ঢাকা ০২:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখীর বিপ্লব: কলাপাড়ার কৃষকদের বাজিমাত

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:০৭:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
  • ৬১ Time View
৯৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : ধূসর-বিবর্ণ অনাবাদী থাকা লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখির আবাদ করে কৃষকরা এই জনপদের চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। জলবায়ূর দ্রুত পরিবর্তনজনিত কারণে কৃষিতে বিরূপ প্রভাব কাটাতে যেন অভিনব উপায় বের করেছেন এসব কৃষক। আমন ধান পাকার পরপরই যেসব জমি থাকত অনাবাদী। ঘাস পর্যন্ত থাকত না। সেইসব জমিতে সূর্যমুখির আবাদ করে ব্যাপক লাভের মুখ দেখল চাষীরা। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অন্তত চার হাজার চাষী লবণাক্ত এসব জমি থেকে সূর্যমুখির বাম্পার ফলন ঘরে তুলে কৃষক নিজে লাভবান হয়েছেন। অপরদিকে দেশের ভোজ্যতেলের যোগান দিয়েছেন। সাগরপারের জনপদ কলাপাড়ার চাষীরা যেন বদলে দিয়েছেন ধূসর-বিবর্ণ জনপদের চেহারা। হলুদ-সবুজের সমারোহে বিমোহিত করেছিল মাইলের পর মাইলজুড়ে। সূর্যমুখির আবাদ করে কৃষকরা বাড়তি আয়ের পাশাপাশি সারা বছরের ভোজ্য তেলের যোগান দিতে পেরে খুবই উৎফুল্ল রয়েছেন। সাত হাজার একর জমিতে প্রায় নয় লাখ লিটার তেলের যোগান দিতে পারবেন বলে কৃষকের দাবি।

সুপার সাইক্লোন সিডরে ভয়াল তান্ডবের পর থেকেই কৃষকের জমিতে লবণ পানির প্লাবণ বয়ে যায়। এরপর থেকে কৃষকরা বহুলাংশে শুধুমাত্র আমন চাষাবাদ নির্ভর হয়ে পড়েন। কৃষকরা তারপরও বাড়তি উপার্জনের লক্ষ্যে ছোট্ট পরিসরে লবণসহিষ্ণু জাতের শস্য সূর্যমূখির আবাদ করছিলেন। কিন্তু ভালো জাতের বীজের ছিল প্রবল সংকট। ২০১৩-২০১৪ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের উদ্যোগে কৃষিবিভাগের পরামর্শে কৃষককে সূর্যমুখির হাইসান-৩৩ জাতের বীজ সরবরাহ শুরু করেন। এরপর থেকেই কৃষকরা সূর্যমুখির আবাদে ঝুঁকে পড়েন। কৃষককে সূর্যমুখির আবাদ থেকে শুরু করে তেল ভানাই করার শিখন কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। শুরু করেন কৃষকরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সূর্যমুখির আবাদ। পাশাপাশি উপজেলা কৃষিবিভাগও কৃষককে প্রতিবছর সূর্যমুখির চাষে উদ্ধুদ্ধ করেন। এ বছরও কৃষি বিভাগ অন্তত ৩৬টি প্রদর্শনী চাষাবাদের ব্যবস্থা করে দেন। যেখানে বিনামূল্যে বীজ, সার প্রদান করেন। চাষাবাদের টাকাও দেন। ব্যাপক যোগান দেয় উপজেলা কৃষিবিভাগ। কৃষকরা এখন সূর্যমুখির আবাদের পাশাপাশি বীজ শোধন প্রক্রিয়া, বপন পদ্ধতি, পরিচর্যা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও ফসল ঘরে তোলার পরের কার্যকরী পদক্ষেপগুলোও ভালোভাবে রপ্ত করতে পেরেছেন।

নীলগঞ্জের হলদিবাড়িয়ার কৃষক আফজাল হোসেন জানান, ৬৬ শতক জমিতে সূর্যমূখির আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো পেয়েছেন। চিটা নেই বললেই চলে। ব্র্যাকের লোকজন, কৃষিবিভাগ সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়েছেন।  কৃষক মোশাররফ হোসেন জানান, বিঘা প্রতি আট মণ ফলন পেয়েছেন। দামও ভালো, এবছর ২৫ শ’ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে পারছেন। ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির কর্মসূচি প্রধান আবু সাদাত মনিরুজ্জামান খান বলেন, ভালো মানের সূর্যমুখী ফসলের বীজ সহজলভ্য করতে পারলে, সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়বে, সয়াবিনের আমদানি কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দক্ষিণের কৃষকের জীবন-মান উন্নত হবে। সূর্যমুখী তেলে আছে মানবদেহের জন্য উপকারী ওমেগা ৯ ও ওমেগা ৬, আছে ফলিক অ্যাসিডও। সূর্যমুখীর তেলে আছে শতভাগ উপকারী ফ্যাট। আরও আছে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও পানি। এই তেল ক্ষতিকর কোলেস্টেরলমুক্ত। এতে আছে ভিটামিন ই, ভিটামিন কে ও মিনারেল। এ ছাড়া হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সূর্যমুখী তেল নিরাপদ। কলাপাড়ার কুয়াকাটা সড়ক লাগোয়া সিকদার সানফ্লাওয়ার অ্যান্ড রাইস মিলের মালিক মো. খোকন সিকদার জানান, ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে বীজ ভাঙানোর বড় মেশিন বসিয়েছেন। এক কেজি বীজ ভাঙাতে খরচ নেন ৮ টাকা। কেউ যদি খৈল রেখে যায় তাহলে ভাঙানোর টাকা দিতে হয় না তাকে। খোকন বলেন, এখন সূর্যমুখীর মৌসুমে তেল ভাঙানোর ভালো চাপ থাকে।

