ঢাকা ১২:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাইবার বুলিংয়ের শিকার বরিশালের দুই-তৃতীয়াংশ তরুণী

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:২৯:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
  • ৩ Time View
১০

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভার্চুয়াল দুনিয়া যেন দিন দিন নারীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে প্রতিনিয়ত নারীদের শিকার হতে হচ্ছে সাইবার বুলিংয়ের। ফেক আইডি খুলে ছবি বিকৃত করা, ইনবক্সে আপত্তিকর প্রস্তাব পাঠানো কিংবা মন্তব্যের ঘরে চরিত্র হননের মতো নোংরা খেলায় মেতে উঠছে এক শ্রেণির বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তিরা।

 

বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া নারীদের দুই-তৃতীয়াংশই ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণী। গত তিন বছরে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন চার নারী।

 

বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানজিন সিফা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন স্বাধীনভাবে একটা ছবি পোস্ট করার পরিবেশও নেই। ফেক আইডি খুলে ছবি বিকৃত করে ব্ল্যাকমেইল করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মেয়েরা প্রতিনিয়ত এক ধরণের মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।

 

একই সুর বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীর সানজিদার কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘ইনবক্সে অপরিচিত আইডি থেকে নোংরা ও আপত্তিকর প্রস্তাব আসাটা এখন নিয়মিত বিষয়। অনেক সময় এসবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। সাইবার অপরাধীদের কঠোর শাস্তি না হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।’

সরকারি বিএম কলেজের শিক্ষার্থী সুমি হক নিজের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেক সময় পরিচিত বা অপরিচিত মানুষজন ফেক আইডি তৈরি করে কমেন্ট বক্সে চরিত্র হননের চেষ্টা করে। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই এগুলো মুখ বুজে সহ্য করে, যা পরবর্তীতে বড় ধরণের মানসিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। এই নোংরা খেলা বন্ধ হওয়া জরুরি।

 

এদিকে ভার্চুয়াল অপরাধ ঠেকাতে বরিশালে নারীদের সাইবার নিরাপত্তায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে জাতীয় মহিলা সংস্থা।

এ বিষয়ে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফারহানা আইরিছ বলেন, ‘সাইবার বুলিংয়ের শিকার নারীদের সিংহভাগই তরুণী। আমরা তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। তবে শুধু সচেতনতা নয়, নারীদের আইনি অধিকার সম্পর্কেও জানতে হবে এবং যেকোনো হেনস্তার বিরুদ্ধে শুরুতেই আওয়াজ তুলতে হবে।

আদালত সূত্র‍ে জানা গেছে, বর্তমানে বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে ৫৩৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১৮০টি সাইবার ট্রাইব্যুনাল মামলা, ৩৪৭টি সাইবার ট্রাইব্যুনাল পিটিশন মামলা এবং ৯টি জিডি রয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে ১০টি মামলার।

বেসরকারী সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে গত ৩ বছরে বরিশাল বিভাগে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন অন্তত চার নারী। এদের মধ্যে ২০২৩ সালের ১২ মার্চ বরগুনার তালতলীতে মেয়ের আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার অপমানে মা আত্মহত্যা করেন। এছাড়া ২০২৫ সালে দুইজন নারী শিক্ষার্থী এবং সবশেষ চলতি বছরের ১৫ জুন পিরোজপুরের জিয়ানগরে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক স্কুলছাত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে পড়ায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

​এমন পরিস্থিতিতে সচেতনতা বাড়ানোর সঙ্গে জেলাভিত্তিক বিশেষ সেলের মাধ্যমে আইনি ও মানসিক সহায়তা দেয়ার কথা বলছে বিভাগীয় প্রশাসন।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান জানান, ‘সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। নারীদের সাইবার সুরক্ষায় এবং তাদের তাৎক্ষণিক আইনি ও মানসিক সহায়তা দিতে জেলাভিত্তিক বিশেষ সেল গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। একই সাথে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

সাইবার বুলিংয়ের শিকার বরিশালের দুই-তৃতীয়াংশ তরুণী

Update Time : ০২:২৯:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
১০

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভার্চুয়াল দুনিয়া যেন দিন দিন নারীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে প্রতিনিয়ত নারীদের শিকার হতে হচ্ছে সাইবার বুলিংয়ের। ফেক আইডি খুলে ছবি বিকৃত করা, ইনবক্সে আপত্তিকর প্রস্তাব পাঠানো কিংবা মন্তব্যের ঘরে চরিত্র হননের মতো নোংরা খেলায় মেতে উঠছে এক শ্রেণির বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তিরা।

 

বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া নারীদের দুই-তৃতীয়াংশই ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণী। গত তিন বছরে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন চার নারী।

 

বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানজিন সিফা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন স্বাধীনভাবে একটা ছবি পোস্ট করার পরিবেশও নেই। ফেক আইডি খুলে ছবি বিকৃত করে ব্ল্যাকমেইল করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মেয়েরা প্রতিনিয়ত এক ধরণের মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।

 

একই সুর বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীর সানজিদার কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘ইনবক্সে অপরিচিত আইডি থেকে নোংরা ও আপত্তিকর প্রস্তাব আসাটা এখন নিয়মিত বিষয়। অনেক সময় এসবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। সাইবার অপরাধীদের কঠোর শাস্তি না হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।’

সরকারি বিএম কলেজের শিক্ষার্থী সুমি হক নিজের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেক সময় পরিচিত বা অপরিচিত মানুষজন ফেক আইডি তৈরি করে কমেন্ট বক্সে চরিত্র হননের চেষ্টা করে। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই এগুলো মুখ বুজে সহ্য করে, যা পরবর্তীতে বড় ধরণের মানসিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। এই নোংরা খেলা বন্ধ হওয়া জরুরি।

 

এদিকে ভার্চুয়াল অপরাধ ঠেকাতে বরিশালে নারীদের সাইবার নিরাপত্তায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে জাতীয় মহিলা সংস্থা।

এ বিষয়ে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফারহানা আইরিছ বলেন, ‘সাইবার বুলিংয়ের শিকার নারীদের সিংহভাগই তরুণী। আমরা তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। তবে শুধু সচেতনতা নয়, নারীদের আইনি অধিকার সম্পর্কেও জানতে হবে এবং যেকোনো হেনস্তার বিরুদ্ধে শুরুতেই আওয়াজ তুলতে হবে।

আদালত সূত্র‍ে জানা গেছে, বর্তমানে বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে ৫৩৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১৮০টি সাইবার ট্রাইব্যুনাল মামলা, ৩৪৭টি সাইবার ট্রাইব্যুনাল পিটিশন মামলা এবং ৯টি জিডি রয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে ১০টি মামলার।

বেসরকারী সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে গত ৩ বছরে বরিশাল বিভাগে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন অন্তত চার নারী। এদের মধ্যে ২০২৩ সালের ১২ মার্চ বরগুনার তালতলীতে মেয়ের আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার অপমানে মা আত্মহত্যা করেন। এছাড়া ২০২৫ সালে দুইজন নারী শিক্ষার্থী এবং সবশেষ চলতি বছরের ১৫ জুন পিরোজপুরের জিয়ানগরে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক স্কুলছাত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে পড়ায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

​এমন পরিস্থিতিতে সচেতনতা বাড়ানোর সঙ্গে জেলাভিত্তিক বিশেষ সেলের মাধ্যমে আইনি ও মানসিক সহায়তা দেয়ার কথা বলছে বিভাগীয় প্রশাসন।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান জানান, ‘সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। নারীদের সাইবার সুরক্ষায় এবং তাদের তাৎক্ষণিক আইনি ও মানসিক সহায়তা দিতে জেলাভিত্তিক বিশেষ সেল গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। একই সাথে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।’