
ইসলাম ডেস্ক : আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করবে সে তাদের সহযোগী হবে, যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্যে থেকে। মানুষ যাদের সংগ লাভ করতে পারে তাদের মধ্যে এরা কতই না চমৎকার সংগী।’ (সুরা নিসা:৬৯)
জীবিত ব্যক্তি নিজের মুক্তির জন্য দুনিয়াতে অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু মৃত ব্যক্তি নিজের মুক্তির জন্য আর কিছুই করতে পারে না। বরং তখন শুধুই হিসাবের পালা শুরু হয়। মৃত্যুর সাথে সাথে তাকে সকল কিছুর ইতি টানতে হয়। ক্ষণিকের তরে নিজের চোখ দু’টো বন্ধ করুন এবং নিজের আশে পাশে অসংখ্য কবরবাসী রয়েছেন, তাদের নিয়ে একটু চিন্তা করুন। চিন্তার বিষয়বস্তু হলো, এ সমস্ত কবরবাসীরা কতটা অসহায়? দুনিয়ার জীবনে তারা কত কিছুই না করেছে। তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কোন সীমা পরিসীমা ছিল না। আপনার আশে পাশেই তারা কতটা দাপটের সাথে চলাফেরা করেছে। আপনার মতোই ছিল তার এক সুখী জীবন। জীবনের পরিব্যাপ্তির জন্য কত কিছুই না রচনা করেছে। সুনামের চুড়ান্ত চূড়ায় আরোহনের জন্য রাতকে দিন করেছেন, দিনকে করেছেন রাত। অর্থ-খ্যতি-যশ অর্জনের জন্য হালাল-হারামের পরোয়া করেছেন অথবা করেননি। কিন্তু সবই আজ গোরস্থানের সামান্য মাটি তলে চাপা পড়েছে। পৃথিবীর অর্থ, খ্যাতি, যশ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও দাপট তাকে মাটির উপড়েই ফেলে যেতে হয়েছে ততটুকু ছাড়া যা কয়েক টুকরো কাপড়মাত্র, যা দিন কয়েকের মধ্যেই মাটির সাথে মিশে যাবে। যেই বালাখানা তৈয়ার করেছেন, যদি বাইরে মারা যান সে বালাখানায় আপনাকে নেয়া হবে না আর যদি বালাখানায় মারা যান খুব দ্রুত সেখান থেকে বাইরে বের করা হবে।
যারা জীবিত আছেন, তাদের তরে অনুরোধ, আখিরাতের এই অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করুন এবং নিজের অসহায়ত্ব দূর করার জন্য নিজের আমলকে সমৃদ্ধ করুন। যতক্ষণ জীবিত আছেন এমন এক সঙ্গী গড়ে তুলুন যে অসহায়ত্বে সারাক্ষণ আাপনার পাশে অবস্থান করবে। আপনাকে সঙ্গ দেবে আপনার সুবিধা-অসুবিধায় খেয়াল রাখবে। আপনার দৈনন্দিন আচার-আচরণ, চাল-চলন, কাজ-কর্ম (আমল) বা জীবনাচরণ সঠিক করুন। আল্লাহ নির্দেশিত ও রাসুলুল্লাহ সা: কর্তৃক প্রদর্শিত পথে নিজেকে পরিচালিত করুন। আপনার পাশে যেই অসংখ্য কবরবাসীদের দেখছেন, খুব সহসাই হয়তবা এখনি আপনাকেও সেখানে তাদের পাড়ায় মিলিত হতে হবে। সুতরাং খুব দ্রুত নিজেকে তৈরী করুন। সিদ্দিকীন,শহীদান ও সালেহীনদের অন্তর্ভুক্ত করুন। তারাই আপনার কবর জীবনের সাথী হবে।
