ঢাকা ০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাচ্ছেন রাজবন্দি বরিশালের এম এ জলিলে

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:৫২:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
  • ১০৭ Time View
২০৭

নিজস্ব প্রতিবেদক : মহান মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দি মেজর এমএ জলিল-ই একমাত্র সেক্টর কমান্ডার যাকে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবাদের জন্য বিগত ৫৪ বছরে কোনো রাষ্ট্রীয় খেতাব বা পদক দেওয়া হয়নি। এনিয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের মাঝে চাঁপা ক্ষোভ বিরাজ করলেও মেজর এমএ জলিলের কি ‘অপরাধ’ ছিল তা কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই স্পষ্ট করেননি। অবশেষে স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এসে জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয়ভাবে বর্তমান তারেক রহমানের সরকার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬’ এর যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেই তালিকায় দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা (মরণোত্তর) স্বাধীনতা পুরস্কার হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিলের (এমএ জলিল) নাম রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ৫ মার্চ সচিবালয়ে মন্ত্রীসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংবাদ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পরলে গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

কেন তিনি খেতাব পাননি: মেজর এমএ জলিলের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বুলেট ছিন্টু জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের পর খুলনা অঞ্চল থেকে ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক ভারী অস্ত্র ও সম্পদ লুট করে নেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এমএ জলিল। তিনি ভারতীয় কমান্ডারকে সরাসরি হুংকার দিয়ে বলেছিলেন “লুটেরারদের দেখা মাত্র আমি গুলি নির্দেশ দিয়েছি”। তার এই প্রতিবাদের কারণে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। যা ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দি। এছাড়াও স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকার বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে এমএ জলিলের আদর্শিক ভিন্নতা ছিল। যেকারণে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এমএ জলিল ছাড়া অন্য প্রায় সব সেক্টর কমান্ডাররা ‘বীর উত্তম’ খেতাব পেলেও মেজর জলিলকে কোন খেতাবই দেওয়া হয়নি।

সেরা গ্রন্থ: এমএ জলিল শুধু বাংলাদেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন; তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তা। তার লেখা মুক্তিযুদ্ধের সেরা গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সীমাহীন সময়, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনদর্শন, সূর্যোদয়, অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা এবং কৈফিয়ত ও কিছু কথা। মেজর জলিলের লেখা ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ বইটিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম দলিল হিসেবে ধরা হয়। বইটি মূলত স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা। যেখানে লেখক দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্যর্থতাকে পরাধীনতার শামিল বলে উল্লেখ করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন: এমএ জলিল বরিশালের উজিরপুরে ১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম মোহাম্মদ আব্দুল জলিল। তবে তিনি মেজর এমএ জলিল নামেই পরিচিত। তার বাবা জোনাব আলী সিকদার ও মা রাবেয়া খাতুন। মোহাম্মদ আব্দুল জলিলের জন্মের তিন মাস আগে তার বাবা মৃত্যুবরণ করেছেন। উজিরপুর থেকে ১৯৫৯ সালে তিনি মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৬১ সালে তিনি আইএ পাস করেন। পাশাপাশি তিনি সামরিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।

