলের অস্ত্র ও ৭.৬২ মিমি অস্ত্র ব্যবহারের কারণে ব্যাপক হতাহতের কথা উঠে আসে।

পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্কে যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলে ধরে প্রসিকিউশন। তাদের দাবি, শেখ হাসিনার নির্দেশে আন্দোলন দমনে যুবলীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো, হামলায় উসকানি এবং বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় তাদের ভূমিকা ছিল। ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে পরশের কথোপকথনকেও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনানের বিরুদ্ধেও আন্দোলন দমনে নির্দেশনা ও উসকানির অভিযোগ তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষ। প্রসিকিউশনের দাবি, ১৪ জুলাই সাদ্দাম হোসেনের বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতার ধারাবাহিকতায় ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা হয়। পরে এসব নির্দেশনা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।

 

প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, চার আসামির সাংগঠনিক অবস্থান ও অধীনস্থ নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের ওপর ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বর্তায়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গুলি ও হত্যাকাণ্ডে তাদের নির্দেশনা, প্ররোচনা এবং সাংগঠনিক ভূমিকা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ের সঙ্গে যুক্ত।

এর আগে জাতিসংঘের অনুসন্ধানেও জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নথিবদ্ধ করা হয়। বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, গুলি ও শটগানের ছররার আঘাত জুলাই আন্দোলনে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। তবে কোন বাহিনী, কোন স্থানে এবং কোন অস্ত্র দিয়ে প্রতিটি ঘটনায় গুলি চালানো হয়েছিল—এ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো সব ক্ষেত্রে শেষ হয়নি।