ঢাকা ০১:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরগুনায় ডাকবাংলোয় মা ও দুই মেয়ের মৃত্যু, ৭ দিন পর হত্যা মামলা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:১৩:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
  • ৮৭ Time View
২৫৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর কক্ষ থেকে মা ও দুই কন্যার রহস্যজনক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার সাত দিন পর অবশেষে বরগুনা সদর থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ বিষয়টিকে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রাথমিক ধারণা দিলেও, নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়দের ধারাবাহিক ক্ষোভ এবং দাবির মুখে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলাটি রেকর্ড করা হলো। এর ফলে দেশজুড়ে আলোচিত এই ঘটনার তদন্ত ও নেপথ্য রহস্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার (৯ জুন) দিবাগত মধ্যরাতে নিহত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেন।

 

নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, গত ৩ জুন ঘটনার পর থেকেই তারা এটিকে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছিলেন। তবে বরগুনা সদর থানা পুলিশ মামলা গ্রহণে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ ও দীর্ঘসূত্রতা করেছে।

 

নিহত ইতি রানীর ভাসুর মিলন চন্দ্র বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা একাধিকবার থানায় গিয়ে মামলা করার চেষ্টা করেছি। গত শনিবার রাতে মামলা করতে গেলে ওসি সাহেব বলেন- বাদী পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু কেন ও কী কারণে বাদী পরিবর্তন করতে হবে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। উল্টো সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার কথা বলে মামলা নিতে চার-পাঁচ দিন দেরি করা হয়েছে, যা আমাদের মনে নানা বিভ্রান্তি ও সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

তবে মামলা গ্রহণে গড়িমসির অভিযোগ অস্বীকার করে বরগুনা সদর থানার ওসি আব্দুল আলিম বলেন, মৃত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস গতকাল রাতে একটি লিখিত এজাহার দাখিল করেছেন এবং সেই এজাহারের ভিত্তিতেই থানায় হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছিল। বর্তমানে আগের অপমৃত্যু মামলা এবং নতুন হত্যা মামলা- দুটির তদন্তই সমান্তরালভাবে ও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলবে।

 

ঘটনার সূত্রপাতে জানা যায়, গত ৩ জুন বিকেলে বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর একটি কক্ষ থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইতি রানী (৩৫), তার ১২ বছর বয়সী বড় মেয়ে আরাধা বিশ্বাস এবং ৩ বছর বয়সী ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘরের ভেতরের আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজ প্রাথমিক পর্যালোচনা করে পুলিশ তখন ধারণা করেছিল- দুই সন্তানকে বিষপ্রয়োগ বা শ্বাসরোধে হত্যার পর ইতি রানী নিজে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।

 

কিন্তু নিহতদের স্বামী ও স্বজনরা শুরু থেকেই পুলিশের এই ‘আত্মহত্যা থিওরি’ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাঁদের সুনির্দিষ্ট দাবি-মা ও দুই শিশুকে পরিকল্পিতভাবে অন্য কোথাও হত্যা করে ডাকবাংলোর কক্ষে মরদেহ রেখে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।

 

ঘটনার পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ হস্তান্তরের সময় বরগুনায় ব্যাপক বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করেন স্বজন ও সাধারণ মানুষ। ঘটনার সাত দিন পার হলেও কোনো কুলকিনারা না হওয়ায় বরগুনাবাসীর মনে ক্ষোভ ও রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

এদিকে চাঞ্চল্যকর এই ট্র্যাজেডির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে জেলা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা থেকে এসে তদন্তে নেমেছে সিআইডির একটি ফরেনসিক টিম। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত, ভিসেরা ও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে।

 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল হাতে পেলেই স্পষ্ট হবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা। তবে হত্যা মামলা দায়ের হওয়ায় এখন তদন্তের পরিধি ও গতি আরও বাড়বে। ওদিকে ক্ষুব্ধ বরগুনাবাসী ও নিহতের পরিবার দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে ইউনিলিভার অফিসের সামনে থেকে অটোগাড়ি চুরির অভিযোগ

বরগুনায় ডাকবাংলোয় মা ও দুই মেয়ের মৃত্যু, ৭ দিন পর হত্যা মামলা

Update Time : ০১:১৩:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
২৫৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর কক্ষ থেকে মা ও দুই কন্যার রহস্যজনক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার সাত দিন পর অবশেষে বরগুনা সদর থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ বিষয়টিকে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রাথমিক ধারণা দিলেও, নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়দের ধারাবাহিক ক্ষোভ এবং দাবির মুখে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলাটি রেকর্ড করা হলো। এর ফলে দেশজুড়ে আলোচিত এই ঘটনার তদন্ত ও নেপথ্য রহস্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার (৯ জুন) দিবাগত মধ্যরাতে নিহত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেন।

 

নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, গত ৩ জুন ঘটনার পর থেকেই তারা এটিকে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছিলেন। তবে বরগুনা সদর থানা পুলিশ মামলা গ্রহণে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ ও দীর্ঘসূত্রতা করেছে।

 

নিহত ইতি রানীর ভাসুর মিলন চন্দ্র বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা একাধিকবার থানায় গিয়ে মামলা করার চেষ্টা করেছি। গত শনিবার রাতে মামলা করতে গেলে ওসি সাহেব বলেন- বাদী পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু কেন ও কী কারণে বাদী পরিবর্তন করতে হবে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। উল্টো সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার কথা বলে মামলা নিতে চার-পাঁচ দিন দেরি করা হয়েছে, যা আমাদের মনে নানা বিভ্রান্তি ও সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

তবে মামলা গ্রহণে গড়িমসির অভিযোগ অস্বীকার করে বরগুনা সদর থানার ওসি আব্দুল আলিম বলেন, মৃত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস গতকাল রাতে একটি লিখিত এজাহার দাখিল করেছেন এবং সেই এজাহারের ভিত্তিতেই থানায় হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছিল। বর্তমানে আগের অপমৃত্যু মামলা এবং নতুন হত্যা মামলা- দুটির তদন্তই সমান্তরালভাবে ও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলবে।

 

ঘটনার সূত্রপাতে জানা যায়, গত ৩ জুন বিকেলে বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর একটি কক্ষ থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইতি রানী (৩৫), তার ১২ বছর বয়সী বড় মেয়ে আরাধা বিশ্বাস এবং ৩ বছর বয়সী ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘরের ভেতরের আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজ প্রাথমিক পর্যালোচনা করে পুলিশ তখন ধারণা করেছিল- দুই সন্তানকে বিষপ্রয়োগ বা শ্বাসরোধে হত্যার পর ইতি রানী নিজে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।

 

কিন্তু নিহতদের স্বামী ও স্বজনরা শুরু থেকেই পুলিশের এই ‘আত্মহত্যা থিওরি’ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাঁদের সুনির্দিষ্ট দাবি-মা ও দুই শিশুকে পরিকল্পিতভাবে অন্য কোথাও হত্যা করে ডাকবাংলোর কক্ষে মরদেহ রেখে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।

 

ঘটনার পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ হস্তান্তরের সময় বরগুনায় ব্যাপক বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করেন স্বজন ও সাধারণ মানুষ। ঘটনার সাত দিন পার হলেও কোনো কুলকিনারা না হওয়ায় বরগুনাবাসীর মনে ক্ষোভ ও রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

এদিকে চাঞ্চল্যকর এই ট্র্যাজেডির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে জেলা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা থেকে এসে তদন্তে নেমেছে সিআইডির একটি ফরেনসিক টিম। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত, ভিসেরা ও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে।

 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল হাতে পেলেই স্পষ্ট হবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা। তবে হত্যা মামলা দায়ের হওয়ায় এখন তদন্তের পরিধি ও গতি আরও বাড়বে। ওদিকে ক্ষুব্ধ বরগুনাবাসী ও নিহতের পরিবার দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে।