ঢাকা ০৪:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হারিয়েই গেল বরিশাল নদী পথের প্যাডেল স্টিমার

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:০৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • ৩৭ Time View
৭০

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল থেকে হারিয়ে গেছে বিআইডব্লিউটিএর প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহ্সুদ। ইজারা দেওয়ার পর গত চার মাসেও বরিশালে এটি আসেনি। আগামীতেও আর আসবে কিনা এটি নিয়েও সংশয় রয়েছে।

১৯২২ সালে কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপইয়ার্ডে জন্ম নেয় প্যাডেলচালিত স্টিমার পিএস মাহ্সুদ। জন্মলগ্ন থেকে প্রায় ১০০ বছর যাত্রী পরিবহণ করে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন নৌপথ দাপিয়ে বেড়িয়েছে এটি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পিএস মাহ্সুদের চলাচলের পথ দাঁড়ায় রাজধানী ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে শিল্পনগরী খুলনা পর্যন্ত। নৌপথ ও এই প্যাডেল স্টিমারই ছিল মানুষের চলাচলের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বাহন। শুরুতে কয়লায় চললেও পরে এই স্টিমারকে রূপান্তর করা হয় ডিজেলে। প্যাডেল স্টিমারে প্রচলিত ধারার জাহাজগুলোর মতো পেছনে প্রপেলার থাকে না। এটির দুদিকে একাধিক বিশাল প্লেটযুক্ত পাখায় পানি ঠেলে চলার কারণেই এর নাম প্যাডেল স্টিমার। প্রায় ৩ বছর বসে থাকার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ নেয় পিএস মাহ্সুদকে পুনরায় নৌপথে ফেরানোর। তৎকালীন নৌপরিবহণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের তৎপরতায় এটি ফের সচল হয়। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকা খরচ করে যাত্রী পরিবহণের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যায় পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয় পিএস মাহ্সুদকে।

 

আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর যাত্রী পরিবহণ শুরু করার কথা থাকলেও নানাবিধ জটিলতায় তারিখ পিছিয়ে ২১ নভেম্বর করা হয়। কিন্তু যাত্রী সংকটে সেদিনও ঢাকা ছাড়তে পারেনি পিএস মাহ্সুদ।

 

সবশেষে ৪১ জন যাত্রী নিয়ে ২৮ নভেম্বর ঢাকা থেকে বরিশালের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এটি। ২৯ নভেম্বর ফিরতি যাত্রায় ছিল মাত্র ২০ জন যাত্রী। এরপরও বেশ কয়েকবার ঢাকা-বরিশাল রুটে সপ্তাহে একদিন চলাচল করেছিল এই প্যাডেল স্টিমারটি। নদীবেষ্টিত বরিশালের মানুষের কাছে এই পিএস মাহ্সুদ ছিল আবেগ ও স্মৃতিবিজড়িত ভ্রমণ বাহন। ছেলেবেলায় প্যাডেল স্টিমারে ভ্রমণ করা আল-আমিন বলেন, আব্বার সঙ্গে হাত ধরে এই স্টিমারে চড়তাম, দাদাবাড়ি থেকে নানাবাড়ি যেতাম। এটার যখন নতুন করে যাত্রা শুরু হয়েছিল, খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন বরিশালে আসছে না প্যাডেল স্টিমার। এটা আমাদের আবেগ ও ঐতিহ্যের জায়গা। এটা আবার চালু করার দাবি জানাই।

 

তবে প্রথম ট্রিপে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা অপারেশনাল লোকসান গুনতে হয়েছিল প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহ্সুদের। আনুষঙ্গিক খরচের সঙ্গে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখ টাকার বেশি।

 

পর্যটক সার্ভিস পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকায় জাহাজটি কোনো ট্যুর কোম্পানিকে লিজ দেওয়ার কথা চলছিল প্রথম থেকেই। গ্রিন ট্যুর অপারেটর নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় এর ইজারা। শর্ত ছিল প্রতি সপ্তাহে একদিন ঢাকা-বরিশাল রুটে চালাতে হবে প্যাডেল স্টিমারটি। তবে ইজারার পর থেকে আর বরিশালে আসেনি পিএএস মাহ্সুদ নামের শতবর্ষী নৌযানটি।

 

দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বাতিল করা হয় পরবর্তী যাত্রা। কিন্তু এরপর মাসের পর মাস পার হলেও বরিশালমুখো হয়নি প্যাডেল স্টিমারটি।

 

এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বরিশালের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখা জনগণ। এ বিষয়ে মাসুদুর রহমান বলেন, দক্ষিণের ইতিহাস ধরে রেখেছিল এই স্টিমারটি। এটা চালু হওয়ায় দক্ষিণবাসী খুশি হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েকটি ট্রিপের পর বন্ধ হওয়ায় হতাশ হয়েছি। লাখো দক্ষিণাঞ্চলবাসী নৌপথে স্বর্ণালি স্মৃতি বয়ে বেড়ানো এই নৌযানটি পুনরায় চলাচলের দাবি জানাই।

 

 

প্যাডেল স্টিমারের বর্তমান ইজরাদার মহিউদ্দিন হেলাল বলেন, এটিকে বর্তমানে ক্রুজ লাইনার হিসাবে বা পর্যটকবাহী জাহাজ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি যেহেতু একটি ঐতিহ্যবাহী স্টিমার, এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্যই এটিকে ট্যুরিজমের অংশ হিসাবে এখন চালানো হচ্ছে। লিজের শর্ত অনুযায়ী এটিকে যাত্রীবাহী সার্ভিস হিসাবে চালানোর জন্য আমরা বাধ্য নই। ইতোপূর্বে আমরা এই জাহাজটি পর্যটক যান হিসাবে একবারে বরিশালে নিয়ে এসেছি। বর্তমানে এটি ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় দৈনিক ভিত্তিতে পর্যটকদের নিয়ে এটি পর্যটকবাহী জাহাজ হিসাবে চলাচল করছে। এর মাঝে আমরা ঢাকা-বরিশালের ট্রিপের উদ্দেশে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আশানুরূপ সাড়া পাইনি। যদি সাড়া পাওয়া যায় ও পর্যটকরা যদি চায় এ জাহাজে করে পদ্মা মেঘনা হয়ে বরিশাল যাবে ও আসবে। তাহলে অবশ্যই আমরা সেভাবে সার্ভিস দেব।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিকের ওপর হামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গৌরনদীতে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা

হারিয়েই গেল বরিশাল নদী পথের প্যাডেল স্টিমার

Update Time : ০৫:০৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
৭০

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল থেকে হারিয়ে গেছে বিআইডব্লিউটিএর প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহ্সুদ। ইজারা দেওয়ার পর গত চার মাসেও বরিশালে এটি আসেনি। আগামীতেও আর আসবে কিনা এটি নিয়েও সংশয় রয়েছে।

১৯২২ সালে কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপইয়ার্ডে জন্ম নেয় প্যাডেলচালিত স্টিমার পিএস মাহ্সুদ। জন্মলগ্ন থেকে প্রায় ১০০ বছর যাত্রী পরিবহণ করে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন নৌপথ দাপিয়ে বেড়িয়েছে এটি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পিএস মাহ্সুদের চলাচলের পথ দাঁড়ায় রাজধানী ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে শিল্পনগরী খুলনা পর্যন্ত। নৌপথ ও এই প্যাডেল স্টিমারই ছিল মানুষের চলাচলের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বাহন। শুরুতে কয়লায় চললেও পরে এই স্টিমারকে রূপান্তর করা হয় ডিজেলে। প্যাডেল স্টিমারে প্রচলিত ধারার জাহাজগুলোর মতো পেছনে প্রপেলার থাকে না। এটির দুদিকে একাধিক বিশাল প্লেটযুক্ত পাখায় পানি ঠেলে চলার কারণেই এর নাম প্যাডেল স্টিমার। প্রায় ৩ বছর বসে থাকার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ নেয় পিএস মাহ্সুদকে পুনরায় নৌপথে ফেরানোর। তৎকালীন নৌপরিবহণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের তৎপরতায় এটি ফের সচল হয়। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকা খরচ করে যাত্রী পরিবহণের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যায় পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয় পিএস মাহ্সুদকে।

 

আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর যাত্রী পরিবহণ শুরু করার কথা থাকলেও নানাবিধ জটিলতায় তারিখ পিছিয়ে ২১ নভেম্বর করা হয়। কিন্তু যাত্রী সংকটে সেদিনও ঢাকা ছাড়তে পারেনি পিএস মাহ্সুদ।

