ঢাকা ০৮:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গৌরনদীর দইয়ের ২০০ বছরের ঐতিহ্য

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:৫৯:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪৭ Time View
৭৮

নিজস্ব প্রতিবেদক : মিষ্টির কথা উঠলেই জিভে জল এসে যায়। রসগোল্লা, সন্দেশ, রসকদম, চমচম, কালোজাম, ক্ষীরের কদম, কাটারীভোগ, ক্ষীরপুরী, প্যারা সন্দেশ, রসমালাই নানা স্বাদের এই মিষ্টির ভিড়ে এক বিশেষ আসন জুড়ে আছে দধি বা দই। গ্রামের খাঁটি গাভীর দুধে তৈরি টক-মিষ্টি ঘ্রাণের দই যেন বাঙালির রসনাবিলাসের অনন্য অনুষঙ্গ। সেই টানেই একদিন হাজির হয়েছিলাম শচিন ঘোষের ‘গৌর নিতাই মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে’। মিষ্টির পর দই না খেয়ে থাকা সত্যিই কঠিন।

দুধের ব্যাক্টেরিয়া গাঁজন প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত দই মানুষ প্রায় ৪৫০০ বছর ধরে খেয়ে আসছে। পুষ্টিগুণ ও স্বাদের কারণে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই দইয়ের সুনাম রয়েছে। সাধারণত গরমকালে দই বেশি উপভোগ্য হলেও শীতকালেও এর চাহিদা কমে না। আর যদি তা হয় ‘গৌরনদীর দই’, তবে তো কথাই নেই। যারা একবার এই দই খেয়েছেন, তারা এর স্বাদ ভুলতে পারেন না। প্রায় ২০০ বছর ধরে নানা আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবে গৌরনদীর দই রসনার তৃপ্তি জুগিয়ে আসছে।

 

বরিশালের গৌরনদীর দই বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী দুগ্ধজাত পণ্য। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে ডাওরী ঘোষের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু। পরে শচীন ঘোষ, ননী ঘোষ, গেদু ঘোষ, ভুবন ঘোষ, রাধাগোবিন্দ ঘোষ, নির্মল ঘোষ, সুশীল ঘোষ ও জীবন ঘোষের মতো প্রসিদ্ধ কারিগররা এই ঐতিহ্য বহন করেছেন। বর্তমানে ননী ঘোষ ছাড়া বাকিরা আর জীবিত নেই। ১৯৯০ সালে গৌরনদী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কারিগর রানা ঘোষ ডিভি লটারি জিতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং সেখানে ‘গৌরনদী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ নামে দোকান চালু করেন। এর মাধ্যমে গৌরনদীর দই ও মিষ্টির সুনাম আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

 

গৌরনদীর দই খাঁটি গাভীর দুধ দিয়ে তৈরি। প্রায় ৫ থেকে ৯ ঘণ্টা ধরে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়। এরপর মাটির হাঁড়িতে ঢেলে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রাখা হয় দীর্ঘ সময়, তাতেই জমে ওঠে এর বিশেষ স্বাদ ও ঘনত্ব। এই দইয়ের বড় বৈশিষ্ট্য হলো সহজে নষ্ট হয় না। সাধারণ তাপমাত্রায় ৭ থেকে ১০ দিন ভালো থাকে, কিছু ক্ষেত্রে ১৫ দিন পর্যন্তও টিকে যায়। ফলে দূর-দূরান্তে পরিবহন করা সম্ভব হয়, যা এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে সহায়ক।

 

গৌর নিতাই মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’-এ দই খেতে গিয়ে কৌতূহলবশত জানতে চেয়েছিলাম, অভিনেতা মোশারফ করিম কি এখানে আসেন? দোকানি হেসে জানান, তিনি একবার এখানে দই খেয়েছিলেন, তবে তার বোন নিয়মিত গ্রাহক। জানেন তো, বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা মোশারফ করিমের বাড়ি কিন্তু গৌরনদীতেই।

 

একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের উৎপাদিত পণ্য যদি ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র হয়, তবে তা জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতি পেতে পারে। গৌরনদীর দইয়ের ক্ষেত্রেও বরিশালের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এটি জিআই স্বীকৃতি পাক।

 

জিআই স্বীকৃতি পণ্যের উৎস ও গুণগত মান নিশ্চিত করে, আদি পরিচয় রক্ষা করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। পাশাপাশি এটি উৎপাদকদের অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়, নকল পণ্যের দৌরাত্ম্য কমায় এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহায়তা করে। বাংলাদেশে ২০১৬ সালে জামদানি শাড়ি প্রথম জিআই স্বীকৃতি পায়; এরপর আরও অনেক পণ্য এই স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

 

প্রতিবার গৌরনদীর দই খেয়ে মনে হয়েছে, এর জিআই স্বীকৃতির দাবি যথার্থ। এই স্বীকৃতি পেলে গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে আরও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। যা শুধু বরিশাল নয়, বাংলাদেশের জন্যও একটি গৌরবময় অর্জন হতে পারে।

 

লেখক: গল্পকার ও সংগঠক।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

পটুয়াখালীতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বেগম জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী পালিত