সিদ্দীক বলতে এমন ব্যক্তিকে বুঝায় যে পরম সত্যনিষ্ঠ ও সত্যবাদী। তার মধ্যে সততা ও সত্যপ্রিয়তা পূর্ণমাত্রায় বিরাজিত থাকে। নিজের আচার-আচরণ ও লেনদেনে সে হামেশা সুস্পষ্ট ও সরল সোজা পথ অবলম্বন করে। সে সবসময় সাচ্চা দিলে হক ও ইনসাফের সহযোগী হয়। সত্য ও ন্যায়নীতি বিরোধী যে কোন বিষয়ের বিরুদ্ধে সে পর্বত সমান অটল অস্তিত্ব নিয়ে রুখে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে সামান্যতম দুর্বলতাও দেখায় না। সে এমনই পবিত্র ও নিস্কলুষ চরিত্রের অধিকারী হয় যে, তার আত্মীয়-অনাত্মীয়, বন্ধু-শুত্রু, আপন-পর কেউই তার কাছ থেকে নির্লজ্জ ও নিখাদ সত্যপ্রিতী, সত্য-সমর্থন ও সত্য-সহযোগীতা ছাড়া আর কিছুরই আশংকা করে না।
শহীদ শব্দের আসল অর্থ হচ্ছে স্বাক্ষী। শহিদ বলতে এমন ব্যক্তি বুঝায় যে নিজের জীবনের সমগ্র কর্মকা-ের মাধ্যম তার ঈমানের সত্যতার সাক্ষ প্রদান করে। আল্লাহর পথে লড়াই করে প্রাণ উৎসর্গ কওে একথা প্রমাণ করে দেয় যে, সে যে জিনিসের ওপর ঈমান এনেছিল তাকে যথার্থই সাচ্চা দিলে সত্য মনে করতো এবং তা তার কাছে এত বেশী প্রিয় ছিল যে, তার জন্য নিজের প্রাণ অকাতরে বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি। আবার এমন ধরনের সত্যনিষ্ট ব্যক্তিদেরকেও শহীদ বলা হয় যারা এতই নির্ভরযোগ্য হয় যে, তারা কোন বিষয়ে সাক্ষ দিলে তাকে নির্দ্বিধায় সত্য ও সঠিক বলে স্বীকার করে নেয়া হয়।
সালেহ বা সৎকর্মশীল বলতে এমন ব্যক্তি বুঝায় যে তার নিজের চিন্তাধারা, আকীদা-বিশ^াস, ইচ্ছা, সংকল্প, কথা ও কর্মের মাধ্যমে সত্য-সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং এই সংগে নিজের জীবনে সৎ ও সূনীতি অবলম্বন করে।
দুনিয়ায় যারা এ ধরনের লোকদের সংগ লাভ করে এবং আখিরাতেও এদের সাথী হয় তারা বড়ই সৌভাগ্যবান। অবশ্য কোন ব্যক্তির অনুভূতি মরে গেলে ভিন্ন কথা, নয়তো অসৎ ও দুশ্চরিত্র লোকদের সাথে দুনিয়ায় জীবন যাপন করা আসলে একটি ভয়াবহ শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। আর আখেরাতে তারা যে পরিণামের সস্মুখীন হবে সেই একই পরিণামের ভাগী হয়ে আখেরাতে তাদের সাথী হওয়ার শাস্তি তো তুলনা বিহীন। তাই তো আল্লাহর নেককার বান্দারা হামেশা এই আকাংখা পোষণ করে যে, তারা যেন নেক লোকদের সমাজে বসবাস করতে পারে। যারা দুনিয়ায় সৎ লোকদের সাথে বসবাস করবে অর্থাৎ সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহীনদের কার্যাবলী ধারণ করে তাদের সাথে পথ চলবে, তাদেরকে মৃত্যু থেকে হাশরের ময়দান এবং আল্লাহর আদালত পর্যন্ত সম্মানের সহিত ডাকা হবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘হে প্রশান্ত আত্মা! চলো তোমার রবের দিকে, এমন অবস্থায় যে তুমি সন্তুষ্ট। শামিল হয়ে যাও আমার বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।’ (সুরা ফযর : ২৭-৩০)। এ কথা মৃত্যু কালেও বলা হবে, যখন কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত হয়ে হাশরের ময়দানের দিকে যেতে থাকবে সে সময়ও বলা হবে এবং আল্লাহর আদালতে পেশ করার সময়ও তাকে একথা বলা হবে। প্রতটি পর্যায়ে তাকে এই মর্মে নিশ্চয়তা দান তরা হবে যে, সে আল্লাহর রহমতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