 

সবশেষে ৪১ জন যাত্রী নিয়ে ২৮ নভেম্বর ঢাকা থেকে বরিশালের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এটি। ২৯ নভেম্বর ফিরতি যাত্রায় ছিল মাত্র ২০ জন যাত্রী। এরপরও বেশ কয়েকবার ঢাকা-বরিশাল রুটে সপ্তাহে একদিন চলাচল করেছিল এই প্যাডেল স্টিমারটি। নদীবেষ্টিত বরিশালের মানুষের কাছে এই পিএস মাহ্সুদ ছিল আবেগ ও স্মৃতিবিজড়িত ভ্রমণ বাহন। ছেলেবেলায় প্যাডেল স্টিমারে ভ্রমণ করা আল-আমিন বলেন, আব্বার সঙ্গে হাত ধরে এই স্টিমারে চড়তাম, দাদাবাড়ি থেকে নানাবাড়ি যেতাম। এটার যখন নতুন করে যাত্রা শুরু হয়েছিল, খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন বরিশালে আসছে না প্যাডেল স্টিমার। এটা আমাদের আবেগ ও ঐতিহ্যের জায়গা। এটা আবার চালু করার দাবি জানাই।

 

তবে প্রথম ট্রিপে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা অপারেশনাল লোকসান গুনতে হয়েছিল প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহ্সুদের। আনুষঙ্গিক খরচের সঙ্গে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখ টাকার বেশি।

 

পর্যটক সার্ভিস পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকায় জাহাজটি কোনো ট্যুর কোম্পানিকে লিজ দেওয়ার কথা চলছিল প্রথম থেকেই। গ্রিন ট্যুর অপারেটর নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় এর ইজারা। শর্ত ছিল প্রতি সপ্তাহে একদিন ঢাকা-বরিশাল রুটে চালাতে হবে প্যাডেল স্টিমারটি। তবে ইজারার পর থেকে আর বরিশালে আসেনি পিএএস মাহ্সুদ নামের শতবর্ষী নৌযানটি।

 

দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বাতিল করা হয় পরবর্তী যাত্রা। কিন্তু এরপর মাসের পর মাস পার হলেও বরিশালমুখো হয়নি প্যাডেল স্টিমারটি।

 

এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বরিশালের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখা জনগণ। এ বিষয়ে মাসুদুর রহমান বলেন, দক্ষিণের ইতিহাস ধরে রেখেছিল এই স্টিমারটি। এটা চালু হওয়ায় দক্ষিণবাসী খুশি হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েকটি ট্রিপের পর বন্ধ হওয়ায় হতাশ হয়েছি। লাখো দক্ষিণাঞ্চলবাসী নৌপথে স্বর্ণালি স্মৃতি বয়ে বেড়ানো এই নৌযানটি পুনরায় চলাচলের দাবি জানাই।

 

 

প্যাডেল স্টিমারের বর্তমান ইজরাদার মহিউদ্দিন হেলাল বলেন, এটিকে বর্তমানে ক্রুজ লাইনার হিসাবে বা পর্যটকবাহী জাহাজ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি যেহেতু একটি ঐতিহ্যবাহী স্টিমার, এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্যই এটিকে ট্যুরিজমের অংশ হিসাবে এখন চালানো হচ্ছে। লিজের শর্ত অনুযায়ী এটিকে যাত্রীবাহী সার্ভিস হিসাবে চালানোর জন্য আমরা বাধ্য নই। ইতোপূর্বে আমরা এই জাহাজটি পর্যটক যান হিসাবে একবারে বরিশালে নিয়ে এসেছি। বর্তমানে এটি ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় দৈনিক ভিত্তিতে পর্যটকদের নিয়ে এটি পর্যটকবাহী জাহাজ হিসাবে চলাচল করছে। এর মাঝে আমরা ঢাকা-বরিশালের ট্রিপের উদ্দেশে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আশানুরূপ সাড়া পাইনি। যদি সাড়া পাওয়া যায় ও পর্যটকরা যদি চায় এ জাহাজে করে পদ্মা মেঘনা হয়ে বরিশাল যাবে ও আসবে। তাহলে অবশ্যই আমরা সেভাবে সার্ভিস দেব।