ঢাকা ০৮:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে বরিশালে কবি জীবনানন্দ দাশকে স্মরণ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৩১:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫২ Time View
৮৩

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে,—/ বসন্তের রাতে/ বিছানায় শুয়ে আছি;—/ এখন সে কত রাত!/ ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,/ স্কাইলাইট মাথার উপর,/ আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।/ তারপর চ’লে যায় কোথায় আকাশে?/ তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে!

 

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘পাখিরা’ কাব্যে বসন্তের রূপ-লাবণ্যকে এভাবেই তুলে ধরেছিলেন। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা আর মরমি অনুভবের অনন্য মিশেলে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক আলাদা কাব্যভুবন। এই ঋতুরাজ বসন্তের আজকের দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ।

 

আজ কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। শ্রদ্ধা-ভালোবাসার মধ্য দিয়ে কবিকে স্মরণ করছে তাঁর জন্মশহর বরিশালের বিভিন্ন অঙ্গনের ব্যক্তি ও সংগঠন। দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কবির প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও কবির গান পরিবেশন।

 

আয়োজকেরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের কাছে জীবনানন্দ দাশের কবিতা ও জীবনদর্শন পৌঁছে দিতেই এ আয়োজন। বরিশালের সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর স্মৃতি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি এখনো শহরের বাতাসে, নদীর ঢেউয়ে আর পাঠকের অনুভবে জীবন্ত।

 

মঙ্গলবার সকাল ৯টায় নগরের জীবনানন্দ দাশ সড়কে কবির জন্মভিটায় স্থাপিত জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগারে কবির প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন প্রগতি লেখক সংঘ ও বরিশালের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরে স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা, আবৃত্তি ও সংগীতের।

 

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশই দৃঢ়ভাবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। নির্জনতার কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন গভীরভাবে কাল ও ইতিহাস-সচেতন এক শিল্পী। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতার পাশাপাশি সময়ের সংকট, মানুষের অস্তিত্ববোধ ও সভ্যতার টানাপোড়েন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আধুনিক কাব্যকলার নানা তত্ত্ব প্রয়োগ ও শব্দ নিরীক্ষার ক্ষেত্রে জীবনানন্দের অনন্যতা সত্যিই বিস্ময়কর। বিশেষ করে উপমা ও চিত্রকল্প ব্যবহারে তাঁর নৈপুণ্য তুলনাহীন।

 

সভায় বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি তপংকর চক্রবর্তী বলেন, কবি জীবনানন্দ দাশ ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত সরকারি ব্রজমোহন কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে এই কলেজে একটি ছাত্রাবাস থাকলেও কবির রচনা পাঠ ও গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার মতো কোনো কিছু গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে তাঁর পৈতৃক বাড়ি ও বরিশালে তাঁর নামে কোনো স্থাপনা গড়ে ওঠেনি।

 

আক্ষেপ করে তপংকর চক্রবর্তী বলেন, বাইরে থেকে কবিকে দেখতে এসে, বরিশালে কোথাও স্মৃতি খুঁজে না পেয়ে, সবাই হতাশ হয়ে চলে যান। কবি জীবনানন্দ দাশ শুধু বাংলা ভাষার একজন কবি নন; তিনি বিশ্ব সাহিত্যের একটি অনন্য অংশ। গবেষক ক্লিনটন বি সিলি কবির অনন্যপ্রতিভা ইংরেজিভাষীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলা কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশকে স্মরণের মাধ্যমে ভাষা–সংস্কৃতি এগিয়ে যাবে।

 

সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন টুনুরানী কর্মকার, কবি অপূর্ব গৌতম, আবুল কালাম আজাদ, শোভন কর্মকার, সুভাষ চন্দ্র দাস প্রমুখ। সকাল ১০টায় কবির কর্মস্থল সরকারি ব্রজমোহন কলেজে, কবি জীবনানন্দ দাশ চত্বরে, উত্তরণ সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে কবি জীবনানন্দ দাশ স্মরণে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। উপাধ্যক্ষ আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন সাবেক অধ্যক্ষ স ম ইমানুল হাকিম, অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক সংগীতা সরকার, সহকারী অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম প্রমুখ।

 

কবি জীবনানন্দ দাশের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে। তিনি ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও ব্রজমোহন কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ব্রজমোহন কলেজে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন বেশ কয়েক বছর। বরিশাল শহরেই তিনি বেড়ে উঠেছেন এবং শৈশব, কৈশোর, যৌবনের বড় একটা অংশ অতিবাহিত করেছেন। পেশাগত জীবনও কেটেছে বেশ কিছুটা সময়। তাঁর সৃষ্টিকর্মের এক বিশাল অংশজুড়ে আছে বরিশালের প্রকৃতি ও সৌন্দর্য।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলকে বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী

১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে বরিশালে কবি জীবনানন্দ দাশকে স্মরণ

Update Time : ১২:৩১:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৮৩

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে,—/ বসন্তের রাতে/ বিছানায় শুয়ে আছি;—/ এখন সে কত রাত!/ ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,/ স্কাইলাইট মাথার উপর,/ আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।/ তারপর চ’লে যায় কোথায় আকাশে?/ তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে!