গৌরনদীর দইয়ের ২০০ বছরের ঐতিহ্য

Update Time : ০৬:৫৯:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৭৮

নিজস্ব প্রতিবেদক : মিষ্টির কথা উঠলেই জিভে জল এসে যায়। রসগোল্লা, সন্দেশ, রসকদম, চমচম, কালোজাম, ক্ষীরের কদম, কাটারীভোগ, ক্ষীরপুরী, প্যারা সন্দেশ, রসমালাই নানা স্বাদের এই মিষ্টির ভিড়ে এক বিশেষ আসন জুড়ে আছে দধি বা দই। গ্রামের খাঁটি গাভীর দুধে তৈরি টক-মিষ্টি ঘ্রাণের দই যেন বাঙালির রসনাবিলাসের অনন্য অনুষঙ্গ। সেই টানেই একদিন হাজির হয়েছিলাম শচিন ঘোষের ‘গৌর নিতাই মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে’। মিষ্টির পর দই না খেয়ে থাকা সত্যিই কঠিন।

দুধের ব্যাক্টেরিয়া গাঁজন প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত দই মানুষ প্রায় ৪৫০০ বছর ধরে খেয়ে আসছে। পুষ্টিগুণ ও স্বাদের কারণে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই দইয়ের সুনাম রয়েছে। সাধারণত গরমকালে দই বেশি উপভোগ্য হলেও শীতকালেও এর চাহিদা কমে না। আর যদি তা হয় ‘গৌরনদীর দই’, তবে তো কথাই নেই। যারা একবার এই দই খেয়েছেন, তারা এর স্বাদ ভুলতে পারেন না। প্রায় ২০০ বছর ধরে নানা আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবে গৌরনদীর দই রসনার তৃপ্তি জুগিয়ে আসছে।

 

বরিশালের গৌরনদীর দই বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী দুগ্ধজাত পণ্য। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে ডাওরী ঘোষের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু। পরে শচীন ঘোষ, ননী ঘোষ, গেদু ঘোষ, ভুবন ঘোষ, রাধাগোবিন্দ ঘোষ, নির্মল ঘোষ, সুশীল ঘোষ ও জীবন ঘোষের মতো প্রসিদ্ধ কারিগররা এই ঐতিহ্য বহন করেছেন। বর্তমানে ননী ঘোষ ছাড়া বাকিরা আর জীবিত নেই। ১৯৯০ সালে গৌরনদী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কারিগর রানা ঘোষ ডিভি লটারি জিতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং সেখানে ‘গৌরনদী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ নামে দোকান চালু করেন। এর মাধ্যমে গৌরনদীর দই ও মিষ্টির সুনাম আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

 

গৌরনদীর দই খাঁটি গাভীর দুধ দিয়ে তৈরি। প্রায় ৫ থেকে ৯ ঘণ্টা ধরে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়। এরপর মাটির হাঁড়িতে ঢেলে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রাখা হয় দীর্ঘ সময়, তাতেই জমে ওঠে এর বিশেষ স্বাদ ও ঘনত্ব। এই দইয়ের বড় বৈশিষ্ট্য হলো সহজে নষ্ট হয় না। সাধারণ তাপমাত্রায় ৭ থেকে ১০ দিন ভালো থাকে, কিছু ক্ষেত্রে ১৫ দিন পর্যন্তও টিকে যায়। ফলে দূর-দূরান্তে পরিবহন করা সম্ভব হয়, যা এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে সহায়ক।

 

গৌর নিতাই মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’-এ দই খেতে গিয়ে কৌতূহলবশত জানতে চেয়েছিলাম, অভিনেতা মোশারফ করিম কি এখানে আসেন? দোকানি হেসে জানান, তিনি একবার এখানে দই খেয়েছিলেন, তবে তার বোন নিয়মিত গ্রাহক। জানেন তো, বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা মোশারফ করিমের বাড়ি কিন্তু গৌরনদীতেই।

 

একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের উৎপাদিত পণ্য যদি ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র হয়, তবে তা জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতি পেতে পারে। গৌরনদীর দইয়ের ক্ষেত্রেও বরিশালের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এটি জিআই স্বীকৃতি পাক।

 

জিআই স্বীকৃতি পণ্যের উৎস ও গুণগত মান নিশ্চিত করে, আদি পরিচয় রক্ষা করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। পাশাপাশি এটি উৎপাদকদের অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়, নকল পণ্যের দৌরাত্ম্য কমায় এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহায়তা করে। বাংলাদেশে ২০১৬ সালে জামদানি শাড়ি প্রথম জিআই স্বীকৃতি পায়; এরপর আরও অনেক পণ্য এই স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

 

প্রতিবার গৌরনদীর দই খেয়ে মনে হয়েছে, এর জিআই স্বীকৃতির দাবি যথার্থ। এই স্বীকৃতি পেলে গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে আরও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। যা শুধু বরিশাল নয়, বাংলাদেশের জন্যও একটি গৌরবময় অর্জন হতে পারে।

 

লেখক: গল্পকার ও সংগঠক।