ঢাকা ০৭:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপকূলীয় দুমকী উপজেলায় লবণাক্ততা-সহনশীল ধান চাষে কৃষকের ভাগ্য বদল

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:২২:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
  • ০ Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক : জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ সক্ষমতা জোরদারে জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি কীভাবে কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলা।

 

জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন ২০২৬-২৭ অনুযায়ী, ‘জলবায়ু স্মার্ট কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’-এর অধীনে বাস্তবায়িত এই উদ্যোগের মাধ্যমে পতিত লবণাক্ত জমি উৎপাদনশীল ফসলি জমিতে রূপান্তরি হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজনের একটি বাস্তবমুখী দৃষ্টান্ত।

 

উপজেলার মুরাদিয়া ইউনিয়নের এক কেসস্টাডিতে দেখা যায়, স্থানীয় এক কৃষকের জমি মাঝারি লবণাক্ততার কারণে রবি ও বোরো মৌসুমে অনাবাদী থাকত। ফলে তিনি বছরে কেবল একটি ফসল, রোপা আমন ধান চাষ করতে পারতেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকল্পের পক্ষ থেকে ওই কৃষককে সার এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ‘ব্রি ধান-৬৭’-এর বীজ দেওয়া হয়। এই জাতটি ৮ ডিএস/মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।

 

এই সহায়তার মাধ্যমে কৃষক তার পূর্বে পতিত থাকা ৫০ ডেসিমোল (শতক) জমিতে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করেন। ফলাফল ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ওই কৃষক প্রায় ২৯ মণ ধান ঘরে তোলেন, যা হেক্টর প্রতি ৫.৬ মেট্রিক টন ফলন হয়। মোট উৎপাদনের মধ্যে ২০ মণ ধান বিক্রি করেন প্রতি মণ ১ হাজার ৩৬০ টাকা দরে। এতে আয় হয় ২৭ হাজার ২০০ টাকা। বাকি ৯ মণ ধান পরিবারের খাওয়ার জন্য রেখে দেন, যা তাদের পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে।

 

এই উদ্যোগে একক-ফসল থেকে দোফসলি চাষাবাদের দিকে যাওয়ার পথ সুগম হয়েছে। এতে জলবায়ু-জনিত ঝুঁকি হ্রাস এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে।

 

কৃষকদের এই অভিজ্ঞতা কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং অভিযোজনমূলক ব্যবস্থায় লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারের জাতীয় প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে।

 

জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন ২০২৬-২৭-এর মুখবন্ধে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ ধরনের উদ্যোগে জলবায়ু অর্থায়নের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যাত্রার সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়টি সরাসরি জড়িত। এই প্রেক্ষাপটে, জলবায়ু অর্থায়ন কেবল একটি সহায়তার উৎস নয়; এটি সহনশীলতা, উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি।

 

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ‘আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই, সবুজ, জলবায়ু-সহনশীল এবং বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষায়’ সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

দুমকীর এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, কীভাবে জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি এবং সঠিক সহায়তা উপকূলীয় কৃষকদের পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে; পাশাপাশি তাদের আয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

গৌরনদীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিকআপ উল্টে আহত ২

উপকূলীয় দুমকী উপজেলায় লবণাক্ততা-সহনশীল ধান চাষে কৃষকের ভাগ্য বদল

Update Time : ১১:২২:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ সক্ষমতা জোরদারে জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি কীভাবে কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলা।

 

জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন ২০২৬-২৭ অনুযায়ী, ‘জলবায়ু স্মার্ট কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’-এর অধীনে বাস্তবায়িত এই উদ্যোগের মাধ্যমে পতিত লবণাক্ত জমি উৎপাদনশীল ফসলি জমিতে রূপান্তরি হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজনের একটি বাস্তবমুখী দৃষ্টান্ত।

 

উপজেলার মুরাদিয়া ইউনিয়নের এক কেসস্টাডিতে দেখা যায়, স্থানীয় এক কৃষকের জমি মাঝারি লবণাক্ততার কারণে রবি ও বোরো মৌসুমে অনাবাদী থাকত। ফলে তিনি বছরে কেবল একটি ফসল, রোপা আমন ধান চাষ করতে পারতেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকল্পের পক্ষ থেকে ওই কৃষককে সার এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ‘ব্রি ধান-৬৭’-এর বীজ দেওয়া হয়। এই জাতটি ৮ ডিএস/মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।

 

এই সহায়তার মাধ্যমে কৃষক তার পূর্বে পতিত থাকা ৫০ ডেসিমোল (শতক) জমিতে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করেন। ফলাফল ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ওই কৃষক প্রায় ২৯ মণ ধান ঘরে তোলেন, যা হেক্টর প্রতি ৫.৬ মেট্রিক টন ফলন হয়। মোট উৎপাদনের মধ্যে ২০ মণ ধান বিক্রি করেন প্রতি মণ ১ হাজার ৩৬০ টাকা দরে। এতে আয় হয় ২৭ হাজার ২০০ টাকা। বাকি ৯ মণ ধান পরিবারের খাওয়ার জন্য রেখে দেন, যা তাদের পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে।

 

এই উদ্যোগে একক-ফসল থেকে দোফসলি চাষাবাদের দিকে যাওয়ার পথ সুগম হয়েছে। এতে জলবায়ু-জনিত ঝুঁকি হ্রাস এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে।

 

কৃষকদের এই অভিজ্ঞতা কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং অভিযোজনমূলক ব্যবস্থায় লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারের জাতীয় প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে।

 

জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন ২০২৬-২৭-এর মুখবন্ধে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ ধরনের উদ্যোগে জলবায়ু অর্থায়নের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যাত্রার সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়টি সরাসরি জড়িত। এই প্রেক্ষাপটে, জলবায়ু অর্থায়ন কেবল একটি সহায়তার উৎস নয়; এটি সহনশীলতা, উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি।

 

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ‘আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই, সবুজ, জলবায়ু-সহনশীল এবং বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষায়’ সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

দুমকীর এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, কীভাবে জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি এবং সঠিক সহায়তা উপকূলীয় কৃষকদের পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে; পাশাপাশি তাদের আয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।