‘প্রশান্ত আত্মা’ বলে এমন মানুষকে বুঝানো হয়েছে যে, কোন প্রকার সন্দেহ সংশয় ছাড়াই পূর্ণ নিশ্চিন্ততা সহকারে ঠা-া মাথায় এক ও লা শরীক আল্লাহকে নিজের রব এবং নবীগণ যে সত্য দীন এনেছিলেন তাকে নিজের দীন ও জীবন বিধান হিসাবে গণ্য করেছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছ থেকে যে বিশ^াস ও বিধানই পাওয়া গেছে তাকে সে পুরোপুরি সত্য বলে মেনে নিয়েছে। আল্লাহর দীন যে জিনিসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে তাকে সে অনিচ্ছা সত্বে নয় বরং এই বিশ^াস সহকারে বর্জন করেছে যে, সত্যিই তা খারাপ। সত্য প্রীতির পথে যে কোন ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সে নির্দ্ধিধায় তা করেছে। এই পথে যেসব সংকট, সমস্যা, কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে হাসি মুখে সেগুলো বরদাশত করেছে।
অন্যায় পথে চলে লোকদের দুনিয়ায় নানান ধরনের স্বার্থ, ঐশ^র্য ও সুখ-সম্ভার লাভ করার যেসব দৃশ্য সে দেখেছে তা থেকে বঞ্চিত থাকার জন্য তার নিজের মধ্যে কোন ক্ষোভ বা আক্ষেপ জাগেনি। বরং সত্য দীন অনুসরণ করার ফলে সে যে এই সমস্ত আবর্জনা থেকে মুক্ত থেকেছে, এ জন্য সে নিজের মধ্যে পূর্ণ নিশ্চিন্ততা অনুভব করেছে। আল কুরআনের অন্যত্র এই অবস্থাটিকে ‘শারহে সদর’ বা উন্মুক্ত বা বিস্তৃত হৃদয়’ করে দেয়ার অর্থে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ যাকে সত্য পথ দেখাবার সংকল্প করেন তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।’ (সুরা আন’আম:১২৫) বক্ষদেশ উন্মুক্ত করে দেয়ার মানে হচ্ছে, ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে হৃদয়ে পূর্ণ নিসংশয়তা ও নিশ্চিয়তা সৃষ্টি করা এবং যাবতীয় সন্দেহ, সংশয় ও দোদুল্যমনতা দূর করে দেয়া।
আগেই বলা হয়েছে, কবরবাসী হওয়ার আগেই দুনিয়ার জীবনে এমন কাজ করুন, যে গুলো আপনার কবর জীবনে অসহায়ত্বের সাথী হতে পারে এবং কবরে শুয়ে তার ফল ভোগ করতে পারেন। আমরা বিখ্যাত সেই হাদীসের কথা জানি, হযরত আবু হোরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সা: থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেন, মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের দরজা বন্ধ হয় না। (১) সদকায়ে জারিয়া অথবা (২) এমন ইলম যার দ্বারা উপকার সাধিত হয় অথবা (৩) নেককার সন্তান যে তার জন্য দু’আ করতে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম:৪০৭৭, কিতাবুল ওয়াসিয়াত, বাবু মা এয়ালহাকুল ইনসানা…হাদীসের মান সহীহ) সুতরাং জীবিত থাকতেই এই ভালো কাজগুলো করে যান। যেগুলো অন্ধকার কবরে অসহায়ত্বে আপনার উপকারে আসবে।
Reporter Name 

