 

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘পাখিরা’ কাব্যে বসন্তের রূপ-লাবণ্যকে এভাবেই তুলে ধরেছিলেন। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা আর মরমি অনুভবের অনন্য মিশেলে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক আলাদা কাব্যভুবন। এই ঋতুরাজ বসন্তের আজকের দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ।

 

আজ কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। শ্রদ্ধা-ভালোবাসার মধ্য দিয়ে কবিকে স্মরণ করছে তাঁর জন্মশহর বরিশালের বিভিন্ন অঙ্গনের ব্যক্তি ও সংগঠন। দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কবির প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও কবির গান পরিবেশন।

 

আয়োজকেরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের কাছে জীবনানন্দ দাশের কবিতা ও জীবনদর্শন পৌঁছে দিতেই এ আয়োজন। বরিশালের সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর স্মৃতি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি এখনো শহরের বাতাসে, নদীর ঢেউয়ে আর পাঠকের অনুভবে জীবন্ত।

 

মঙ্গলবার সকাল ৯টায় নগরের জীবনানন্দ দাশ সড়কে কবির জন্মভিটায় স্থাপিত জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগারে কবির প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন প্রগতি লেখক সংঘ ও বরিশালের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরে স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা, আবৃত্তি ও সংগীতের।

 

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশই দৃঢ়ভাবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। নির্জনতার কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন গভীরভাবে কাল ও ইতিহাস-সচেতন এক শিল্পী। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতার পাশাপাশি সময়ের সংকট, মানুষের অস্তিত্ববোধ ও সভ্যতার টানাপোড়েন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আধুনিক কাব্যকলার নানা তত্ত্ব প্রয়োগ ও শব্দ নিরীক্ষার ক্ষেত্রে জীবনানন্দের অনন্যতা সত্যিই বিস্ময়কর। বিশেষ করে উপমা ও চিত্রকল্প ব্যবহারে তাঁর নৈপুণ্য তুলনাহীন।

 

সভায় বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি তপংকর চক্রবর্তী বলেন, কবি জীবনানন্দ দাশ ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত সরকারি ব্রজমোহন কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে এই কলেজে একটি ছাত্রাবাস থাকলেও কবির রচনা পাঠ ও গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার মতো কোনো কিছু গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে তাঁর পৈতৃক বাড়ি ও বরিশালে তাঁর নামে কোনো স্থাপনা গড়ে ওঠেনি।

 

আক্ষেপ করে তপংকর চক্রবর্তী বলেন, বাইরে থেকে কবিকে দেখতে এসে, বরিশালে কোথাও স্মৃতি খুঁজে না পেয়ে, সবাই হতাশ হয়ে চলে যান। কবি জীবনানন্দ দাশ শুধু বাংলা ভাষার একজন কবি নন; তিনি বিশ্ব সাহিত্যের একটি অনন্য অংশ। গবেষক ক্লিনটন বি সিলি কবির অনন্যপ্রতিভা ইংরেজিভাষীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলা কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশকে স্মরণের মাধ্যমে ভাষা–সংস্কৃতি এগিয়ে যাবে।

 

সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন টুনুরানী কর্মকার, কবি অপূর্ব গৌতম, আবুল কালাম আজাদ, শোভন কর্মকার, সুভাষ চন্দ্র দাস প্রমুখ। সকাল ১০টায় কবির কর্মস্থল সরকারি ব্রজমোহন কলেজে, কবি জীবনানন্দ দাশ চত্বরে, উত্তরণ সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে কবি জীবনানন্দ দাশ স্মরণে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। উপাধ্যক্ষ আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন সাবেক অধ্যক্ষ স ম ইমানুল হাকিম, অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক সংগীতা সরকার, সহকারী অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম প্রমুখ।

 

কবি জীবনানন্দ দাশের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে। তিনি ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও ব্রজমোহন কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ব্রজমোহন কলেজে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন বেশ কয়েক বছর। বরিশাল শহরেই তিনি বেড়ে উঠেছেন এবং শৈশব, কৈশোর, যৌবনের বড় একটা অংশ অতিবাহিত করেছেন। পেশাগত জীবনও কেটেছে বেশ কিছুটা সময়। তাঁর সৃষ্টিকর্মের এক বিশাল অংশজুড়ে আছে বরিশালের প্রকৃতি ও সৌন্দর্য।