ঢাকা ১২:২৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভোলার মাটিতে চিরনিদ্রায় তোফায়েল আহমেদ, মা-বাবা ও স্ত্রীর পাশে সমাহিত

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:৫৭:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
  • ১২ Time View
২২

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল প্রবীণ রাজনীতিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের দাফনের মধ্য দিয়ে। মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেলে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবা ও প্রয়াত স্ত্রীর কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে হাজারো মানুষ ভিড় করেন তাঁর জন্মভূমিতে।

সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তোফায়েল আহমেদ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও বার্ধক্যজনিত জটিলতা নিয়ে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। প্রায় আট মাস চিকিৎসার পর তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারযোগে তাঁর মরদেহ ভোলায় নেওয়া হয়। বেলা আড়াইটার দিকে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় জানাজা। সেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। জানাজায় রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেন।

জানাজার আগে বক্তব্য দেন ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর এবং তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন। জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা মুফতি মজিরুদ্দিন।

পরে মরদেহ নেওয়া হয় তাঁর গ্রামের বাড়ি কোড়ালিয়ায়। বিকেলে বাড়ি সংলগ্ন মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শেষ জানাজা। এরপর বেলা সোয়া ৪টার দিকে কিংবা বিকেলের শেষ ভাগে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে ভোলাজুড়ে ছিল শোকের আবহ। গ্রামের বাড়িতে সকাল থেকেই জড়ো হতে থাকেন স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকেই শেষবারের মতো প্রিয় নেতাকে শ্রদ্ধা জানান।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদ ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে জাতীয় অঙ্গনে উঠে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ স্থান করে নেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ‘মুজিব বাহিনী’র চার আঞ্চলিক প্রধানের একজন ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই রাজনীতিককে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে স্মরণ করছেন তাঁর সহকর্মী ও অনুসারীরা। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ঝালকাঠিতে আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতাসহ ২৫ জনের ৩৩টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল

ভোলার মাটিতে চিরনিদ্রায় তোফায়েল আহমেদ, মা-বাবা ও স্ত্রীর পাশে সমাহিত

Update Time : ০১:৫৭:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
২২

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল প্রবীণ রাজনীতিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের দাফনের মধ্য দিয়ে। মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেলে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবা ও প্রয়াত স্ত্রীর কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে হাজারো মানুষ ভিড় করেন তাঁর জন্মভূমিতে।

সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তোফায়েল আহমেদ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও বার্ধক্যজনিত জটিলতা নিয়ে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। প্রায় আট মাস চিকিৎসার পর তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারযোগে তাঁর মরদেহ ভোলায় নেওয়া হয়। বেলা আড়াইটার দিকে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় জানাজা। সেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। জানাজায় রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেন।

জানাজার আগে বক্তব্য দেন ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর এবং তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন। জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা মুফতি মজিরুদ্দিন।

পরে মরদেহ নেওয়া হয় তাঁর গ্রামের বাড়ি কোড়ালিয়ায়। বিকেলে বাড়ি সংলগ্ন মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শেষ জানাজা। এরপর বেলা সোয়া ৪টার দিকে কিংবা বিকেলের শেষ ভাগে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে ভোলাজুড়ে ছিল শোকের আবহ। গ্রামের বাড়িতে সকাল থেকেই জড়ো হতে থাকেন স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকেই শেষবারের মতো প্রিয় নেতাকে শ্রদ্ধা জানান।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদ ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে জাতীয় অঙ্গনে উঠে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ স্থান করে নেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ‘মুজিব বাহিনী’র চার আঞ্চলিক প্রধানের একজন ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই রাজনীতিককে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে স্মরণ করছেন তাঁর সহকর্মী ও অনুসারীরা। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।