ঢাকা ০৪:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশালে অযত্নে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সচিবালয় : মুছে যাচ্ছে ইতিহাস

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:৫৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
  • ২৮ Time View
৫৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বরিশালে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো যথাযথ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরেও ঠাঁই হয়নি মুক্তিযুদ্ধকালীন বীরত্বগাথা ও আঞ্চলিক কর্মকা-ের কোনো স্মারক। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ থাকলেও প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর বা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাক হানাদার বাহিনীর হামলার পর বরিশাল ছিল মুক্তিকামী মানুষের অন্যতম প্রতিরোধের দুর্গ। এখানেই স্থাপিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার ‘দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রথম সচিবালয়’। এছাড়া নগরীর বেলপার্ক সংলগ্ন বিআইডব্লিউটিএ-এর ‘হিমনীড়’ ভবনে (চাড়ার বাংলো) গড়ে তোলা হয়েছিল ‘প্রথম সামরিক সচিবালয়’। এখান থেকেই ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছিলেন।

বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে স্থাপিত বেসামরিক সচিবালয়টি মুজিবনগর সরকার গঠনের আগেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম মঞ্জুর। অথচ এই ঐতিহাসিক ভবনগুলোর গুরুত্ব বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রায় অজানা। সামরিক সচিবালয় ভবনটি বিআইডব্লিউটিএ-এর অধীনে থাকলেও সেখানে কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই।

 

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এই সচিবালয় থেকে এক পাক অনুচরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং আউটার স্টেডিয়ামে তা কার্যকর করা হয়। এর প্রতিশোধ নিতে ১৮ এপ্রিল পাক বিমানবাহিনী আকাশপথে এবং ২৫ এপ্রিল নৌপথে ব্যাপক হামলা চালায়। ওই দিন তালতলীর জুনাহারে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পাক বাহিনী নির্বিচারে শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। সেখানে ৪৭ জন শহীদের নামসংবলিত একটি স্মৃতিফলক বর্তমানে চরম অযতœ ও অবহেলায় পড়ে আছে।

 

এদিকে, নগরীর ‘৩০ গোডাউন’ সংলগ্ন বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে সেটি উশৃঙ্খলদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশের ওয়াপদা কলোনিতে পাক বাহিনীর ‘টর্চার সেল’টিও কোনোমতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

 

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বরিশাল জাদুঘরে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিল বা এই অঞ্চলের অন্য কোনো সংগঠকের ছবি কিংবা যুদ্ধের কোনো নিদর্শন নেই। এমনকি প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিভাগীয় অফিসটি এখনো বরিশালে স্থাপন করা হয়নি, যা খুলনা থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

 

বরিশাল জাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এখানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি গ্যালারি স্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে।
যোগাযোগ করা হলে বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন এই অবহেলায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।

 

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সচিবালয় ও সামরিক দপ্তরের স্মৃতি রক্ষায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মির্জাগঞ্জে ছাত্রদলের পাল্টাপাল্টি কমিটি, ৯ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিস

বরিশালে অযত্নে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সচিবালয় : মুছে যাচ্ছে ইতিহাস

Update Time : ০৪:৫৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
৫৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বরিশালে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো যথাযথ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরেও ঠাঁই হয়নি মুক্তিযুদ্ধকালীন বীরত্বগাথা ও আঞ্চলিক কর্মকা-ের কোনো স্মারক। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ থাকলেও প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর বা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাক হানাদার বাহিনীর হামলার পর বরিশাল ছিল মুক্তিকামী মানুষের অন্যতম প্রতিরোধের দুর্গ। এখানেই স্থাপিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার ‘দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রথম সচিবালয়’। এছাড়া নগরীর বেলপার্ক সংলগ্ন বিআইডব্লিউটিএ-এর ‘হিমনীড়’ ভবনে (চাড়ার বাংলো) গড়ে তোলা হয়েছিল ‘প্রথম সামরিক সচিবালয়’। এখান থেকেই ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছিলেন।

বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে স্থাপিত বেসামরিক সচিবালয়টি মুজিবনগর সরকার গঠনের আগেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম মঞ্জুর। অথচ এই ঐতিহাসিক ভবনগুলোর গুরুত্ব বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রায় অজানা। সামরিক সচিবালয় ভবনটি বিআইডব্লিউটিএ-এর অধীনে থাকলেও সেখানে কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই।

 

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এই সচিবালয় থেকে এক পাক অনুচরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং আউটার স্টেডিয়ামে তা কার্যকর করা হয়। এর প্রতিশোধ নিতে ১৮ এপ্রিল পাক বিমানবাহিনী আকাশপথে এবং ২৫ এপ্রিল নৌপথে ব্যাপক হামলা চালায়। ওই দিন তালতলীর জুনাহারে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পাক বাহিনী নির্বিচারে শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। সেখানে ৪৭ জন শহীদের নামসংবলিত একটি স্মৃতিফলক বর্তমানে চরম অযতœ ও অবহেলায় পড়ে আছে।

 

এদিকে, নগরীর ‘৩০ গোডাউন’ সংলগ্ন বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে সেটি উশৃঙ্খলদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশের ওয়াপদা কলোনিতে পাক বাহিনীর ‘টর্চার সেল’টিও কোনোমতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

 

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বরিশাল জাদুঘরে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিল বা এই অঞ্চলের অন্য কোনো সংগঠকের ছবি কিংবা যুদ্ধের কোনো নিদর্শন নেই। এমনকি প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিভাগীয় অফিসটি এখনো বরিশালে স্থাপন করা হয়নি, যা খুলনা থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

 

বরিশাল জাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এখানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি গ্যালারি স্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে।
যোগাযোগ করা হলে বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন এই অবহেলায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।

 

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সচিবালয় ও সামরিক দপ্তরের স্মৃতি রক্ষায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।