ঢাকা ১০:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিজদায় নাক মাটিতে না লাগালে কি নামাজ হবে?

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:২৫:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
  • ৩৪ Time View
৭৫

ইসলাম ডেস্ক : নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং একজন মুসলিমের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আর নামাজের অন্যতম প্রধান রুকন হলো সিজদা—যে অবস্থায় বান্দা পরম বিনয়ের সঙ্গে মহান আল্লাহর সামনে নিজেকে নত করে। সিজদা কেবল একটি শারীরিক ভঙ্গি নয়; এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, আত্মসমর্পণ ও ভালোবাসার গভীর প্রকাশ।

অনেক মুসল্লির মনে প্রশ্ন জাগে—সিজদার সময় যদি কপাল মাটিতে লাগে, কিন্তু নাক মাটিতে না লাগে, তাহলে কি সিজদা ও নামাজ শুদ্ধ হবে?

কী বলে ফিকহ?

ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কপাল দিয়ে সিজদা সম্পন্ন হলে ফরজ সিজদা আদায় হয়ে যায় এবং নামাজ শুদ্ধ হয়। তবে কোনো ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে নাক মাটিতে স্পর্শ না করানো সুন্নাহর পরিপন্থী। অধিকাংশ ফকিহের মতে, এমনটি করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)।

তবে কারও নাকে আঘাত, অস্ত্রোপচার, তীব্র ব্যথা বা অন্য কোনো বাস্তব ওজর থাকলে নাক মাটিতে স্পর্শ করাতে না পারলেও তার নামাজে কোনো সমস্যা হবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিজদার পদ্ধতি

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ: عَلَى الْجَبْهَةِ وَأَشَارَ بِيَدِهِ عَلَى أَنْفِهِ، وَالْيَدَيْنِ، وَالرُّكْبَتَيْنِ، وَأَطْرَافِ الْقَدَمَيْنِ

অর্থ: “আমাকে সাতটি অঙ্গের ওপর সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কপাল (এ কথা বলে তিনি নাকের দিকেও ইশারা করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের আঙুলের অগ্রভাগ।”
(সহিহ বুখারি: ৮১২, সহিহ মুসলিম: ৪৯০)

হজরত আবু হুমাইদ আস-সায়িদী (রা.) বর্ণনা করেন—

كَانَ إِذَا سَجَدَ أَمْكَنَ أَنْفَهُ وَجَبْهَتَهُ مِنَ الْأَرْضِ

অর্থ: “রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন সিজদা করতেন, তখন তিনি কপাল ও নাক দৃঢ়ভাবে মাটিতে স্থাপন করতেন।”
(জামে তিরমিজি: ২৭০)

সিজদা—আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার মুহূর্ত

সিজদার মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ

অর্থ: “বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটে থাকে যখন সে সিজদায় থাকে। তাই সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।”
(সহিহ মুসলিম: ৪৮২)

কুরআনে সিজদার নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ

অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা রুকু করো, সিজদা করো এবং তোমাদের রবের ইবাদত করো।”
(সুরা আল-হাজ্জ: ৭৭)

মুসল্লিদের করণীয়

সিজদার সময় কপাল ও নাক—উভয়ই মাটিতে লাগানোর চেষ্টা করা।

সুন্নাহ অনুযায়ী সাতটি অঙ্গের ওপর সিজদা আদায় করা।

সিজদার সময় বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা।

কোনো ওজর না থাকলে নাক মাটিতে না লাগানোর অভ্যাস পরিহার করা।

নামাজের প্রতিটি রুকন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে আদায় করার চেষ্টা করা।

সারসংক্ষেপ

সিজদা একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার অনন্য মুহূর্ত। তাই এটি কেবল নামাজের একটি আনুষ্ঠানিক অংশ নয়; বরং বিনয়, আত্মসমর্পণ ও ইবাদতের গভীর প্রকাশ। ফিকহবিদদের মতে, কপাল দিয়ে সিজদা করলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়। তবে কোনো ওজর না থাকলে কপালের পাশাপাশি নাকও মাটিতে স্থাপন করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং সিজদার পূর্ণাঙ্গ আদব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে খুশু-খুজুর সঙ্গে সালাত আদায় করার এবং প্রতিটি সিজদাকে তাঁর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম বানানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জলাবদ্ধতা নিরসন, রাস্তা সংস্কার, দান-অনুদানে প্রশংসায় ভাসছে যুবনেতা আতিক ওসমানী 

সিজদায় নাক মাটিতে না লাগালে কি নামাজ হবে?

