ঢাকা ০১:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পৃথিবীতে আসার আগেই বাবাকে হারাল ফুটফুটে নবজাতক

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৫৭:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
  • ৪৫ Time View
৯৭

নিজস্ব প্রতিবেদক : মায়ের বুকে জড়িয়ে আছে ফুটফুটে এক নবজাতক। ছোট্ট শিশুটির আগমনে একটি পরিবারে আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই আনন্দকে ছাপিয়ে আছে বেদনা, শূন্যতা আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া। কারণ যে শিশুটিকে ঘিরে বাবার ছিল হাজারো স্বপ্ন, সে পৃথিবীতে এসেছে বাবার মুখ না দেখেই।

ঢাকার সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো সোহেল ফকিরের স্ত্রী নূর আফরিন রুবার কোলজুড়ে জন্ম নিয়েছে একটি পুত্র সন্তান। মঙ্গলবার (৯ জুন) ভোরে বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকায় বাবার বাড়িতে সন্তানের জন্ম দেন তিনি। নবজাতকের নাম রাখা হয়েছে ‘রাইয়ান ইসলাম’ যে নামটি মৃত্যুর আগেই ঠিক করে গিয়েছিলেন সোহেল। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখার সেই সৌভাগ্য আর হয়নি তার।

মাত্র তিন মাস আগে ঈদযাত্রার পথে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় স্বামী ও শ্বশুরকে হারিয়েছেন রুবা। নিজেও হয়েছেন গুরুতর আহত। এখনও তার পায়ে রড বসানো রয়েছে। চিকিৎসকের নির্দেশে চলাফেরা প্রায় বন্ধ। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তেও তাই তার চোখে আনন্দের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।

“সোহেল বেঁচে থাকলে আজ সবচেয়ে বেশি খুশি হতো” কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রুবা।

তিনি বলেন, আমাদের সন্তানকে নিয়ে ওর অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলে হলে নাম রাখবে রাইয়ান ইসলাম এ কথাও আগেই বলেছিল। আল্লাহ ছেলে দিয়েছেন, ওর পছন্দ করা নামই রেখেছি। কিন্তু ছেলেটাকে একবার কোলে নেওয়ার আগেই সে চলে গেছে। এখন ওর স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমার। কিন্তু আমি নিজেই অসহায়।

চলতি বছরের ১৮ মার্চ, পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি উপলক্ষে স্ত্রী ও বাবাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে ফিরছিলেন সোহেল ফকির (২২)। রাজধানীর সদরঘাটে ট্রলারযোগে এমভি আসা-যাওয়া-৫ লঞ্চে ওঠার সময় হঠাৎ অন্য একটি লঞ্চের ধাক্কায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

সেই মুহূর্তে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন সোহেল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনটাই দিতে হয় তাকে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সোহেল এবং তার বাবা মিরাজ ফকির।

অন্যদিকে ট্রলার থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন সাত মাসের গর্ভবতী রুবা। ভেঙে যায় তার হাত-পা। দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকার পর এক মাস আগে তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। সেখানেই জন্ম নেয় তার সন্তান। নবজাতককে কোলে নিয়ে প্রতিটি দিনই এখন নতুন লড়াই রুবার জন্য।

তিনি জানান, পায়ে অস্ত্রোপচারের কারণে এখনও স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। বিছানা ছেড়ে নামাও ঝুঁকিপূর্ণ। তার ওপর শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় দুধ, ওষুধ ও অন্যান্য খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

আমার বুকের দুধ হয় না। কৌটার দুধ কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন খরচ। সংসারে উপার্জনের মানুষ নেই। তারপরও আমি হাল ছাড়ব না। সোহেলের ইচ্ছা ছিল ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়াবে। কষ্ট হলেও আমি সেই স্বপ্ন পূরণ করব, বলেন তিনি।

সরকারের কাছে একটি চাকরির আবেদন জানিয়ে রুবা বলেন, আমি যদি কোনোভাবে দাঁড়াতে পারি, তাহলে আমার সন্তানকেও মানুষ করতে পারব।

রুবার মা সালমা আক্তার সাথী বলেন, মেয়ের চিকিৎসার জন্য পরিবারকে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

অপারেশন, ওষুধ, যাতায়াত সব মিলিয়ে বিপুল খরচ হয়েছে। বিভিন্নভাবে কিছু সহায়তা পেলেও আমাদের নিজেদের প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। ধার-দেনা করে চিকিৎসা চালিয়েছি। এখনও সেই ঋণ পরিশোধ করতে পারিনি, বলেন তিনি।

তার অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এখনও কোনো অর্থ হাতে পাননি তারা।

কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার যোগাযোগ করছি। আজ দেব, কাল দেব বলে ঘুরানো হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কষ্টের শেষ হচ্ছে না, বলেন তিনি।

রুবার বাবা রিয়াজ উদ্দিন মীর একজন দিনমজুর। প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে চলে তার সংসার।

ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি দিনমজুর মানুষ। কাজ পেলে খাবার জোটে, না পেলে জোটে না। মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ হয়েছে। এখন মেয়ে, নাতি, সবাইকে নিয়ে চিন্তায় আছি। তাদের তো ফেলে দিতে পারব না। কিন্তু কীভাবে সামলাব, সেটাই বুঝতে পারছি না। সরকার, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি সহায়তার আবেদন জানান তিনি।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, একদিকে নবজাতক রাইয়ানের আগমন তাদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে সোহেল ও তার বাবার শূন্যতা প্রতিনিয়ত তাদের কাঁদায়।

শিশুটি যখন বড় হবে, তখন হয়তো বাবার মুখ মনে থাকবে না তার। কিন্তু থাকবে বাবার রেখে যাওয়া স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ত্যাগের গল্প।

একদিকে নবজাতকের প্রথম কান্না, অন্যদিকে বাবা ও দাদার কবর, এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করেছেন নূর আফরিন রুবা।

ছোট্ট রাইয়ান পৃথিবীতে এসেছে আশার প্রতীক হয়ে। কিন্তু সেই আশার আলোকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের সহমর্মিতার হাত। কারণ একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজেরও দায়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে ইউনিলিভার অফিসের সামনে থেকে অটোগাড়ি চুরির অভিযোগ

পৃথিবীতে আসার আগেই বাবাকে হারাল ফুটফুটে নবজাতক

Update Time : ০৯:৫৭:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
৯৭

নিজস্ব প্রতিবেদক : মায়ের বুকে জড়িয়ে আছে ফুটফুটে এক নবজাতক। ছোট্ট শিশুটির আগমনে একটি পরিবারে আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই আনন্দকে ছাপিয়ে আছে বেদনা, শূন্যতা আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া। কারণ যে শিশুটিকে ঘিরে বাবার ছিল হাজারো স্বপ্ন, সে পৃথিবীতে এসেছে বাবার মুখ না দেখেই।

ঢাকার সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো সোহেল ফকিরের স্ত্রী নূর আফরিন রুবার কোলজুড়ে জন্ম নিয়েছে একটি পুত্র সন্তান। মঙ্গলবার (৯ জুন) ভোরে বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকায় বাবার বাড়িতে সন্তানের জন্ম দেন তিনি। নবজাতকের নাম রাখা হয়েছে ‘রাইয়ান ইসলাম’ যে নামটি মৃত্যুর আগেই ঠিক করে গিয়েছিলেন সোহেল। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখার সেই সৌভাগ্য আর হয়নি তার।

মাত্র তিন মাস আগে ঈদযাত্রার পথে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় স্বামী ও শ্বশুরকে হারিয়েছেন রুবা। নিজেও হয়েছেন গুরুতর আহত। এখনও তার পায়ে রড বসানো রয়েছে। চিকিৎসকের নির্দেশে চলাফেরা প্রায় বন্ধ। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তেও তাই তার চোখে আনন্দের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।

“সোহেল বেঁচে থাকলে আজ সবচেয়ে বেশি খুশি হতো” কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রুবা।

তিনি বলেন, আমাদের সন্তানকে নিয়ে ওর অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলে হলে নাম রাখবে রাইয়ান ইসলাম এ কথাও আগেই বলেছিল। আল্লাহ ছেলে দিয়েছেন, ওর পছন্দ করা নামই রেখেছি। কিন্তু ছেলেটাকে একবার কোলে নেওয়ার আগেই সে চলে গেছে। এখন ওর স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমার। কিন্তু আমি নিজেই অসহায়।

চলতি বছরের ১৮ মার্চ, পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি উপলক্ষে স্ত্রী ও বাবাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে ফিরছিলেন সোহেল ফকির (২২)। রাজধানীর সদরঘাটে ট্রলারযোগে এমভি আসা-যাওয়া-৫ লঞ্চে ওঠার সময় হঠাৎ অন্য একটি লঞ্চের ধাক্কায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

সেই মুহূর্তে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন সোহেল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনটাই দিতে হয় তাকে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সোহেল এবং তার বাবা মিরাজ ফকির।

অন্যদিকে ট্রলার থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন সাত মাসের গর্ভবতী রুবা। ভেঙে যায় তার হাত-পা। দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকার পর এক মাস আগে তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। সেখানেই জন্ম নেয় তার সন্তান। নবজাতককে কোলে নিয়ে প্রতিটি দিনই এখন নতুন লড়াই রুবার জন্য।

তিনি জানান, পায়ে অস্ত্রোপচারের কারণে এখনও স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। বিছানা ছেড়ে নামাও ঝুঁকিপূর্ণ। তার ওপর শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় দুধ, ওষুধ ও অন্যান্য খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

আমার বুকের দুধ হয় না। কৌটার দুধ কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন খরচ। সংসারে উপার্জনের মানুষ নেই। তারপরও আমি হাল ছাড়ব না। সোহেলের ইচ্ছা ছিল ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়াবে। কষ্ট হলেও আমি সেই স্বপ্ন পূরণ করব, বলেন তিনি।

সরকারের কাছে একটি চাকরির আবেদন জানিয়ে রুবা বলেন, আমি যদি কোনোভাবে দাঁড়াতে পারি, তাহলে আমার সন্তানকেও মানুষ করতে পারব।

রুবার মা সালমা আক্তার সাথী বলেন, মেয়ের চিকিৎসার জন্য পরিবারকে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

অপারেশন, ওষুধ, যাতায়াত সব মিলিয়ে বিপুল খরচ হয়েছে। বিভিন্নভাবে কিছু সহায়তা পেলেও আমাদের নিজেদের প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। ধার-দেনা করে চিকিৎসা চালিয়েছি। এখনও সেই ঋণ পরিশোধ করতে পারিনি, বলেন তিনি।

তার অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এখনও কোনো অর্থ হাতে পাননি তারা।

কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার যোগাযোগ করছি। আজ দেব, কাল দেব বলে ঘুরানো হচ্ছে। কিন্তু আমাদের কষ্টের শেষ হচ্ছে না, বলেন তিনি।

রুবার বাবা রিয়াজ উদ্দিন মীর একজন দিনমজুর। প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে চলে তার সংসার।

ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি দিনমজুর মানুষ। কাজ পেলে খাবার জোটে, না পেলে জোটে না। মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ হয়েছে। এখন মেয়ে, নাতি, সবাইকে নিয়ে চিন্তায় আছি। তাদের তো ফেলে দিতে পারব না। কিন্তু কীভাবে সামলাব, সেটাই বুঝতে পারছি না। সরকার, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি সহায়তার আবেদন জানান তিনি।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, একদিকে নবজাতক রাইয়ানের আগমন তাদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে, অন্যদিকে সোহেল ও তার বাবার শূন্যতা প্রতিনিয়ত তাদের কাঁদায়।

শিশুটি যখন বড় হবে, তখন হয়তো বাবার মুখ মনে থাকবে না তার। কিন্তু থাকবে বাবার রেখে যাওয়া স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ত্যাগের গল্প।

একদিকে নবজাতকের প্রথম কান্না, অন্যদিকে বাবা ও দাদার কবর, এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করেছেন নূর আফরিন রুবা।

ছোট্ট রাইয়ান পৃথিবীতে এসেছে আশার প্রতীক হয়ে। কিন্তু সেই আশার আলোকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের সহমর্মিতার হাত। কারণ একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজেরও দায়।