ঢাকা ১০:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেতাগীতে নামের ভুলে গ্রেপ্তার নির্দোষ নারী! এর দায় কে নিবে?

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:৩৭:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
  • ৭০ Time View
১০৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : শুধুমাত্র নামের মিলের কারণে এক নিরপরাধ গৃহবধূকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগী উপজেলায়। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আদালত এবং কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ জারি করেছেন।

 

ঘটনাটি ঘটে বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের ধনমানিক চত্রা গ্রামে। জানা গেছে, এনজিও RDF (আরডিএফ)-এর দায়ের করা এক মামলায় মূল অভিযুক্ত ছিলেন মোহাম্মদ খলিলুর রহমানের স্ত্রী মোসা. রেহেনা বেগম। কিন্তু নামের মিল থাকায় পুলিশ প্রকৃত আসামির পরিবর্তে একই গ্রামের খলিল খানের স্ত্রী রেহেনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি আদালতে সোপর্দ করে।

 

নিরপরাধ রেহেনা বেগমের পরিবার বিষয়টি নিয়ে ১ মার্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রমাণাদি উপস্থাপনের পর স্পষ্ট হয় যে, গ্রেপ্তারকৃত নারী মামলার প্রকৃত আসামি নন। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত খলিল খানের স্ত্রী রেহেনা বেগমকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে জামিন মঞ্জুর করেন।

 

এ ঘটনায় তদন্তে গাফিলতি ও ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কেন এই ভুল হলো এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না—তা জানতে চেয়ে আদালত শো-কজ নোটিশ প্রদান করেছেন। বিষয়টি বিভাগীয় তদন্তের জন্য বরগুনা পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

বরগুনা জজ কোর্টের আইনজীবী নারগীস পারভীন (সুরমা) বলেন, আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

 

ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী রেহেনা বেগমের ছোট ছেলে মো. রিপন খান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমরা বারবার পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু কেউ শুনেনি। আমার মায়ের অপরাধ কী? পবিত্র রমজান মাসে বিনা দোষে তাকে দুই দিন হাজতে থাকতে হলো কেন?

 

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য ও উপজেলা মহিলা দলের আহ্বায়ক মো. পিয়ারা বেগম বলেন, “এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও পুলিশের চরম গাফিলতির বহিঃপ্রকাশ। গ্রেপ্তারের আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করলে এমন ভুল হতো না। আমরা চাই প্রকৃত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হোক এবং দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

 

এ বিষয়ে আরডিএফ বেতাগী শাখার ব্যবস্থাপক মো. ফারুক হোসেন বলেন, “শুরুতে আমরা বিষয়টি জানতাম না। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হলে যথাসম্ভব সহযোগিতা করেছি। আইনি বিধান অনুযায়ীই মামলা করা হয়েছিল।”

 

বেতাগী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জুয়েল ইসলাম বলেন, “তথ্য বিভ্রাটের কারণেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। আমরা মর্মাহত ও দুঃখিত। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক।

 

নামের সামান্য বিভ্রাটে এক নিরপরাধ গৃহবধূর কারাবাস—এই ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটিই নয়, বরং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সচেতন মহলের দাবি, এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই পারে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

তালতলীতে মর্গে মরদেহ নিতে গিয়ে দুই পক্ষের হাতাহাতি

বেতাগীতে নামের ভুলে গ্রেপ্তার নির্দোষ নারী! এর দায় কে নিবে?

Update Time : ১০:৩৭:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
১০৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : শুধুমাত্র নামের মিলের কারণে এক নিরপরাধ গৃহবধূকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগী উপজেলায়। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আদালত এবং কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ জারি করেছেন।

 

ঘটনাটি ঘটে বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের ধনমানিক চত্রা গ্রামে। জানা গেছে, এনজিও RDF (আরডিএফ)-এর দায়ের করা এক মামলায় মূল অভিযুক্ত ছিলেন মোহাম্মদ খলিলুর রহমানের স্ত্রী মোসা. রেহেনা বেগম। কিন্তু নামের মিল থাকায় পুলিশ প্রকৃত আসামির পরিবর্তে একই গ্রামের খলিল খানের স্ত্রী রেহেনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি আদালতে সোপর্দ করে।

 

নিরপরাধ রেহেনা বেগমের পরিবার বিষয়টি নিয়ে ১ মার্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রমাণাদি উপস্থাপনের পর স্পষ্ট হয় যে, গ্রেপ্তারকৃত নারী মামলার প্রকৃত আসামি নন। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত খলিল খানের স্ত্রী রেহেনা বেগমকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে জামিন মঞ্জুর করেন।

 

এ ঘটনায় তদন্তে গাফিলতি ও ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কেন এই ভুল হলো এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না—তা জানতে চেয়ে আদালত শো-কজ নোটিশ প্রদান করেছেন। বিষয়টি বিভাগীয় তদন্তের জন্য বরগুনা পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

বরগুনা জজ কোর্টের আইনজীবী নারগীস পারভীন (সুরমা) বলেন, আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

 

ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী রেহেনা বেগমের ছোট ছেলে মো. রিপন খান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমরা বারবার পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু কেউ শুনেনি। আমার মায়ের অপরাধ কী? পবিত্র রমজান মাসে বিনা দোষে তাকে দুই দিন হাজতে থাকতে হলো কেন?

 

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য ও উপজেলা মহিলা দলের আহ্বায়ক মো. পিয়ারা বেগম বলেন, “এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও পুলিশের চরম গাফিলতির বহিঃপ্রকাশ। গ্রেপ্তারের আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করলে এমন ভুল হতো না। আমরা চাই প্রকৃত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হোক এবং দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

 

এ বিষয়ে আরডিএফ বেতাগী শাখার ব্যবস্থাপক মো. ফারুক হোসেন বলেন, “শুরুতে আমরা বিষয়টি জানতাম না। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হলে যথাসম্ভব সহযোগিতা করেছি। আইনি বিধান অনুযায়ীই মামলা করা হয়েছিল।”

 

বেতাগী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জুয়েল ইসলাম বলেন, “তথ্য বিভ্রাটের কারণেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। আমরা মর্মাহত ও দুঃখিত। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক।

 

নামের সামান্য বিভ্রাটে এক নিরপরাধ গৃহবধূর কারাবাস—এই ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ত্রুটিই নয়, বরং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সচেতন মহলের দাবি, এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই পারে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে।