ঢাকা ০৬:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সরাতে শিক্ষকরা এক দফা আন্দোলন, অচল ক্যাম্পাস

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:৩০:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
  • ২৭ Time View
৪৮

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ শিক্ষক চাচ্ছেন পদোন্নতি। উপাচার্যের ভাষ্য, তাদের পদোন্নতি দেব, তবে সেটা হবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অভিন্ন নীতিমালা অনুযায়ী। শিক্ষকরা সেটা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা মেনে পদোন্নতি দিতে হবে। উপাচার্য ও শিক্ষকরা নিজ অবস্থানে অনড়। এ দুই মতের ফ্যাঁকড়ায় অচল ক্যাম্পাস।

শিক্ষকদের শাটডাউনে ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সব বন্ধ। দিন যত যাচ্ছে, সংকট আরও ঘোলাটে হচ্ছে। আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলছেন, এখন পদোন্নতি নয়, উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে হটানোই আমাদের এক দফা।

 

গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে সমকাল। তাদের কেউই এ সংকট সমাধানে আলোর পথ দেখছেন না। অনেকের মতে, সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা আর স্থানীয়ভাবে সমাধানযোগ্য নয়। উপাচার্য সবকিছু খোলাসা করে দিয়েছেন, এখন তিনি চাইলেই শিক্ষকদের দাবি মেনে সমাঝোতায় যেতে পারবেন না। অন্যদিকে, শিক্ষকদেরও আন্দোলন থেকে পিছু হটার সুযোগ নেই।

 

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপক ছিলেন না। ওই বছর সহযোগী আধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদোন্নতি পান ইংরেজি বিভাগের মো. মুহসিন উদ্দিন। এখন পর্যন্ত তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র অধ্যাপক। সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হতে চাচ্ছেন ২৪ জন। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের দাবি, দুই বছর আগে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন তারা। এ দুই বছরে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কারও পদোন্নতি হয়নি।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল কাঠামো ঘেঁটে দেখা গেছে, ৪৯টি অধ্যাপক পদের মধ্যে ইউজিসির ছাড় করা পদ ১১টি। তবে পদোন্নতির দাবিদার ২৪ জন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক বিভাগ আছে, যেখানে অধ্যাপক পদ মাত্র একটি। তবে ওই বিভাগে একাধিক শিক্ষক পদোন্নতি চাচ্ছেন।

 

৭৩টি সহযোগী অধ্যাপক পদের মধ্যে ইউজিসির ছাড় আছে ৩২টি। তবে এ পদে কর্মরত আছেন ৭৯ জন। অর্থাৎ, জনবল কাঠামোর চেয়ে বেশি আছেন ছয়জন। যদি ২৪ জন অধ্যাপক হয়ে যান, তাহলে ২৪টি সহকারী অধ্যাপক পদ শূন্য হবে। কিন্তু সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতি চাচ্ছেন ৩০ সহকারী অধ্যাপক।

 

জনবল কাঠামোতে ১০৯টি সহকারী অধ্যাপক পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ১১০ জন। অর্থাৎ, একজন বেশি আছেন। ইউজিসি ছাড় দিয়েছে ৭৪টি পদের। যদি সহকারী অধ্যাপক ৩০ জন সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতি পান, তাহলে শূন্য সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিপ্রত্যাশী ছয় প্রভাষক। এ ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপকের ২৪টি পদ শূন্য থেকে যাবে।

 

পদোন্নতির দাবির যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে সহযোগী অধ্যাপক মো. কাইউম উদ্দিন  বলেন, অধ্যাপক নিয়োগের জন্য আগে একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। তাই বিধি অনুযায়ী অধ্যাপকের শূন্যপদের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়, অধ্যাপক পদটি ব্লক হয়ে যায়। এখন সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক ও অন্যান্য শূন্যপদে পদবিন্যাসের (আপগ্রেডেশন) মাধ্যমে পদোন্নতি দিতে হবে। তারা সেটাই চাচ্ছেন।

 

কাইউম উদ্দিন অভিযোগ করেন, গত ২০ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বরের মধ্যে পদোন্নতিপ্রত্যাশী ৬০ জনের বিষয়ে সুপারিশ সম্পন্ন হয়। ইউসিজির অভিন্ন নীতিমালার চিঠি পৌঁছে ১ জানুয়ারি। তাই তাদের পদোন্নতিতে ওই চিঠি বাধা নয়।

 

তিনি বলেন, উপাচার্য আমাদের পদোন্নতি দেবেন না। গত ছয় মাসে অর্ধশতাধিক বৈঠক করে আমাদের সঙ্গে টালবাহানা করেছেন। আমরা সাধারণ সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের পদোন্নতি দিতে হবে না, দ্রুত সময়ের মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্য একজন যোগ্য নতুন উপাচার্য চাই।

২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ১৫ বছর। এ পর্যন্ত ছয়জন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। আগের পাঁচ উপাচার্যের দুজন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আন্দোলনের মুখে বিদায় নেন। মেয়াদ পূর্ণ পালন করা উপাচার্যরা হলেন– অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ, অধ্যাপক ড. ইমামুল হক ও অধ্যাপক ড. সাদেকুল আরেফিন। ড. ইমামুল হক মেযাদ পূর্ণ করলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শেষের কয়েক মাস ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়াকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বিদায় করা হয়। এর পর উপাচার্য হন অধ্যাপক ড. শুচিতা শারমিন। তাঁকেও ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন শুরু হলে আট মাসের মাথায় চলে যেতে হয়। এরপর গত বছরের ১৫ মে অন্তর্বর্তী দায়িত্ব পান বর্তমান উপাচার্য ড. তৌফিক আলম। একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি পূর্ণকালীন উপাচার্য হন। বছর পূর্ণ হওয়ার আগে তিনিও শিক্ষকদের এক দফা আন্দোলনের মুখে পড়তে যাচ্ছেন।

পরীক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ থেকে ৩০ এপ্রিল শিক্ষকদের শাটডাউন চলে। এ সময়ের মধ্যে ২১ এপ্রিল একটি, ২২ এপ্রিল দুটি, ২৩, ২৬ ও ২৭ এপ্রিল ৯টি করে, ২৯ এপ্রিল চারটি ও ৩০ এপ্রিল ৯টি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় শাটডাউনে প্রথম দিন গত সোমবার ছয়টি ও মঙ্গলবার দুটি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আজ বুধবার চারটি ও ১৪ এপ্রিল ১৪টি পরীক্ষা বাতিল করতে হবে।

 

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২০-২১ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহরাব হোসেন বলেন, আন্দোলনে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অনার্স শেষ করেছি। মাস্টার্সে ভর্তি হবো। আন্দোলনের কারণে ভর্তি হতে পারছি না।

 

জানতে চাইলে উপাচার্য ড. অধ্যাপক তৌফিক আলম গতকাল রাতে বলেন, আমার সাফ কথা– শিক্ষকদের পদোন্নতি ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী নিতে হবে। সৃষ্ট সংকট সমাধানে শিক্ষকদের অনেকগুলো অপশন দেওয়া আছে। তারা সেগুলো কীভাবে গ্রহণ করবেন, সেটা তাদের বিষয়। আমি আইনের বাইরে যাব না।

 

পবিপ্রবি ও দুমকী প্রতিনিধি জানান, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) আন্দোলনকারী শিক্ষক-কর্মচারীর ওপর হামলার বিচার ও উপাচার্য অপসারণের দাবিতে কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

 

গতকাল সকালে প্রশাসন ভবনের সামনে দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা উপাচার্যের অপসারণ, হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

 

জানা গেছে, গত সোমবার সকালে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন শিক্ষক-কর্মচারীদের একাংশ। তারা উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। কর্মসূচি চলাকালে এক যুবদল নেতার নেতৃত্বে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢুকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়।

 

এ ব্যাপারে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ডিন অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও অপমানজনক ঘটনার প্রতিবাদে আমরা আজ (গতকাল মঙ্গলবার) বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি। ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে সব ধরনের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করেছি।

 

হামলার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আজ বুধবারও একই কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, এ মুহূর্তে আমি ঢাকায় অবস্থান করছি। হামলার ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। কারা হামলা করেছে, কী উদ্দেশ্যে করেছে, সে বিষয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

শিক্ষকদের চলমান শাটডাউন কর্মসূচির মধ্যে ডিফেন্স কার্যক্রম চালুর দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন (এএনএসভিএম) অনুষদের কম্বাইন্ড ২০১৯-২০ সেশনের (সেকশন এ) শিক্ষার্থীরা। পূর্বনির্ধারিত ডিফেন্স স্থগিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা এই কর্মসূচি পালন করেন। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সামনে জড়ো হয়ে ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা।

 

এ বিষয়ে অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. খোন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শিক্ষকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে চলমান শাটডাউনের কারণে ডিফেন্স কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

শিক্ষক-কর্মচারীর ওপর হামলার ঘটনায় দুমকী উপজেলার পাঁচ নেতাকর্মীকে গত সোমবার সন্ধ্যায় বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

 

তারা হলেন– উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মো. বশির উদ্দিন, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আহসান ফারুক ও সুলতান শওকত হোসেন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুসা ফরাজি ও জেলা মহিলা দলের সদস্য হেলেনা খানম।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

পটুয়াখালীতে গাঁজাসহ মাদক মামলার আসামি গ্রেপ্তার

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সরাতে শিক্ষকরা এক দফা আন্দোলন, অচল ক্যাম্পাস

Update Time : ০১:৩০:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
৪৮

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ শিক্ষক চাচ্ছেন পদোন্নতি। উপাচার্যের ভাষ্য, তাদের পদোন্নতি দেব, তবে সেটা হবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অভিন্ন নীতিমালা অনুযায়ী। শিক্ষকরা সেটা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা মেনে পদোন্নতি দিতে হবে। উপাচার্য ও শিক্ষকরা নিজ অবস্থানে অনড়। এ দুই মতের ফ্যাঁকড়ায় অচল ক্যাম্পাস।

শিক্ষকদের শাটডাউনে ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সব বন্ধ। দিন যত যাচ্ছে, সংকট আরও ঘোলাটে হচ্ছে। আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলছেন, এখন পদোন্নতি নয়, উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে হটানোই আমাদের এক দফা।

 

গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে সমকাল। তাদের কেউই এ সংকট সমাধানে আলোর পথ দেখছেন না। অনেকের মতে, সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা আর স্থানীয়ভাবে সমাধানযোগ্য নয়। উপাচার্য সবকিছু খোলাসা করে দিয়েছেন, এখন তিনি চাইলেই শিক্ষকদের দাবি মেনে সমাঝোতায় যেতে পারবেন না। অন্যদিকে, শিক্ষকদেরও আন্দোলন থেকে পিছু হটার সুযোগ নেই।

 

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপক ছিলেন না। ওই বছর সহযোগী আধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদোন্নতি পান ইংরেজি বিভাগের মো. মুহসিন উদ্দিন। এখন পর্যন্ত তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র অধ্যাপক। সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হতে চাচ্ছেন ২৪ জন। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের দাবি, দুই বছর আগে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন তারা। এ দুই বছরে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কারও পদোন্নতি হয়নি।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল কাঠামো ঘেঁটে দেখা গেছে, ৪৯টি অধ্যাপক পদের মধ্যে ইউজিসির ছাড় করা পদ ১১টি। তবে পদোন্নতির দাবিদার ২৪ জন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক বিভাগ আছে, যেখানে অধ্যাপক পদ মাত্র একটি। তবে ওই বিভাগে একাধিক শিক্ষক পদোন্নতি চাচ্ছেন।

 

৭৩টি সহযোগী অধ্যাপক পদের মধ্যে ইউজিসির ছাড় আছে ৩২টি। তবে এ পদে কর্মরত আছেন ৭৯ জন। অর্থাৎ, জনবল কাঠামোর চেয়ে বেশি আছেন ছয়জন। যদি ২৪ জন অধ্যাপক হয়ে যান, তাহলে ২৪টি সহকারী অধ্যাপক পদ শূন্য হবে। কিন্তু সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতি চাচ্ছেন ৩০ সহকারী অধ্যাপক।

 

জনবল কাঠামোতে ১০৯টি সহকারী অধ্যাপক পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ১১০ জন। অর্থাৎ, একজন বেশি আছেন। ইউজিসি ছাড় দিয়েছে ৭৪টি পদের। যদি সহকারী অধ্যাপক ৩০ জন সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতি পান, তাহলে শূন্য সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিপ্রত্যাশী ছয় প্রভাষক। এ ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপকের ২৪টি পদ শূন্য থেকে যাবে।

 

পদোন্নতির দাবির যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে সহযোগী অধ্যাপক মো. কাইউম উদ্দিন  বলেন, অধ্যাপক নিয়োগের জন্য আগে একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। তাই বিধি অনুযায়ী অধ্যাপকের শূন্যপদের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়, অধ্যাপক পদটি ব্লক হয়ে যায়। এখন সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক ও অন্যান্য শূন্যপদে পদবিন্যাসের (আপগ্রেডেশন) মাধ্যমে পদোন্নতি দিতে হবে। তারা সেটাই চাচ্ছেন।

 

কাইউম উদ্দিন অভিযোগ করেন, গত ২০ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বরের মধ্যে পদোন্নতিপ্রত্যাশী ৬০ জনের বিষয়ে সুপারিশ সম্পন্ন হয়। ইউসিজির অভিন্ন নীতিমালার চিঠি পৌঁছে ১ জানুয়ারি। তাই তাদের পদোন্নতিতে ওই চিঠি বাধা নয়।

 

তিনি বলেন, উপাচার্য আমাদের পদোন্নতি দেবেন না। গত ছয় মাসে অর্ধশতাধিক বৈঠক করে আমাদের সঙ্গে টালবাহানা করেছেন। আমরা সাধারণ সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের পদোন্নতি দিতে হবে না, দ্রুত সময়ের মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্য একজন যোগ্য নতুন উপাচার্য চাই।

২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ১৫ বছর। এ পর্যন্ত ছয়জন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। আগের পাঁচ উপাচার্যের দুজন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আন্দোলনের মুখে বিদায় নেন। মেয়াদ পূর্ণ পালন করা উপাচার্যরা হলেন– অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ, অধ্যাপক ড. ইমামুল হক ও অধ্যাপক ড. সাদেকুল আরেফিন। ড. ইমামুল হক মেযাদ পূর্ণ করলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শেষের কয়েক মাস ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়াকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বিদায় করা হয়। এর পর উপাচার্য হন অধ্যাপক ড. শুচিতা শারমিন। তাঁকেও ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন শুরু হলে আট মাসের মাথায় চলে যেতে হয়। এরপর গত বছরের ১৫ মে অন্তর্বর্তী দায়িত্ব পান বর্তমান উপাচার্য ড. তৌফিক আলম। একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি পূর্ণকালীন উপাচার্য হন। বছর পূর্ণ হওয়ার আগে তিনিও শিক্ষকদের এক দফা আন্দোলনের মুখে পড়তে যাচ্ছেন।

পরীক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ থেকে ৩০ এপ্রিল শিক্ষকদের শাটডাউন চলে। এ সময়ের মধ্যে ২১ এপ্রিল একটি, ২২ এপ্রিল দুটি, ২৩, ২৬ ও ২৭ এপ্রিল ৯টি করে, ২৯ এপ্রিল চারটি ও ৩০ এপ্রিল ৯টি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় শাটডাউনে প্রথম দিন গত সোমবার ছয়টি ও মঙ্গলবার দুটি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আজ বুধবার চারটি ও ১৪ এপ্রিল ১৪টি পরীক্ষা বাতিল করতে হবে।

 

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২০-২১ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহরাব হোসেন বলেন, আন্দোলনে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অনার্স শেষ করেছি। মাস্টার্সে ভর্তি হবো। আন্দোলনের কারণে ভর্তি হতে পারছি না।

 

জানতে চাইলে উপাচার্য ড. অধ্যাপক তৌফিক আলম গতকাল রাতে বলেন, আমার সাফ কথা– শিক্ষকদের পদোন্নতি ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী নিতে হবে। সৃষ্ট সংকট সমাধানে শিক্ষকদের অনেকগুলো অপশন দেওয়া আছে। তারা সেগুলো কীভাবে গ্রহণ করবেন, সেটা তাদের বিষয়। আমি আইনের বাইরে যাব না।

 

পবিপ্রবি ও দুমকী প্রতিনিধি জানান, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) আন্দোলনকারী শিক্ষক-কর্মচারীর ওপর হামলার বিচার ও উপাচার্য অপসারণের দাবিতে কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

 

গতকাল সকালে প্রশাসন ভবনের সামনে দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা উপাচার্যের অপসারণ, হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

 

জানা গেছে, গত সোমবার সকালে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন শিক্ষক-কর্মচারীদের একাংশ। তারা উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। কর্মসূচি চলাকালে এক যুবদল নেতার নেতৃত্বে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢুকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়।

 

এ ব্যাপারে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ডিন অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও অপমানজনক ঘটনার প্রতিবাদে আমরা আজ (গতকাল মঙ্গলবার) বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি। ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে সব ধরনের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করেছি।

 

হামলার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আজ বুধবারও একই কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, এ মুহূর্তে আমি ঢাকায় অবস্থান করছি। হামলার ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। কারা হামলা করেছে, কী উদ্দেশ্যে করেছে, সে বিষয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

শিক্ষকদের চলমান শাটডাউন কর্মসূচির মধ্যে ডিফেন্স কার্যক্রম চালুর দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন (এএনএসভিএম) অনুষদের কম্বাইন্ড ২০১৯-২০ সেশনের (সেকশন এ) শিক্ষার্থীরা। পূর্বনির্ধারিত ডিফেন্স স্থগিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা এই কর্মসূচি পালন করেন। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সামনে জড়ো হয়ে ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা।

 

এ বিষয়ে অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. খোন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শিক্ষকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে চলমান শাটডাউনের কারণে ডিফেন্স কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

শিক্ষক-কর্মচারীর ওপর হামলার ঘটনায় দুমকী উপজেলার পাঁচ নেতাকর্মীকে গত সোমবার সন্ধ্যায় বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

 

তারা হলেন– উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মো. বশির উদ্দিন, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আহসান ফারুক ও সুলতান শওকত হোসেন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুসা ফরাজি ও জেলা মহিলা দলের সদস্য হেলেনা খানম।