এবার কলাপাড়ায় উৎপাদিত সূর্যমূখির বীজ থেকে ৮ লাখ ৯৬ হাজার লিটার তেল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ৯০ শতাংশ কৃষক ফসল ঘরে তুলেছেন। ভানাইয়ের কাজও প্রায় শেষ করেছেন। গড়ে এক মণ বীজ থেকে ১৪-১৬ কেজি তেল পেয়েছেন অধিকাংশ কৃষক। ২৫০ টাকা কেজি দরে এই তেল বিক্রি হয়। এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করতে খরচ হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। ফলনও পেয়েছেন প্রতি হেক্টর জমিতে অন্তত এক দশুমিক ৯ টন। ভালো ফলন ও নিরাপদ ফসল কাটা নিশ্চিত করতে হলে, সূর্যমুখী ডিসেম্বরের মধ্যে জমিতে বপন করতে হয়। ২-৩ টি সেচের ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। এপ্রিলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং ঘূর্ণিঝড় মৌসুম শুরু আগে ফসল কাটার উপযুক্ত সময়। তবে কৃষকরা জানান, এবছর অনাবৃষ্টিতে গাছের উচ্চতা একটু কম ছিল। তাই ফলন একটু কম হয়েছে।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন বলেন, সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও ব্র্যাকের সহযোগিতায় কলাপাড়ায় চলতি অর্থবছরে দুই হাজার ৮৮১ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। উন্নত মানে বীজে ফলন ভালো হয়েছে। এতে কৃষকেরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে সমৃদ্ধ হবেন। তাদের সাফল্য দেখে আশেপাশের আরও কৃষক সূর্যমুখির আবাদে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

চরফ্যাশনে কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ

লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখীর বিপ্লব: কলাপাড়ার কৃষকদের বাজিমাত

Update Time : ০৩:০৭:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
৯৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : ধূসর-বিবর্ণ অনাবাদী থাকা লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখির আবাদ করে কৃষকরা এই জনপদের চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। জলবায়ূর দ্রুত পরিবর্তনজনিত কারণে কৃষিতে বিরূপ প্রভাব কাটাতে যেন অভিনব উপায় বের করেছেন এসব কৃষক। আমন ধান পাকার পরপরই যেসব জমি থাকত অনাবাদী। ঘাস পর্যন্ত থাকত না। সেইসব জমিতে সূর্যমুখির আবাদ করে ব্যাপক লাভের মুখ দেখল চাষীরা। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অন্তত চার হাজার চাষী লবণাক্ত এসব জমি থেকে সূর্যমুখির বাম্পার ফলন ঘরে তুলে কৃষক নিজে লাভবান হয়েছেন। অপরদিকে দেশের ভোজ্যতেলের যোগান দিয়েছেন। সাগরপারের জনপদ কলাপাড়ার চাষীরা যেন বদলে দিয়েছেন ধূসর-বিবর্ণ জনপদের চেহারা। হলুদ-সবুজের সমারোহে বিমোহিত করেছিল মাইলের পর মাইলজুড়ে। সূর্যমুখির আবাদ করে কৃষকরা বাড়তি আয়ের পাশাপাশি সারা বছরের ভোজ্য তেলের যোগান দিতে পেরে খুবই উৎফুল্ল রয়েছেন। সাত হাজার একর জমিতে প্রায় নয় লাখ লিটার তেলের যোগান দিতে পারবেন বলে কৃষকের দাবি।

সুপার সাইক্লোন সিডরে ভয়াল তান্ডবের পর থেকেই কৃষকের জমিতে লবণ পানির প্লাবণ বয়ে যায়। এরপর থেকে কৃষকরা বহুলাংশে শুধুমাত্র আমন চাষাবাদ নির্ভর হয়ে পড়েন। কৃষকরা তারপরও বাড়তি উপার্জনের লক্ষ্যে ছোট্ট পরিসরে লবণসহিষ্ণু জাতের শস্য সূর্যমূখির আবাদ করছিলেন। কিন্তু ভালো জাতের বীজের ছিল প্রবল সংকট। ২০১৩-২০১৪ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের উদ্যোগে কৃষিবিভাগের পরামর্শে কৃষককে সূর্যমুখির হাইসান-৩৩ জাতের বীজ সরবরাহ শুরু করেন। এরপর থেকেই কৃষকরা সূর্যমুখির আবাদে ঝুঁকে পড়েন। কৃষককে সূর্যমুখির আবাদ থেকে শুরু করে তেল ভানাই করার শিখন কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। শুরু করেন কৃষকরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সূর্যমুখির আবাদ। পাশাপাশি উপজেলা কৃষিবিভাগও কৃষককে প্রতিবছর সূর্যমুখির চাষে উদ্ধুদ্ধ করেন। এ বছরও কৃষি বিভাগ অন্তত ৩৬টি প্রদর্শনী চাষাবাদের ব্যবস্থা করে দেন। যেখানে বিনামূল্যে বীজ, সার প্রদান করেন। চাষাবাদের টাকাও দেন। ব্যাপক যোগান দেয় উপজেলা কৃষিবিভাগ। কৃষকরা এখন সূর্যমুখির আবাদের পাশাপাশি বীজ শোধন প্রক্রিয়া, বপন পদ্ধতি, পরিচর্যা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও ফসল ঘরে তোলার পরের কার্যকরী পদক্ষেপগুলোও ভালোভাবে রপ্ত করতে পেরেছেন।

নীলগঞ্জের হলদিবাড়িয়ার কৃষক আফজাল হোসেন জানান, ৬৬ শতক জমিতে সূর্যমূখির আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো পেয়েছেন। চিটা নেই বললেই চলে। ব্র্যাকের লোকজন, কৃষিবিভাগ সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়েছেন।  কৃষক মোশাররফ হোসেন জানান, বিঘা প্রতি আট মণ ফলন পেয়েছেন। দামও ভালো, এবছর ২৫ শ’ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে পারছেন। ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির কর্মসূচি প্রধান আবু সাদাত মনিরুজ্জামান খান বলেন, ভালো মানের সূর্যমুখী ফসলের বীজ সহজলভ্য করতে পারলে, সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়বে, সয়াবিনের আমদানি কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দক্ষিণের কৃষকের জীবন-মান উন্নত হবে। সূর্যমুখী তেলে আছে মানবদেহের জন্য উপকারী ওমেগা ৯ ও ওমেগা ৬, আছে ফলিক অ্যাসিডও। সূর্যমুখীর তেলে আছে শতভাগ উপকারী ফ্যাট। আরও আছে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও পানি। এই তেল ক্ষতিকর কোলেস্টেরলমুক্ত। এতে আছে ভিটামিন ই, ভিটামিন কে ও মিনারেল। এ ছাড়া হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সূর্যমুখী তেল নিরাপদ। কলাপাড়ার কুয়াকাটা সড়ক লাগোয়া সিকদার সানফ্লাওয়ার অ্যান্ড রাইস মিলের মালিক মো. খোকন সিকদার জানান, ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে বীজ ভাঙানোর বড় মেশিন বসিয়েছেন। এক কেজি বীজ ভাঙাতে খরচ নেন ৮ টাকা। কেউ যদি খৈল রেখে যায় তাহলে ভাঙানোর টাকা দিতে হয় না তাকে। খোকন বলেন, এখন সূর্যমুখীর মৌসুমে তেল ভাঙানোর ভালো চাপ থাকে।

এবার কলাপাড়ায় উৎপাদিত সূর্যমূখির বীজ থেকে ৮ লাখ ৯৬ হাজার লিটার তেল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ৯০ শতাংশ কৃষক ফসল ঘরে তুলেছেন। ভানাইয়ের কাজও প্রায় শেষ করেছেন। গড়ে এক মণ বীজ থেকে ১৪-১৬ কেজি তেল পেয়েছেন অধিকাংশ কৃষক। ২৫০ টাকা কেজি দরে এই তেল বিক্রি হয়। এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করতে খরচ হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। ফলনও পেয়েছেন প্রতি হেক্টর জমিতে অন্তত এক দশুমিক ৯ টন। ভালো ফলন ও নিরাপদ ফসল কাটা নিশ্চিত করতে হলে, সূর্যমুখী ডিসেম্বরের মধ্যে জমিতে বপন করতে হয়। ২-৩ টি সেচের ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। এপ্রিলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং ঘূর্ণিঝড় মৌসুম শুরু আগে ফসল কাটার উপযুক্ত সময়। তবে কৃষকরা জানান, এবছর অনাবৃষ্টিতে গাছের উচ্চতা একটু কম ছিল। তাই ফলন একটু কম হয়েছে।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন বলেন, সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও ব্র্যাকের সহযোগিতায় কলাপাড়ায় চলতি অর্থবছরে দুই হাজার ৮৮১ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। উন্নত মানে বীজে ফলন ভালো হয়েছে। এতে কৃষকেরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে সমৃদ্ধ হবেন। তাদের সাফল্য দেখে আশেপাশের আরও কৃষক সূর্যমুখির আবাদে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে।