ঢাকা ১২:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশালের বাকেরগঞ্জে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৩৮:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬
  • ৮৬ Time View
১২১

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলা জুড়ে মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ বিস্তার ঘটছে। ইয়াবা, গাঁজা, এবং দেশীয় মদের নেশা এখন তরুণ-যুবসমাজ, এমনকি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদক সহজলভ্য হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকার কারণে পুরো উপজেলা জুড়ে মাদক এখন প্রায় প্রকাশ্য বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।

মাদক কেনাবেচা: সহজলভ্যতা ও ক্রমবর্ধমান প্রবণতা

অভিযোগ উঠেছে যে, মাদক কেনাবেচা উপজেলায় একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পৌর শহর এবং ১৪টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজার চাহিদা বেশি। মাদক ব্যবসায়ীরা এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সরবরাহ গ্রহণ করছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিভাবকদের দাবি, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা কিশোর-তরুণদের মধ্যে আসক্তি বাড়াচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় একটি হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

প্রশাসনের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন যে, মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অত্যন্ত কম। বিশেষ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান বেশিরভাগ সময় দেখা যায় না। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বছরে দুই-একটি অভিযানের বেশি কার্যক্রম চলতে দেখা যায় না। এতে মাদক ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি কম মনে করে এবং প্রকাশ্যে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত মাদক ব্যবসা

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌর এলাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি সরাসরি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির অর্থায়নে মাদক কেনা হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় ডেলিভারি ম্যানের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। অধিকাংশ মাদক ঢাকা থেকে নৌপথ এবং সড়কপথে আসে, এবং কিছু শীর্ষ কারবারি বরিশাল শহরের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করছে।

মামলা বাড়লেও বড় কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ১৩২টি মামলা হয়, কিন্তু ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫০০টিরও বেশি মামলা হয়েছে। তবে মামলার সংখ্যা বাড়লেও বড় মাদক কারবারিরা বেশিরভাগ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে আবারও একই কাজ শুরু করছে।

অভিযান ও সোর্সের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে ব্যবহৃত সোর্সগুলোর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় অভিযান শুরুর আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, যার ফলে শীর্ষ মাদক কারবারিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ ঝুঁকিতে

গ্রামাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা বাড়ছে। শিক্ষক এবং অভিভাবকরা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাবও রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সচেতন মহলের দাবি

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, মাদক দমনে নিয়মিত অভিযান এবং শীর্ষ মাদক কারবারিদের গ্রেফতার করা জরুরি। রাজনৈতিক এবং প্রভাবশালী ছত্রছায়া বন্ধ করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তারা আশঙ্কা করছেন, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে পুরো একটি প্রজন্ম মাদকাসক্ত হয়ে পড়বে।

বাকেরগঞ্জে মাদকের বিস্তার দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে এবং এ বিষয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপের অভাব স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলকে বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী

বরিশালের বাকেরগঞ্জে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

Update Time : ১১:৩৮:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬
১২১

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলা জুড়ে মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ বিস্তার ঘটছে। ইয়াবা, গাঁজা, এবং দেশীয় মদের নেশা এখন তরুণ-যুবসমাজ, এমনকি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদক সহজলভ্য হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকার কারণে পুরো উপজেলা জুড়ে মাদক এখন প্রায় প্রকাশ্য বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।

মাদক কেনাবেচা: সহজলভ্যতা ও ক্রমবর্ধমান প্রবণতা

অভিযোগ উঠেছে যে, মাদক কেনাবেচা উপজেলায় একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পৌর শহর এবং ১৪টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজার চাহিদা বেশি। মাদক ব্যবসায়ীরা এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সরবরাহ গ্রহণ করছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিভাবকদের দাবি, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা কিশোর-তরুণদের মধ্যে আসক্তি বাড়াচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় একটি হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

প্রশাসনের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন যে, মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অত্যন্ত কম। বিশেষ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান বেশিরভাগ সময় দেখা যায় না। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বছরে দুই-একটি অভিযানের বেশি কার্যক্রম চলতে দেখা যায় না। এতে মাদক ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি কম মনে করে এবং প্রকাশ্যে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত মাদক ব্যবসা

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌর এলাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি সরাসরি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির অর্থায়নে মাদক কেনা হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় ডেলিভারি ম্যানের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। অধিকাংশ মাদক ঢাকা থেকে নৌপথ এবং সড়কপথে আসে, এবং কিছু শীর্ষ কারবারি বরিশাল শহরের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করছে।

মামলা বাড়লেও বড় কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ১৩২টি মামলা হয়, কিন্তু ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫০০টিরও বেশি মামলা হয়েছে। তবে মামলার সংখ্যা বাড়লেও বড় মাদক কারবারিরা বেশিরভাগ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে আবারও একই কাজ শুরু করছে।

অভিযান ও সোর্সের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে ব্যবহৃত সোর্সগুলোর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় অভিযান শুরুর আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, যার ফলে শীর্ষ মাদক কারবারিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ ঝুঁকিতে

গ্রামাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা বাড়ছে। শিক্ষক এবং অভিভাবকরা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাবও রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সচেতন মহলের দাবি

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, মাদক দমনে নিয়মিত অভিযান এবং শীর্ষ মাদক কারবারিদের গ্রেফতার করা জরুরি। রাজনৈতিক এবং প্রভাবশালী ছত্রছায়া বন্ধ করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তারা আশঙ্কা করছেন, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে পুরো একটি প্রজন্ম মাদকাসক্ত হয়ে পড়বে।

বাকেরগঞ্জে মাদকের বিস্তার দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে এবং এ বিষয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপের অভাব স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।