
নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০১৯ সালে নুসরাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারাগারেই ঠাঁই হয়েছিল পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মণির। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ফেনী জেনারেল হাসপাতালে কন্যা সন্তানের মা হন মণি। হাসপাতালে দুইদিন বাবা-মাসহ পরিবারের সান্নিধ্য পায় শিশুটি।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মণিসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আদালতে মণি শুধু নিজেই এই রায় শোনেননি, রায় শুনেছেন তার এক মাস বয়সী নবজাতকও। এরপর থেকে মায়ের সঙ্গে কারাগারের অন্ধ কুঠুরিতে বড় হতে থাকে শিশু মোবাশ্বিরা খানম রাথী।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সোমবার খালাস পাওয়া ১০ আসামির একজন মণি। এর মধ্য দিয়ে ৭ বছর পর মেয়ের সান্নিধ্য পেতে যাচ্ছেন রাথীর বাবা রাশেদুল আলম খান।
আবেগাপ্লুত হয়ে সোমবার রাতে ফেসবুকে এক দীর্ঘ আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। যেখানে দীর্ঘদিন মেয়ের সান্নিধ্য না পাওয়ার আক্ষেপ, মেয়েকে আদর করতে না পারার কষ্ট এবং মেয়ের কাছে অচেনা হয়ে যাওয়ার ভয়ের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।
রাশেদুল আলম লেখেন, “বাবা হয়েও বাবা হওয়ার স্বাদ পেলাম না আজও আমি! খুব ইচ্ছে করত রাথীকে বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য, সুযোগ ছিল না কড়া নিরাপত্তার জন্য। জেলখানায় স্পেশাল করে দেখা করা যেত ফেনী কারাগারে। জানালার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট পায়ের আঙুল ছুঁয়ে দিতাম। মুখে হাত লাগিয়ে আদর করতাম, তাও দূর থেকে। কাশিমপুর চলে যাওয়ার পরে মাঝখানে ২ ফুট গ্যাপের খাঁচা, ঠিকমতো মেয়েটা দেখতেই পারে না আমাকে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত সেই নয়নজুড়ানো কালো দুটি চোখে। আমাকে চিনত না সে, চিনবেই বা কেমনে, দেখাই তো যায় না খাঁচার ভেতর দিয়ে।
তিনি লেখেন, “এইভাবেই সময় অতিবাহিত হচ্ছিল। সারাদিন সবার সাথে হাসিখুশি থেকে রাতভর যন্ত্রণায় ছটফট করা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। আমাকে অনেকেই জ্ঞান দিত, স্ত্রীর সাথে শুয়ে কিংবা বাচ্চা বুকে নিয়ে। বাস্তবতা আমি পার করেছি, আর্তনাদ এক আল্লাহ ছাড়া কেউ শোনেনি।
রাশেদুল আলম খান লেখেন, আজ প্রায় অনেকদিন মেয়েটার সাথে দেখা হয় না, শুক্রবারে একটু কথাও হয় না মোবাইলে। বুকের ভেতর চাপা কষ্ট কোনোদিন কাউকে বুঝতে দিইনি। আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম, যে ক্ষতি নিজের আমি করেছি, কোনোদিন আমাকে আমি যদি ক্ষমা করতে চাই, পারব? ১৯ সালে প্রশাসন দ্বারা মারা গেলে কিংবা আমাকে গুম করে ফেললে কী হতো? শুধু মেয়েটাকে কোলে নেব, ইচ্ছেমতো আদর করব-এই আশায় বুক বেঁধে ছিলাম।
তিনি লেখেন, “ঝড় থেকে যাদের রক্ষা করতে ছাতা নিয়ে ঝড়ের মধ্যে দৌড়েছি, তারাও দরজা বন্ধ করে আমাকে ঝড়ের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। কষ্ট এক দিক থেকে পাইনি, এমন অবস্থা হয়েছে, এখন সব সয়ে গেছে আমার। মেয়েটা ফিরে আসুক, বাবা হওয়ার প্রথম স্পর্শ, প্রথম আলিঙ্গন বুকটা ভরিয়ে দিক। আর কিছুই চাওয়ার নেই আমার।
মেয়েকে নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে রাশেদুল আলম খান লেখেন, “এই সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ রাথির ৭ বছর পূর্ণ হবে। তাকে ছাড়া ১৪টা ঈদ, ৭টা জন্মদিন আমি পার করেছি। কী নিষ্ঠুর বাবা আমি। মেয়েটার জন্য কিছুই করতে পারিনি আমি। আমার প্রতিটা মুহূর্তের এক আল্লাহ সাক্ষী আছেন। জানি না আমাকে চিনবে কি না রাথী, জানি না আমি কিভাবে তার সামনে দাঁড়াব। অস্থির অস্থির লাগছে আমার।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
শিশুটির নাম রাখা হয় মোবাশ্বিরা খানম রাথী। মণির স্বামীর দাবি, নুসরাত জাহান রাফির নামানুসারে তার নাম রাখা হয়েছিল। যদিও মণি তার মেয়েকে ‘রোজা’ নামে ডাকেন বলে জানা গেছে।
Reporter Name 














