ঢাকা ১২:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালের বিবর্তনে বাউফলে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার সৌন্দর্য বর্ধনের সকল ঐতিহ্য!

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:২৪:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
  • ১১ Time View
১৯

মো.আরিফুল ইসলাম,বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: সুজলা-সুফলা,শস্য-শ্যামলা অপরুপ রুপে গড়া গ্রামের প্রতিটি মাঠ ঘাট। সকাল হতে  না হতেই পাখির কিচির-মিচির শব্দে ঘুম ভাঙা শীতের সকালের মিষ্টি রোদে মেঠো পথ ধরে হাটা যেন আনন্দের ঢেউ খেলে যায় পুরো শরীরজুড়ে। গ্রাম শব্দটা শুনলেই যেন মনের ভেতর  থেকে একটি বিশেষ ভালোলাগা তৈরি হয়। সেই গ্রাম থেকেই দিনে দিনে  হারিয়ে যাচ্ছে সৌন্দর্য বর্ধনের প্রাচীনকালের সকল ঐতিহ্য।

আগেকার দিনে মানুষ লাঙল দিয়ে হাল চাষ করতো। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠলে কানে ভেসে উঠতো কৃষকের কন্ঠে সুমধুর গানের সুর। গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে নতুন ধান উঠার সাথে সাথে হরেক রকমের পিঠা তৈরির ধুমধাম পড়ে যেতো। নবান্নের উৎসবে মেতে উঠতো গ্রামের সকল মানুষ। এখন প্রযুক্তি দ্বারা হাল চাষ করায় আগেরকার দিনে আনন্দঘন মুহুর্তগুলো আর চোখে পড়ে না।

আমাদের গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের একটি অন্যতম সামগ্রী ছিল ঢেঁকি। পিঠা তৈরির একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গ্রামীণ নারীরা চিতই পিঠা, রুটি পিঠা, তালের পিঠা, রসা পিঠাসহ হরেক রকমের পিঠা তৈরি করতেন ঢেঁকিতে ভাঙ্গা চালের গুঁড়া দিয়ে। একসময় গ্রাম-গঞ্জসহ সর্বত্র ধান ভাঙ্গা,চালের গুঁড়া করা,চাল দিয়ে চিড়া তৈরি, মশলাপাতি ভাঙ্গানোসহ বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। কালের বিবর্তনে এখন বৈদ্যুতিক মিলে চালের গুঁড়াসহ সবকিছু গুড়া করা হচ্ছে।

বাঁশের তৈরি হাজি, বড় ডালা, ছোট ডালা এলাকা ভেদে একেক নামে ডাকা হয়। সাধারণত মাটি, ঘাস, ধান ও ময়লা-আবর্জনা বহন করার কাজে এটি ব্যাবহার করা হয়। এটি তৈরি করতে নিপুণ হস্তশিল্পের প্রয়োজন হয়। যা এখনো ব্যবহার করে আসছে প্রবীণ কৃষকেরা।

গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রাচীন কাল থেকেই কুলা ব্যাবহার হয়ে আসছে। কুলা মূলত ধান থেকে চিটা ধান, চাল, ময়লা, বালু, মৃত চাল বেছে ঝেরে ফেলে দেওয়ার জন্য। বাঙালিদের বিয়েতে কুলা ব্যাবহার হয় উপহারের ডালা সাজানোর জন্য। কুলা তৈরিতেও মূল উপকরণ হচ্ছে বাঁশ।

সবশেষে ধান রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করার জন্য ব্যবহিত হতো ডোলা ও মাইট।
কুমাররা মাটি দিয়ে বড়ো আকারে দেখতে পাতিলের মতো বানিয়ে সেটাকে রোদে শুকিয়ে পরে আগুনে পোড়াতো। সেটার ভিতরে ২০-৫০ কেজির মতো ধান চাল বা ডাল রেখে ব্যবহার করতো বাড়ির গ্রামীণ নারীরা। এখন প্লাস্টিক ড্রামের দখলে সেই পুরনো মাইট।

যেমন কথায় আছে ডোলা ভরা ধান পুকুর ভরা মাছ আর ঘোয়াল ভরা গরু। ডোলা মূলত প্রাচীন কাল থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন ৪০ কেজিতে এক মন তেমনই ১০০ মন তথবা ৫০ মন ধান বা চাউল রাখার জন্য ডোলা ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। এটি তৈরি করতে নিপুণ হস্তশিল্পের প্রয়োজন হয়। যে কেউ চাইলেই ডুলা তৈরি করতে পারবে না। ডুলা তৈরির মূল উপকরণও হচ্ছে বাঁশ।

বাঁশের আবার বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে। শুধুমাত্র ‘ডোল্লা’ প্রজাতির বাঁশ দিয়ে ভালোভাবে ডোলা তৈরি করা যায়। বর্তমানে তৈল ব্যবহৃত স্টিল-প্লাস্টিক ড্রামের ব্যাবহার বেড়ে যাওয়াতে ডোলা তৈরি কমে যাচ্ছে। তাই এসব আসবাবপত্র  তৈরি করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন কারিগররা।

এবিষয়ে বাউফল উপজেলার অলিপুরা গ্রামের কারিগর বীরেন্দ্রনাথ বলেন,পূর্বপুরুষ থেকে শেখা এই কাজ। দেশ আধুনিক হওয়ায় গ্রাম গঞ্জের মানুষ এখন আর এসব জিনিসপত্র ব্যবহার  করে না ফলে বেকারত্বে ভুগছেন কারিগররা।

নুরাইনপুর গ্রামের বাসিন্দা কারিগর কমল চন্দ্র মাঝী(৩৭) বলেন,প্রতি সোমবার কালাইয়ার হাটে  ২৫-৩০ হাজার টাকার বিভিন্ন প্রকার আসবাবপত্র নিয়ে আসলেও বেচা কেনা নেই আগের মতো। বাশেঁর ওদিক দামের কারনেও এ-সব কাজ ছেড়ে দিয়েছেন কারিগররা।

বর্তমান প্রযুক্তির সুবিধা ও এর ব্যবহারে এগিয়ে গেছে গোটা বিশ্ব। এরই ধারাবাহিকতায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলা থেকে এসব চিরচেনা হস্তশিল্প।

ছোট-ডালিমা গ্রামের প্রবীন  কৃষক ইউনুছ মোল্লা (৭৭)বলেন, বাশের তৈরি হাজি কুলা চালন ও ডোলার ব্যাবহার প্রাচীন কাল থেকে করে আসছি। বর্তমানে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের থেকে প্লাস্টিকের টিকসই অনেক বেশি।

নাজিরপুর ছোট-ডালিমা মাধ্যমিক  বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক এসএম মাইনুল  ইসলাম বলেন, বর্তমান সময়ে কৃষকেরা চাষের প্রকারভেদ পরিবর্তন করে ধান, ডাল, গম, ভূট্টা, তিল, তিশি ও শীতকালীন চাষাবাদ না করার কারনে এবং অধিক মাত্রায় তরমুজের চাষাবাদ করার কারণে। হারিয়ে যাওয়ার পথে গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য বর্ধনের সকল প্রকার ঐতিহ্য।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

পোশাক শিল্পে মূল্য সংযোজন বাড়াতে বাংলাদেশে বড় সম্ভাবনা দেখছে দক্ষিণ কোরিয়া

কালের বিবর্তনে বাউফলে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার সৌন্দর্য বর্ধনের সকল ঐতিহ্য!

Update Time : ১১:২৪:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
১৯

মো.আরিফুল ইসলাম,বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: সুজলা-সুফলা,শস্য-শ্যামলা অপরুপ রুপে গড়া গ্রামের প্রতিটি মাঠ ঘাট। সকাল হতে  না হতেই পাখির কিচির-মিচির শব্দে ঘুম ভাঙা শীতের সকালের মিষ্টি রোদে মেঠো পথ ধরে হাটা যেন আনন্দের ঢেউ খেলে যায় পুরো শরীরজুড়ে। গ্রাম শব্দটা শুনলেই যেন মনের ভেতর  থেকে একটি বিশেষ ভালোলাগা তৈরি হয়। সেই গ্রাম থেকেই দিনে দিনে  হারিয়ে যাচ্ছে সৌন্দর্য বর্ধনের প্রাচীনকালের সকল ঐতিহ্য।

আগেকার দিনে মানুষ লাঙল দিয়ে হাল চাষ করতো। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠলে কানে ভেসে উঠতো কৃষকের কন্ঠে সুমধুর গানের সুর। গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে নতুন ধান উঠার সাথে সাথে হরেক রকমের পিঠা তৈরির ধুমধাম পড়ে যেতো। নবান্নের উৎসবে মেতে উঠতো গ্রামের সকল মানুষ। এখন প্রযুক্তি দ্বারা হাল চাষ করায় আগেরকার দিনে আনন্দঘন মুহুর্তগুলো আর চোখে পড়ে না।

আমাদের গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের একটি অন্যতম সামগ্রী ছিল ঢেঁকি। পিঠা তৈরির একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গ্রামীণ নারীরা চিতই পিঠা, রুটি পিঠা, তালের পিঠা, রসা পিঠাসহ হরেক রকমের পিঠা তৈরি করতেন ঢেঁকিতে ভাঙ্গা চালের গুঁড়া দিয়ে। একসময় গ্রাম-গঞ্জসহ সর্বত্র ধান ভাঙ্গা,চালের গুঁড়া করা,চাল দিয়ে চিড়া তৈরি, মশলাপাতি ভাঙ্গানোসহ বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। কালের বিবর্তনে এখন বৈদ্যুতিক মিলে চালের গুঁড়াসহ সবকিছু গুড়া করা হচ্ছে।

বাঁশের তৈরি হাজি, বড় ডালা, ছোট ডালা এলাকা ভেদে একেক নামে ডাকা হয়। সাধারণত মাটি, ঘাস, ধান ও ময়লা-আবর্জনা বহন করার কাজে এটি ব্যাবহার করা হয়। এটি তৈরি করতে নিপুণ হস্তশিল্পের প্রয়োজন হয়। যা এখনো ব্যবহার করে আসছে প্রবীণ কৃষকেরা।

গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রাচীন কাল থেকেই কুলা ব্যাবহার হয়ে আসছে। কুলা মূলত ধান থেকে চিটা ধান, চাল, ময়লা, বালু, মৃত চাল বেছে ঝেরে ফেলে দেওয়ার জন্য। বাঙালিদের বিয়েতে কুলা ব্যাবহার হয় উপহারের ডালা সাজানোর জন্য। কুলা তৈরিতেও মূল উপকরণ হচ্ছে বাঁশ।

সবশেষে ধান রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করার জন্য ব্যবহিত হতো ডোলা ও মাইট।
কুমাররা মাটি দিয়ে বড়ো আকারে দেখতে পাতিলের মতো বানিয়ে সেটাকে রোদে শুকিয়ে পরে আগুনে পোড়াতো। সেটার ভিতরে ২০-৫০ কেজির মতো ধান চাল বা ডাল রেখে ব্যবহার করতো বাড়ির গ্রামীণ নারীরা। এখন প্লাস্টিক ড্রামের দখলে সেই পুরনো মাইট।

যেমন কথায় আছে ডোলা ভরা ধান পুকুর ভরা মাছ আর ঘোয়াল ভরা গরু। ডোলা মূলত প্রাচীন কাল থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন ৪০ কেজিতে এক মন তেমনই ১০০ মন তথবা ৫০ মন ধান বা চাউল রাখার জন্য ডোলা ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। এটি তৈরি করতে নিপুণ হস্তশিল্পের প্রয়োজন হয়। যে কেউ চাইলেই ডুলা তৈরি করতে পারবে না। ডুলা তৈরির মূল উপকরণও হচ্ছে বাঁশ।

বাঁশের আবার বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে। শুধুমাত্র ‘ডোল্লা’ প্রজাতির বাঁশ দিয়ে ভালোভাবে ডোলা তৈরি করা যায়। বর্তমানে তৈল ব্যবহৃত স্টিল-প্লাস্টিক ড্রামের ব্যাবহার বেড়ে যাওয়াতে ডোলা তৈরি কমে যাচ্ছে। তাই এসব আসবাবপত্র  তৈরি করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন কারিগররা।

এবিষয়ে বাউফল উপজেলার অলিপুরা গ্রামের কারিগর বীরেন্দ্রনাথ বলেন,পূর্বপুরুষ থেকে শেখা এই কাজ। দেশ আধুনিক হওয়ায় গ্রাম গঞ্জের মানুষ এখন আর এসব জিনিসপত্র ব্যবহার  করে না ফলে বেকারত্বে ভুগছেন কারিগররা।

নুরাইনপুর গ্রামের বাসিন্দা কারিগর কমল চন্দ্র মাঝী(৩৭) বলেন,প্রতি সোমবার কালাইয়ার হাটে  ২৫-৩০ হাজার টাকার বিভিন্ন প্রকার আসবাবপত্র নিয়ে আসলেও বেচা কেনা নেই আগের মতো। বাশেঁর ওদিক দামের কারনেও এ-সব কাজ ছেড়ে দিয়েছেন কারিগররা।

বর্তমান প্রযুক্তির সুবিধা ও এর ব্যবহারে এগিয়ে গেছে গোটা বিশ্ব। এরই ধারাবাহিকতায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলা থেকে এসব চিরচেনা হস্তশিল্প।

ছোট-ডালিমা গ্রামের প্রবীন  কৃষক ইউনুছ মোল্লা (৭৭)বলেন, বাশের তৈরি হাজি কুলা চালন ও ডোলার ব্যাবহার প্রাচীন কাল থেকে করে আসছি। বর্তমানে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের থেকে প্লাস্টিকের টিকসই অনেক বেশি।

নাজিরপুর ছোট-ডালিমা মাধ্যমিক  বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক এসএম মাইনুল  ইসলাম বলেন, বর্তমান সময়ে কৃষকেরা চাষের প্রকারভেদ পরিবর্তন করে ধান, ডাল, গম, ভূট্টা, তিল, তিশি ও শীতকালীন চাষাবাদ না করার কারনে এবং অধিক মাত্রায় তরমুজের চাষাবাদ করার কারণে। হারিয়ে যাওয়ার পথে গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য বর্ধনের সকল প্রকার ঐতিহ্য।