Update Time : ১০:২৫:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
৭৫

ইসলাম ডেস্ক : নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং একজন মুসলিমের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আর নামাজের অন্যতম প্রধান রুকন হলো সিজদা—যে অবস্থায় বান্দা পরম বিনয়ের সঙ্গে মহান আল্লাহর সামনে নিজেকে নত করে। সিজদা কেবল একটি শারীরিক ভঙ্গি নয়; এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, আত্মসমর্পণ ও ভালোবাসার গভীর প্রকাশ।

অনেক মুসল্লির মনে প্রশ্ন জাগে—সিজদার সময় যদি কপাল মাটিতে লাগে, কিন্তু নাক মাটিতে না লাগে, তাহলে কি সিজদা ও নামাজ শুদ্ধ হবে?

কী বলে ফিকহ?

ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কপাল দিয়ে সিজদা সম্পন্ন হলে ফরজ সিজদা আদায় হয়ে যায় এবং নামাজ শুদ্ধ হয়। তবে কোনো ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে নাক মাটিতে স্পর্শ না করানো সুন্নাহর পরিপন্থী। অধিকাংশ ফকিহের মতে, এমনটি করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)।

তবে কারও নাকে আঘাত, অস্ত্রোপচার, তীব্র ব্যথা বা অন্য কোনো বাস্তব ওজর থাকলে নাক মাটিতে স্পর্শ করাতে না পারলেও তার নামাজে কোনো সমস্যা হবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিজদার পদ্ধতি

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ: عَلَى الْجَبْهَةِ وَأَشَارَ بِيَدِهِ عَلَى أَنْفِهِ، وَالْيَدَيْنِ، وَالرُّكْبَتَيْنِ، وَأَطْرَافِ الْقَدَمَيْنِ

অর্থ: “আমাকে সাতটি অঙ্গের ওপর সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কপাল (এ কথা বলে তিনি নাকের দিকেও ইশারা করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের আঙুলের অগ্রভাগ।”
(সহিহ বুখারি: ৮১২, সহিহ মুসলিম: ৪৯০)

হজরত আবু হুমাইদ আস-সায়িদী (রা.) বর্ণনা করেন—

كَانَ إِذَا سَجَدَ أَمْكَنَ أَنْفَهُ وَجَبْهَتَهُ مِنَ الْأَرْضِ

অর্থ: “রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন সিজদা করতেন, তখন তিনি কপাল ও নাক দৃঢ়ভাবে মাটিতে স্থাপন করতেন।”
(জামে তিরমিজি: ২৭০)

সিজদা—আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার মুহূর্ত

সিজদার মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ

অর্থ: “বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটে থাকে যখন সে সিজদায় থাকে। তাই সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।”
(সহিহ মুসলিম: ৪৮২)

কুরআনে সিজদার নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ

অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা রুকু করো, সিজদা করো এবং তোমাদের রবের ইবাদত করো।”
(সুরা আল-হাজ্জ: ৭৭)

মুসল্লিদের করণীয়

সিজদার সময় কপাল ও নাক—উভয়ই মাটিতে লাগানোর চেষ্টা করা।

সুন্নাহ অনুযায়ী সাতটি অঙ্গের ওপর সিজদা আদায় করা।

সিজদার সময় বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা।

কোনো ওজর না থাকলে নাক মাটিতে না লাগানোর অভ্যাস পরিহার করা।

নামাজের প্রতিটি রুকন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে আদায় করার চেষ্টা করা।

সারসংক্ষেপ

সিজদা একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার অনন্য মুহূর্ত। তাই এটি কেবল নামাজের একটি আনুষ্ঠানিক অংশ নয়; বরং বিনয়, আত্মসমর্পণ ও ইবাদতের গভীর প্রকাশ। ফিকহবিদদের মতে, কপাল দিয়ে সিজদা করলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়। তবে কোনো ওজর না থাকলে কপালের পাশাপাশি নাকও মাটিতে স্থাপন করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং সিজদার পূর্ণাঙ্গ আদব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে খুশু-খুজুর সঙ্গে সালাত আদায় করার এবং প্রতিটি সিজদাকে তাঁর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম বানানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।