সেনাজীবন: ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে ট্রেনিং অফিসার হিসেবে তিনি যোগদান করেন। সামরিক বাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান একাডেমি থেকে তিনি গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। পরে মুলতানে কর্মরত থাকাকালীন তিনি ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে ১২নং ট্যাঙ্ক ক্যাভালরি রেজিমেন্ট অফিসার হিসেবে তৎকালীন পাক-ভারত যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা: ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি অসুস্থ মাকে দেখার জন্য ছুটিতে মেজর এমএ জলিল বরিশালে আসেন। ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। কোনো কিছুই স্বস্তি দিতে পারছিল না মেজর জলিলকে। ২০ মার্চ তাকে অবিলম্বে কর্মস্থলে যোগদান করার জন্য তার কাছে বিশেষ জরুরি টেলিগ্রাম আসে। কিন্তু তিনি (এমএ জলিল) প্রথমবারের মতো সামরিক কমান্ড অস্বীকার করেন। দেশমাতৃকারটানে ২৬ মার্চ তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। ৭ এপ্রিল মেজর এমএ জলিলের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা খুলনার গল্লামারীতে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের খুলনা কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে কয়েকজন পাক সেনাকে হত্যা এবং তাদের অস্ত্রসস্ত্র লুট করেন। সেখান থেকে তিনি (এমএ জলিল) সুন্দরবন হয়ে অস্ত্র সংগ্রহে ভারতে যান। ভারত থেকে ফেরার পথে সুন্দরবনে পাকবাহিনীর গান বোটের গোলার আঘাতে তার মোটর লঞ্চ সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয়। সেখানে প্রাণপণ লড়াই করে কোনমতে ভারতে ফিরে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। পরবর্তীতে মেজর জলিলকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে গঠিত ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। সেই থেকে চলে তার প্রাণপণ লড়াই। পরবর্তীতে ১৪ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা প্রবেশ করে ১৫ ডিসেম্বর খুলনায় পৌঁছেন। ১৭ ডিসম্বের খুলনায় পাকসেনারা আত্মসমর্পণের পর ২০ ডিসেম্বর রাতে খুলনা থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র একটি জাহাজযোগে রওয়ানা হয়ে পরদিন বরিশালে পৌঁছেন মেজর এমএ জলিল। বীরের বেশে মেজর জলিল তার প্রিয় বরিশালে ফিরে আসার পর তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ২১ ডিসেম্বর বরিশাল মহানগরীর ঐতিহাসিক হেমায়েত উদ্দিন খেলার মাঠে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন মেজর জলিল। সেদিনের ওই জনসভায় বরিশালের সর্বস্তরের মানুষ উল্লাসে ফেঁটে পরেন তাদের প্রিয় যোদ্ধাকে কাছে পেয়ে। বরিশালে পৌঁছার আগেই মেজর এমএ জলিল খুলনা ও যশোরে মিত্র বাহিনীর নির্বিচারে লুটপাটের প্রতিবাদ করেন। ভারতীয় বাহিনীর লুটপাট বন্ধে সব শিল্প কবারখানা থেকে শুরু করে খুলনা ও যশোর হয়ে বেনাপোল সড়ক অবরোধ করে খুলে নেয়া মেশিনারী বোঝাই গাড়ির বহর আটকে দেন। এমনকি তখন খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের গেস্টহাউজে অবস্থানরত ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল দানবীর সিং’কে তিনি কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘লুটেরাদের দেখামাত্র গুলির হুকুম দিয়েছি আমি। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লুটতরাজ করা হতে বিরত রাখুন’। এমনকি পরিকল্পিত এ লুটপাট বন্ধে ‘খুলনার বিভিন্ন জায়গায় এবং যশোর ও সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্তে ভারতীয় লুটেরা বাহিনীর সাথে বেশ কিছু বদানুবাদ ও সংঘর্ষের কথাও উল্লেখ করেছেন মেজর জলিল তার ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ বইয়ে। এমনকি বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জনসভায় মেজর জলিল ভারতীয় বাহিনীর লুটপাট সম্পর্কে জনগণকে সচেতন থাকার আহবান করেছিলেন। মেজর জলিল তার লেখা বইটিতে উল্লেখ করেছেন, ‘ভারতীয় সেনা বাহিনী কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, অবিলম্বে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করবে এবং সকল অস্ত্র জমা করে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়া হবে’। কিন্তু তিনি ভারতীয় বাহিনীর এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার করেছিলেন। এমনকি ভারতীয় বাহিনীর এ পরিকল্পিত ও ন্যাক্কারজনক লুটপাটের বিষয়টি সেদিন মেজর জলিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সর্বাধিনায়ক লেফেটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে জানিয়ে জরুরি চিঠিও দিয়েছিলেন। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় ভারত-বাংলাদেশের যৌথবাহিনী অ্যামবুশ করে মুক্তিযুদ্ধের এই সেনা নায়ককে আটক করে। প্রথমে তাকে (এমএ জলিল) যশোর সেনানিবাসের পাকবাহিনীর পরিত্যক্ত একটি টর্চার সেলের অন্ধকার প্রকষ্ঠে আটক রাখা হয়। মেজর জলিলের গ্রেপ্তারের পর বরিশালসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এমনকি ’৭২-এর মার্চে বরিশাল টাউন হলে এক জনসভায় মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী তার বক্তব্যে মেজর জলিলের গ্রেপ্তারকে ‘সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

গ্রেপ্তারের কিছুদিন পর মেজর জলিলকে ঢাকায় নিয়ে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের পাশে একটি অস্থায়ী সেনা ছাউনিতে আটক রাখা হয়। সেখানে সামরিক আদালতে বিচারে মুক্তিযুদ্ধের এ বীর সেনানী নির্দোষ প্রমাণিত হলে ১৯৭২ সালের ৭ জুলাই মুক্তি লাভ করলেও তিনি আর সামরিক ছাউনিতে ফেরত যাননি। ওই বছরের ৩১ অক্টোবর মেজর এমএ জলিল, আ.স.ম রব ও শাহজাহান সিরাজ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করেন। তিনি ছিলেন ওই দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেজর জলিল বরিশালে তার নিজ উপজেলা উজিরপুর থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হলেও রাতের আঁধারে সেই ফল পাল্টে দিয়ে ভোটের পরেরদিন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হরনাথ বাইনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে জাসদের নেতৃত্বে থাকলেও তাকে পরবর্তী জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কারান্তরালে থাকতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন জাসদ কর্মী নিহত হয়। মেজর জলিল নিজেও আহত হন। সে সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ’৭৫’র ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পরে ৮ নভেম্বর তিনি মুক্তি লাভ করেন। ২৩ নভেম্বর পুনরায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি সামরিক ট্রাইব্যুনালে কর্নেল তাহেরের সাথে মেজর জলিলেরও ফাঁসির হুকুম হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দেয়া হয়। সাড়ে চার বছর কারাভোগের পরে ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ তিনি মুক্তিলাভ করেন।

১৯৮৪ সালের ৩ নভেম্বর মেজর জলিল জাসদ থেকে পদত্যাগ করে ১৬ দিন পরে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ নামে একটি দল গঠন করেন। তিনি মাওলানা হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ গঠনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৫ সালে তাকে একমাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এমনকি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় ১৯৮৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ’৮৮ সালের মার্চ পর্যন্ত পুনরায় তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছিলো। মেজর জলিল বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিতে একাধিকবার পাকিস্তান, লিবিয়া, লেবানন, ইরান ও বৃটেন সফর করেছেন। ১৯৮৯ সালের ১১ নভেম্বর মেজর এমএ জলিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদ যান। সেখানে ১৬ নভেম্বর হৃদরোগ আক্রান্ত হলে তাকে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ১৯ নভেম্বর রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২২ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের এ বীর সেনানীর লাশ ঢাকা আনার পর পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে।

পারিবারিক জীবন: ১৯৮২ সালের আগস্ট মাসে এমএ জলিল টাঙ্গাইলের সায়মা আখতারকে বিয়ে করেন। তাদের দুই মেয়ে সারাহ ও ফারাহ। সারাহ ব্যারিস্টার হিসেবে আইন পেশায় নিয়োজিত। স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এমএ জলিলের অকুতোভয় নেতৃত্ব ও রণকৌশল আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলকে বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাচ্ছেন রাজবন্দি বরিশালের এম এ জলিলে

Update Time : ০১:৫২:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
২০৭

নিজস্ব প্রতিবেদক : মহান মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দি মেজর এমএ জলিল-ই একমাত্র সেক্টর কমান্ডার যাকে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবাদের জন্য বিগত ৫৪ বছরে কোনো রাষ্ট্রীয় খেতাব বা পদক দেওয়া হয়নি। এনিয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের মাঝে চাঁপা ক্ষোভ বিরাজ করলেও মেজর এমএ জলিলের কি ‘অপরাধ’ ছিল তা কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই স্পষ্ট করেননি। অবশেষে স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এসে জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয়ভাবে বর্তমান তারেক রহমানের সরকার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬’ এর যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেই তালিকায় দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা (মরণোত্তর) স্বাধীনতা পুরস্কার হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিলের (এমএ জলিল) নাম রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ৫ মার্চ সচিবালয়ে মন্ত্রীসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংবাদ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পরলে গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

কেন তিনি খেতাব পাননি: মেজর এমএ জলিলের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বুলেট ছিন্টু জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের পর খুলনা অঞ্চল থেকে ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক ভারী অস্ত্র ও সম্পদ লুট করে নেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এমএ জলিল। তিনি ভারতীয় কমান্ডারকে সরাসরি হুংকার দিয়ে বলেছিলেন “লুটেরারদের দেখা মাত্র আমি গুলি নির্দেশ দিয়েছি”। তার এই প্রতিবাদের কারণে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। যা ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দি। এছাড়াও স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকার বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে এমএ জলিলের আদর্শিক ভিন্নতা ছিল। যেকারণে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এমএ জলিল ছাড়া অন্য প্রায় সব সেক্টর কমান্ডাররা ‘বীর উত্তম’ খেতাব পেলেও মেজর জলিলকে কোন খেতাবই দেওয়া হয়নি।

