ঢাকা ০৭:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিকা ও ওষুধ সংকটে হুমকির মুখে বরগুনার প্রাণিসম্পদ খাত

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:৫২:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
  • ২৯ Time View
৫১

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরগুনা জেলার প্রাণিসম্পদ খাত বর্তমানে নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার খামারিদের অভিযোগ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে পিপিআর টিকাসহ বিভিন্ন জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি গরুর খুরা রোগ, লাম্পি স্কিন ডিজিজ, ব্ল্যাক কোয়ার্টার এবং হেমোরেজিক সেপটিসেমিয়া রোগের প্রকোপও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে যেমন খামারিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে জেলার প্রাণিসম্পদ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, বামনা, পাথরঘাটা ও বেতাগী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি টিকাদান কর্মসূচি কাঙ্ক্ষিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। বিশেষ করে ছাগল ও ভেড়ার প্রাণঘাতী রোগ পিপিআর প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকার সরবরাহ খুবই অপ্রতুল।

বরগুনা সদর উপজেলার মাইঠা বড় লবনগোলা গ্রামের ছাগল খামারি মো. হুমায়ুন কবির জানান, গত কয়েক মাস ধরে কয়েকবার প্রাণিসম্পদ অফিসে গিয়েছি। কিন্তু পর্যাপ্ত পিপিআর টিকা পাইনি। বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি দামে টিকা কিনতে হয়েছে। অনেক খামারি আবার অর্থাভাবে টিকাই দিতে পারছেন না। টিকার অভাবে ছাগল মারা যাচ্ছে।

পাথরঘাটার গরু খামারি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এলাকায় খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। আক্রান্ত গরুর মুখে ও খুরে ঘা দেখা দিচ্ছে। অনেক গরু খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিন্তু সরকারি টিকা ও ওষুধ সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।

খামারিদের অভিযোগ, শুধু পিপিআর টিকাই নয়, খুরা রোগ প্রতিরোধী টিকা, কৃমিনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক, ভিটামিন এবং অন্যান্য জরুরি ভেটেরিনারি ওষুধের সরবরাহও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত সেবা না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। বেতাগীর খামারি আবদুল লতিফ বলেন, “গরু অসুস্থ হলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যেতে হয়। অনেক সময় ডাক্তার বা ওষুধ পাওয়া যায় না। এতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা জেলায় হাজার হাজার পরিবার গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। জেলার অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদানও উল্লেখযোগ্য। কিন্তু টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, পিপিআর ছাগল ও ভেড়ার জন্য অত্যন্ত প্রাণঘাতী রোগ। অন্যদিকে খুরা রোগ গরুর উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। লাম্পি স্কিন ডিজিজ আক্রান্ত পশুর শরীরে গুটি সৃষ্টি করে এবং দুধ ও মাংস উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

খামারিদের দাবি, দ্রুত পিপিআর, খুরা রোগ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত ভেটেরিনারি সেবা, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা কার্যক্রম এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের তদারকি বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পিপিআর টিকাসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র চাহিদা অনুপাতে প্রাপ্তি খুবই অপ্রতুল।

তিনি এই সংকটের পেছনের কারণ উল্লেখ করে আরও বলেন, আমাদের বরগুনার জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ প্রথমে বরিশালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বরগুনা আনতে সময় লাগে। এরকম সমস্যা প্রতি মাসেই হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, খামারিদের এই অভিযোগ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বরগুনার প্রাণিসম্পদ খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। শুধু খামারিরাই নয়, জেলার সামগ্রিক অর্থনীতি ও প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জলাবদ্ধতা নিরসন, রাস্তা সংস্কার, দান-অনুদানে প্রশংসায় ভাসছে যুবনেতা আতিক ওসমানী 

টিকা ও ওষুধ সংকটে হুমকির মুখে বরগুনার প্রাণিসম্পদ খাত

Update Time : ০৮:৫২:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
৫১

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরগুনা জেলার প্রাণিসম্পদ খাত বর্তমানে নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার খামারিদের অভিযোগ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে পিপিআর টিকাসহ বিভিন্ন জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি গরুর খুরা রোগ, লাম্পি স্কিন ডিজিজ, ব্ল্যাক কোয়ার্টার এবং হেমোরেজিক সেপটিসেমিয়া রোগের প্রকোপও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে যেমন খামারিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে জেলার প্রাণিসম্পদ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, বামনা, পাথরঘাটা ও বেতাগী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি টিকাদান কর্মসূচি কাঙ্ক্ষিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। বিশেষ করে ছাগল ও ভেড়ার প্রাণঘাতী রোগ পিপিআর প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকার সরবরাহ খুবই অপ্রতুল।

বরগুনা সদর উপজেলার মাইঠা বড় লবনগোলা গ্রামের ছাগল খামারি মো. হুমায়ুন কবির জানান, গত কয়েক মাস ধরে কয়েকবার প্রাণিসম্পদ অফিসে গিয়েছি। কিন্তু পর্যাপ্ত পিপিআর টিকা পাইনি। বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি দামে টিকা কিনতে হয়েছে। অনেক খামারি আবার অর্থাভাবে টিকাই দিতে পারছেন না। টিকার অভাবে ছাগল মারা যাচ্ছে।

পাথরঘাটার গরু খামারি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এলাকায় খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। আক্রান্ত গরুর মুখে ও খুরে ঘা দেখা দিচ্ছে। অনেক গরু খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিন্তু সরকারি টিকা ও ওষুধ সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।

খামারিদের অভিযোগ, শুধু পিপিআর টিকাই নয়, খুরা রোগ প্রতিরোধী টিকা, কৃমিনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক, ভিটামিন এবং অন্যান্য জরুরি ভেটেরিনারি ওষুধের সরবরাহও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত সেবা না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। বেতাগীর খামারি আবদুল লতিফ বলেন, “গরু অসুস্থ হলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যেতে হয়। অনেক সময় ডাক্তার বা ওষুধ পাওয়া যায় না। এতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা জেলায় হাজার হাজার পরিবার গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। জেলার অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদানও উল্লেখযোগ্য। কিন্তু টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, পিপিআর ছাগল ও ভেড়ার জন্য অত্যন্ত প্রাণঘাতী রোগ। অন্যদিকে খুরা রোগ গরুর উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। লাম্পি স্কিন ডিজিজ আক্রান্ত পশুর শরীরে গুটি সৃষ্টি করে এবং দুধ ও মাংস উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

খামারিদের দাবি, দ্রুত পিপিআর, খুরা রোগ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত ভেটেরিনারি সেবা, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা কার্যক্রম এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের তদারকি বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পিপিআর টিকাসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র চাহিদা অনুপাতে প্রাপ্তি খুবই অপ্রতুল।

তিনি এই সংকটের পেছনের কারণ উল্লেখ করে আরও বলেন, আমাদের বরগুনার জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ প্রথমে বরিশালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বরগুনা আনতে সময় লাগে। এরকম সমস্যা প্রতি মাসেই হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, খামারিদের এই অভিযোগ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বরগুনার প্রাণিসম্পদ খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। শুধু খামারিরাই নয়, জেলার সামগ্রিক অর্থনীতি ও প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।