ঢাকা ০২:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পহেলা বৈশাখকে ঘিরে ব্যস্ততা বেড়েছে পটুয়াখালীর পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৫৬:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • ৩৭ Time View
৬৭

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে বর্ষবরণ আয়োজনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা বেড়েছে মৃৎশিল্পীদের। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যস্ত সময় পার করছেন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা।

 

বর্ষবরণ উপলক্ষে তারা তৈরি করছেন পান্তা খাওয়ার থালা-বাসন, মগ, মিষ্টির পাতিল, ফুলদানি, ডিনার সেট, কাপ-পিরিচসহ নানা ধরনের মাটির পণ্য।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে পালপাড়া এ অঞ্চলের মাটির পণ্যের জন্য পরিচিত। একসময় এখানকার মাটির খেলনা বৈশাখী মেলায় বিক্রি হতো পটুয়াখালীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার, নকশার আধুনিকতা এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ায় এই শিল্পের বাজার এখন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে শুধু খেলনা নয়, বরং নান্দনিক শোপিস, ফুলদানি, ডিনার সেট, মগ, কাপ-পিরিচ ও গৃহসজ্জার নানা উপকরণও তৈরি হচ্ছে এখানে।

 

পালপাড়ার তৈরি মাটির পণ্য এখন ঢাকার আড়ংসহ বিভিন্ন বড় বিপণিবিতানে বিক্রি হচ্ছে। শুধু দেশেই নয়, গত কয়েক বছর ধরে এসব পণ্য বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সহযোগিতা ও আর্থিক সহায়তা পেলে দেশের চাহিদা পূরণ করে আরও উন্নতমানের মৃৎপণ্য বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

 

নববর্ষকে সামনে রেখে পালপাড়ার কারিগররা অর্ডারকৃত পণ্য তৈরির শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। কেউ ব্যস্ত রঙের কাজে, কেউ পণ্য শুকানো ও পোড়ানোর কাজে, আবার কেউ বাজারজাতকরণ এবং সরবরাহের প্রস্তুতিতে সময় পার করছেন। তবে কাজের চাপ বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তাও কম নয় কারিগরদের।

 

মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর অভিযোগ, এ বছর মাটি, জ্বালানি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় লাভ কমে গেছে। ফলে স্থানীয় বাজারে চাহিদা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ব্যবসা হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

 

পালপাড়ার মৃৎশিল্পের অন্যতম রূপকার ছিলেন প্রয়াত রাজেশ্বর পাল। একসময় তিনি বৈশাখী মেলায় ঘুরে ঘুরে মাটির খেলনা ও বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করতেন। তিনি আজ বেঁচে না থাকলেও তার প্রতিষ্ঠিত কারখানার পণ্য এখনও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান আড়ংসহ বিভিন্ন বড় বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। তার হাত ধরেই পালপাড়ার মৃৎশিল্প আজ নতুন পরিচিতি পেয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

 

বর্তমানে পালপাড়ার এই মৃৎশিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে অর্ধশত পরিবার। একসময় এখানে ১০০ থেকে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ থেকে ৫০ জনে। তবুও যারা এই শিল্পে টিকে আছেন, তারা আশা ছাড়েননি।

 

বাউফল পালপাড়া মৃৎশিল্প সমিতির সভাপতি বিশ্বেশ্বর পাল বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ক্রেতা ও পাইকারদের ভিড় বেড়েছে। আমাদের পণ্য ঢাকার আড়ংসহ বিভিন্ন বড় বড় শপিং কমপ্লেক্সে বিক্রি হয়। দেশের বাইরেও আমাদের তৈরি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। সরকারি আর্থিক সহায়তা ও কাঁচামাল সহজলভ্য হলে আমরা আরও বড় পরিসরে উৎপাদন করতে পারতাম। বর্তমানে ভালো মানের মাটির সংকট রয়েছে, যা আমাদের জন্য বড় সমস্যা।

 

এ বিষয়ে বাউফল প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান বাচ্চু বাসসকে বলেন, ‘পালপাড়ার মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে এই শিল্পের যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়, তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। তবে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে মৃৎশিল্পীদের আর্থিক সহায়তা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সঠিক উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ শিল্প ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে বিকশিত হতে পারবে।

শুধু বর্ষবরণ নয়, বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান, এমনকি ঘরের শোভা বাড়াতেও দিন দিন পালপাড়ার মাটির পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ঐতিহ্য আর নান্দনিকতার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত সহায়তা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পটুয়াখালীর পালপাড়ার মৃৎশিল্প দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

 

এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, ‘পালপাড়ার মৃৎশিল্প আমাদের এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় শিল্প। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এখানকার মৃৎশিল্পীদের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। এ শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সরকারি পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ শিল্প আরও বিকশিত হয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মির্জাগঞ্জে ছাত্রদলের পাল্টাপাল্টি কমিটি, ৯ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিস

পহেলা বৈশাখকে ঘিরে ব্যস্ততা বেড়েছে পটুয়াখালীর পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের

Update Time : ০২:৫৬:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
৬৭

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে বর্ষবরণ আয়োজনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা বেড়েছে মৃৎশিল্পীদের। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যস্ত সময় পার করছেন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা।

 

বর্ষবরণ উপলক্ষে তারা তৈরি করছেন পান্তা খাওয়ার থালা-বাসন, মগ, মিষ্টির পাতিল, ফুলদানি, ডিনার সেট, কাপ-পিরিচসহ নানা ধরনের মাটির পণ্য।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে পালপাড়া এ অঞ্চলের মাটির পণ্যের জন্য পরিচিত। একসময় এখানকার মাটির খেলনা বৈশাখী মেলায় বিক্রি হতো পটুয়াখালীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার, নকশার আধুনিকতা এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ায় এই শিল্পের বাজার এখন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে শুধু খেলনা নয়, বরং নান্দনিক শোপিস, ফুলদানি, ডিনার সেট, মগ, কাপ-পিরিচ ও গৃহসজ্জার নানা উপকরণও তৈরি হচ্ছে এখানে।

 

পালপাড়ার তৈরি মাটির পণ্য এখন ঢাকার আড়ংসহ বিভিন্ন বড় বিপণিবিতানে বিক্রি হচ্ছে। শুধু দেশেই নয়, গত কয়েক বছর ধরে এসব পণ্য বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সহযোগিতা ও আর্থিক সহায়তা পেলে দেশের চাহিদা পূরণ করে আরও উন্নতমানের মৃৎপণ্য বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

 

নববর্ষকে সামনে রেখে পালপাড়ার কারিগররা অর্ডারকৃত পণ্য তৈরির শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। কেউ ব্যস্ত রঙের কাজে, কেউ পণ্য শুকানো ও পোড়ানোর কাজে, আবার কেউ বাজারজাতকরণ এবং সরবরাহের প্রস্তুতিতে সময় পার করছেন। তবে কাজের চাপ বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তাও কম নয় কারিগরদের।

 

মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর অভিযোগ, এ বছর মাটি, জ্বালানি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় লাভ কমে গেছে। ফলে স্থানীয় বাজারে চাহিদা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ব্যবসা হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

 

পালপাড়ার মৃৎশিল্পের অন্যতম রূপকার ছিলেন প্রয়াত রাজেশ্বর পাল। একসময় তিনি বৈশাখী মেলায় ঘুরে ঘুরে মাটির খেলনা ও বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করতেন। তিনি আজ বেঁচে না থাকলেও তার প্রতিষ্ঠিত কারখানার পণ্য এখনও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান আড়ংসহ বিভিন্ন বড় বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। তার হাত ধরেই পালপাড়ার মৃৎশিল্প আজ নতুন পরিচিতি পেয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

 

বর্তমানে পালপাড়ার এই মৃৎশিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে অর্ধশত পরিবার। একসময় এখানে ১০০ থেকে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ থেকে ৫০ জনে। তবুও যারা এই শিল্পে টিকে আছেন, তারা আশা ছাড়েননি।

 

বাউফল পালপাড়া মৃৎশিল্প সমিতির সভাপতি বিশ্বেশ্বর পাল বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ক্রেতা ও পাইকারদের ভিড় বেড়েছে। আমাদের পণ্য ঢাকার আড়ংসহ বিভিন্ন বড় বড় শপিং কমপ্লেক্সে বিক্রি হয়। দেশের বাইরেও আমাদের তৈরি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। সরকারি আর্থিক সহায়তা ও কাঁচামাল সহজলভ্য হলে আমরা আরও বড় পরিসরে উৎপাদন করতে পারতাম। বর্তমানে ভালো মানের মাটির সংকট রয়েছে, যা আমাদের জন্য বড় সমস্যা।

 

এ বিষয়ে বাউফল প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান বাচ্চু বাসসকে বলেন, ‘পালপাড়ার মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে এই শিল্পের যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়, তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। তবে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে মৃৎশিল্পীদের আর্থিক সহায়তা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সঠিক উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ শিল্প ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে বিকশিত হতে পারবে।

শুধু বর্ষবরণ নয়, বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান, এমনকি ঘরের শোভা বাড়াতেও দিন দিন পালপাড়ার মাটির পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ঐতিহ্য আর নান্দনিকতার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত সহায়তা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পটুয়াখালীর পালপাড়ার মৃৎশিল্প দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

 

এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, ‘পালপাড়ার মৃৎশিল্প আমাদের এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় শিল্প। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এখানকার মৃৎশিল্পীদের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। এ শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সরকারি পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ শিল্প আরও বিকশিত হয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।