সেরা গ্রন্থ: এমএ জলিল শুধু বাংলাদেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন; তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তা। তার লেখা মুক্তিযুদ্ধের সেরা গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সীমাহীন সময়, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনদর্শন, সূর্যোদয়, অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা এবং কৈফিয়ত ও কিছু কথা। মেজর জলিলের লেখা ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ বইটিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম দলিল হিসেবে ধরা হয়। বইটি মূলত স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা। যেখানে লেখক দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্যর্থতাকে পরাধীনতার শামিল বলে উল্লেখ করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন: এমএ জলিল বরিশালের উজিরপুরে ১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম মোহাম্মদ আব্দুল জলিল। তবে তিনি মেজর এমএ জলিল নামেই পরিচিত। তার বাবা জোনাব আলী সিকদার ও মা রাবেয়া খাতুন। মোহাম্মদ আব্দুল জলিলের জন্মের তিন মাস আগে তার বাবা মৃত্যুবরণ করেছেন। উজিরপুর থেকে ১৯৫৯ সালে তিনি মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৬১ সালে তিনি আইএ পাস করেন। পাশাপাশি তিনি সামরিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।

সেনাজীবন: ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে ট্রেনিং অফিসার হিসেবে তিনি যোগদান করেন। সামরিক বাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান একাডেমি থেকে তিনি গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। পরে মুলতানে কর্মরত থাকাকালীন তিনি ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে ১২নং ট্যাঙ্ক ক্যাভালরি রেজিমেন্ট অফিসার হিসেবে তৎকালীন পাক-ভারত যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা: ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি অসুস্থ মাকে দেখার জন্য ছুটিতে মেজর এমএ জলিল বরিশালে আসেন। ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। কোনো কিছুই স্বস্তি দিতে পারছিল না মেজর জলিলকে। ২০ মার্চ তাকে অবিলম্বে কর্মস্থলে যোগদান করার জন্য তার কাছে বিশেষ জরুরি টেলিগ্রাম আসে। কিন্তু তিনি (এমএ জলিল) প্রথমবারের মতো সামরিক কমান্ড অস্বীকার করেন। দেশমাতৃকারটানে ২৬ মার্চ তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। ৭ এপ্রিল মেজর এমএ জলিলের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা খুলনার গল্লামারীতে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের খুলনা কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে কয়েকজন পাক সেনাকে হত্যা এবং তাদের অস্ত্রসস্ত্র লুট করেন। সেখান থেকে তিনি (এমএ জলিল) সুন্দরবন হয়ে অস্ত্র সংগ্রহে ভারতে যান। ভারত থেকে ফেরার পথে সুন্দরবনে পাকবাহিনীর গান বোটের গোলার আঘাতে তার মোটর লঞ্চ সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয়। সেখানে প্রাণপণ লড়াই করে কোনমতে ভারতে ফিরে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। পরবর্তীতে মেজর জলিলকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে গঠিত ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। সেই থেকে চলে তার প্রাণপণ লড়াই। পরবর্তীতে ১৪ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা প্রবেশ করে ১৫ ডিসেম্বর খুলনায় পৌঁছেন। ১৭ ডিসম্বের খুলনায় পাকসেনারা আত্মসমর্পণের পর ২০ ডিসেম্বর রাতে খুলনা থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র একটি জাহাজযোগে রওয়ানা হয়ে পরদিন বরিশালে পৌঁছেন মেজর এমএ জলিল। বীরের বেশে মেজর জলিল তার প্রিয় বরিশালে ফিরে আসার পর তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ২১ ডিসেম্বর বরিশাল মহানগরীর ঐতিহাসিক হেমায়েত উদ্দিন খেলার মাঠে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন মেজর জলিল। সেদিনের ওই জনসভায় বরিশালের সর্বস্তরের মানুষ উল্লাসে ফেঁটে পরেন তাদের প্রিয় যোদ্ধাকে কাছে পেয়ে। বরিশালে পৌঁছার আগেই মেজর এমএ জলিল খুলনা ও যশোরে মিত্র বাহিনীর নির্বিচারে লুটপাটের প্রতিবাদ করেন। ভারতীয় বাহিনীর লুটপাট বন্ধে সব শিল্প কবারখানা থেকে শুরু করে খুলনা ও যশোর হয়ে বেনাপোল সড়ক অবরোধ করে খুলে নেয়া মেশিনারী বোঝাই গাড়ির বহর আটকে দেন। এমনকি তখন খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের গেস্টহাউজে অবস্থানরত ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল দানবীর সিং’কে তিনি কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘লুটেরাদের দেখামাত্র গুলির হুকুম দিয়েছি আমি। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লুটতরাজ করা হতে বিরত রাখুন’। এমনকি পরিকল্পিত এ লুটপাট বন্ধে ‘খুলনার বিভিন্ন জায়গায় এবং যশোর ও সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্তে ভারতীয় লুটেরা বাহিনীর সাথে বেশ কিছু বদানুবাদ ও সংঘর্ষের কথাও উল্লেখ করেছেন মেজর জলিল তার ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ বইয়ে। এমনকি বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জনসভায় মেজর জলিল ভারতীয় বাহিনীর লুটপাট সম্পর্কে জনগণকে সচেতন থাকার আহবান করেছিলেন। মেজর জলিল তার লেখা বইটিতে উল্লেখ করেছেন, ‘ভারতীয় সেনা বাহিনী কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, অবিলম্বে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করবে এবং সকল অস্ত্র জমা করে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়া হবে’। কিন্তু তিনি ভারতীয় বাহিনীর এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার করেছিলেন। এমনকি ভারতীয় বাহিনীর এ পরিকল্পিত ও ন্যাক্কারজনক লুটপাটের বিষয়টি সেদিন মেজর জলিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সর্বাধিনায়ক লেফেটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে জানিয়ে জরুরি চিঠিও দিয়েছিলেন। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় ভারত-বাংলাদেশের যৌথবাহিনী অ্যামবুশ করে মুক্তিযুদ্ধের এই সেনা নায়ককে আটক করে। প্রথমে তাকে (এমএ জলিল) যশোর সেনানিবাসের পাকবাহিনীর পরিত্যক্ত একটি টর্চার সেলের অন্ধকার প্রকষ্ঠে আটক রাখা হয়। মেজর জলিলের গ্রেপ্তারের পর বরিশালসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এমনকি ’৭২-এর মার্চে বরিশাল টাউন হলে এক জনসভায় মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী তার বক্তব্যে মেজর জলিলের গ্রেপ্তারকে ‘সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

গ্রেপ্তারের কিছুদিন পর মেজর জলিলকে ঢাকায় নিয়ে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের পাশে একটি অস্থায়ী সেনা ছাউনিতে আটক রাখা হয়। সেখানে সামরিক আদালতে বিচারে মুক্তিযুদ্ধের এ বীর সেনানী নির্দোষ প্রমাণিত হলে ১৯৭২ সালের ৭ জুলাই মুক্তি লাভ করলেও তিনি আর সামরিক ছাউনিতে ফেরত যাননি। ওই বছরের ৩১ অক্টোবর মেজর এমএ জলিল, আ.স.ম রব ও শাহজাহান সিরাজ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করেন। তিনি ছিলেন ওই দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেজর জলিল বরিশালে তার নিজ উপজেলা উজিরপুর থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হলেও রাতের আঁধারে সেই ফল পাল্টে দিয়ে ভোটের পরেরদিন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হরনাথ বাইনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে জাসদের নেতৃত্বে থাকলেও তাকে পরবর্তী জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কারান্তরালে থাকতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন জাসদ কর্মী নিহত হয়। মেজর জলিল নিজেও আহত হন। সে সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ’৭৫’র ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পরে ৮ নভেম্বর তিনি মুক্তি লাভ করেন। ২৩ নভেম্বর পুনরায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি সামরিক ট্রাইব্যুনালে কর্নেল তাহেরের সাথে মেজর জলিলেরও ফাঁসির হুকুম হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দেয়া হয়। সাড়ে চার বছর কারাভোগের পরে ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ তিনি মুক্তিলাভ করেন।

১৯৮৪ সালের ৩ নভেম্বর মেজর জলিল জাসদ থেকে পদত্যাগ করে ১৬ দিন পরে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ নামে একটি দল গঠন করেন। তিনি মাওলানা হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ গঠনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৫ সালে তাকে একমাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এমনকি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় ১৯৮৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ’৮৮ সালের মার্চ পর্যন্ত পুনরায় তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছিলো। মেজর জলিল বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিতে একাধিকবার পাকিস্তান, লিবিয়া, লেবানন, ইরান ও বৃটেন সফর করেছেন। ১৯৮৯ সালের ১১ নভেম্বর মেজর এমএ জলিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদ যান। সেখানে ১৬ নভেম্বর হৃদরোগ আক্রান্ত হলে তাকে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ১৯ নভেম্বর রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২২ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের এ বীর সেনানীর লাশ ঢাকা আনার পর পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে।

পারিবারিক জীবন: ১৯৮২ সালের আগস্ট মাসে এমএ জলিল টাঙ্গাইলের সায়মা আখতারকে বিয়ে করেন। তাদের দুই মেয়ে সারাহ ও ফারাহ। সারাহ ব্যারিস্টার হিসেবে আইন পেশায় নিয়োজিত। স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এমএ জলিলের অকুতোভয় নেতৃত্ব ও রণকৌশল আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।