ঢাকা ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এবার যশোর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:১৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
  • ২৬ Time View
৫১

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকার পর এবার যশোর আদ-দ্বীনে ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের অবহেলায় ইমরান (৩৫) নামে এক মাছ ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। পরে হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ করেন রোগীর স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে যশোরের পুলেরহাট এলাকায় আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল চত্বরে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং মৃতের স্বজনসহ স্থানীয় জনতা দফায় দফায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

মৃত ইমরান যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া গাজীপাড়ার শওকত আলী বিশ্বাসের ছেলে। তিনি পেশায় একজন মাছ ব্যবসায়ী এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন।

ইমরানের পরিবারের ভাষ্য, তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ইমরানকে বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটার দিকে আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। ওই সময় জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক সুপান্ত ভৌমিক তাকে ভর্তি করে পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে পাঠান। ওয়ার্ডে কর্তব্যরত সহকারী রেজিস্টার ডা. রাহাত ও মেডিকেল অফিসার ডা. মুন্নি রোগীকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই একের পর এক ইনজেকশন প্রয়োগ করেন।

খালাতো ভাই ইসমাইল হোসেন অভিযোগ করেন, প্রথম ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই ইমরান তীব্র অস্বস্তি বোধ করছিলেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের জানানো হলেও তারা কোনো গুরুত্ব দেননি। এরপর পরবর্তী ইনজেকশন দেওয়ার সাথে সাথেই ইমরানের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। তখন রোগীকে হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে ভুল ইনজেকশন ও অবহেলায় ইমরানের মৃত্যু হয়েছে- এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে তার স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা দায়ী চিকিৎসকদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেন। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, এই হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যু এবং সিজার, অপারেশন ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ ইতিপূর্বে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য বিভাগে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো সুফল পাননি।

সবশেষ এ ঘটনার পর মৃতের বাবা শওকত আলী বিশ্বাস বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ (সাধারণ ডায়েরি) করেছেন।

তবে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইমদাদ হোসেন। তিনি দাবি করেন, রোগীকে নিয়ম মেনেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। রোগীকে গ্যাসের ইনজেকশন, এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন ও স্যালাইন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে জীবন রক্ষাকারী শেষ ইনজেকশন ‘হাইসোমাইড’ রোগীর শরীরে পুশ করা হয়।

ডা. ইমদাদ দাবি করেন, এর বাইরে অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি। রোগী জ্বরের হিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হলেও অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে মারা গেছেন।

মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি প্রাথমিকভাবে হৃদরোগের কারণে মৃত্যুর কথা জানান।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ‘রাতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। তবে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি। রোববার অফিস খুললে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দরকার হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুম খান বলেন, রাতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ঘটনার পর হাসপাতাল এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্ব পালন করছেন। মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, যশোর শহরের রেল রোডে আদ-দ্বীন হাসপাতালের গোড়াপত্তন হয়। এই হাসপাতালটিতে একসময় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় নিয়মিত রোগী মৃত্যুর অভিযোগ উঠতো। বিক্ষুব্ধ লোকজন এখানে অনেকবার ভাঙচুরও করেছেন। আলো-বাতাসের সংকট থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত প্রসূতি ও শিশুদের জন্য।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জলাবদ্ধতা নিরসন, রাস্তা সংস্কার, দান-অনুদানে প্রশংসায় ভাসছে যুবনেতা আতিক ওসমানী 

এবার যশোর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ

Update Time : ০৯:১৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
৫১

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকার পর এবার যশোর আদ-দ্বীনে ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের অবহেলায় ইমরান (৩৫) নামে এক মাছ ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। পরে হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ করেন রোগীর স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে যশোরের পুলেরহাট এলাকায় আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল চত্বরে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং মৃতের স্বজনসহ স্থানীয় জনতা দফায় দফায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

মৃত ইমরান যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া গাজীপাড়ার শওকত আলী বিশ্বাসের ছেলে। তিনি পেশায় একজন মাছ ব্যবসায়ী এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন।

ইমরানের পরিবারের ভাষ্য, তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ইমরানকে বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটার দিকে আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। ওই সময় জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক সুপান্ত ভৌমিক তাকে ভর্তি করে পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে পাঠান। ওয়ার্ডে কর্তব্যরত সহকারী রেজিস্টার ডা. রাহাত ও মেডিকেল অফিসার ডা. মুন্নি রোগীকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই একের পর এক ইনজেকশন প্রয়োগ করেন।

খালাতো ভাই ইসমাইল হোসেন অভিযোগ করেন, প্রথম ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই ইমরান তীব্র অস্বস্তি বোধ করছিলেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের জানানো হলেও তারা কোনো গুরুত্ব দেননি। এরপর পরবর্তী ইনজেকশন দেওয়ার সাথে সাথেই ইমরানের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। তখন রোগীকে হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে ভুল ইনজেকশন ও অবহেলায় ইমরানের মৃত্যু হয়েছে- এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে তার স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা দায়ী চিকিৎসকদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেন। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, এই হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যু এবং সিজার, অপারেশন ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ ইতিপূর্বে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য বিভাগে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো সুফল পাননি।

সবশেষ এ ঘটনার পর মৃতের বাবা শওকত আলী বিশ্বাস বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ (সাধারণ ডায়েরি) করেছেন।

তবে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইমদাদ হোসেন। তিনি দাবি করেন, রোগীকে নিয়ম মেনেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। রোগীকে গ্যাসের ইনজেকশন, এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন ও স্যালাইন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে জীবন রক্ষাকারী শেষ ইনজেকশন ‘হাইসোমাইড’ রোগীর শরীরে পুশ করা হয়।

ডা. ইমদাদ দাবি করেন, এর বাইরে অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি। রোগী জ্বরের হিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হলেও অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে মারা গেছেন।

মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি প্রাথমিকভাবে হৃদরোগের কারণে মৃত্যুর কথা জানান।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ‘রাতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। তবে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি। রোববার অফিস খুললে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দরকার হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুম খান বলেন, রাতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ঘটনার পর হাসপাতাল এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্ব পালন করছেন। মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, যশোর শহরের রেল রোডে আদ-দ্বীন হাসপাতালের গোড়াপত্তন হয়। এই হাসপাতালটিতে একসময় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় নিয়মিত রোগী মৃত্যুর অভিযোগ উঠতো। বিক্ষুব্ধ লোকজন এখানে অনেকবার ভাঙচুরও করেছেন। আলো-বাতাসের সংকট থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত প্রসূতি ও শিশুদের জন্য।