
ভা-ারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি: পিরোজপুরের ভা-ারিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের কর্মকর্তা শিল্পী হালাদার এর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নানা অয়িমের কারনে এ দপ্তরের কার্যক্রমে নানা সংকট বিরাজ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, তাকে মাসিক নির্ধাতি হারে ফি পরিশোধ করে অফিস না করে মাসের পর মাস বেতন ভাতাসহ সকল সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে মাঠ পর্যায়ের কয়েজন কর্মচারী। এদের মধ্যে উপজেলার ভিটাবাড়ীয়া ইউনিয়নের পরিদর্শক আবদুল মতিন, তেলিখালী ইউনিয়নের পরিদর্শক সোহাগ হাওলাদার ও একই পরিবারের সদস্য পরিবার কল্যাণ সহকারী শারমিন আক্তার এর বিরুদ্ধে অফিস না করে বেতন ভাতা উত্তোলন করে আসছেন। এদিকে অফিসের কর্মচারী পরিবার কল্যাণ সহকারী আলো রানী পিআরএল গেলে তার লাম্পগ্রান্ট টাকা আজ পর্যন্ত দেয় নি। এদের সকলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ করেছেন সেবা গ্রহিতা এলাকাবাসী।
জানাগেছে, গত ২৫ মার্চ বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ পেয়ে ভিটাবাড়িয়া ও তেলিখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আকস্মিক পরিদর্শন করেন। এসময় ভিটাবাড়ীয়া ইউনিয়নের পরিদর্শক আবদুল মতিন কে অফিসে পাওয়া যায়নি এবং তেলিখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র তালাবদ্ধ পান। একই দিনে দুটি অফিস সরেজমিনে পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বিভাগীয় পরিচালক তাৎক্ষণিকভাবে পিরোজপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক তুহিন কান্তি ঘোষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। রহস্যজন ভাবে পিরোজপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক তুহিন কান্তি ঘোষ এসব অনিয়মের পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কেবল শোকজ নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চলে যাওয়ার পর তেলিখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের তালা খুলে দেন একই পরিবারের সদস্য, পরিদর্শক সোহাগ হাওলাদারের বড় বোন ও কর্মচারী নাজমা বেগম।
কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শিল্পী হালদারের সঙ্গে যোগসাজশে উপ-পরিচালক সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের রক্ষায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। ফলে ভা-ারিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের পরিদর্শক আবদুল মতিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও পরে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে উপস্থিতি দেখিয়ে আসছেন। গত বছরের ২২ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিনা ছুটিতে অনুপস্থিত থাকার পরও তিনি হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেন। অভিযোগ রয়েছে, এমন অনিয়ম তিনি প্রায় প্রতি মাসেই করে থাকেন। এ বিষয়ে পিরোজপুরের উপ-পরিচালক পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়মের সত্যতাও পান।
এছাড়া গত ২১ জানুয়ারি হাজিরা দিয়ে ২২ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও মাসের শেষ দিন এসে পুরো মাসের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন আবদুল মতিন। একইভাবে ফেব্রুয়ারির ৩ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত তার অনুপস্থিতির বিষয়টি বরিশাল বিভাগীয় পরিচালকের পরিদর্শনের সময় ধরা পড়ে।
পরবর্তীতে ২৪ ও ২৫ মার্চ পরিদর্শনের সময়ও তাকে অনুপস্থিত পাওয়া গেলে বিষয়টি জেলা উপ-পরিচালককে অবহিত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শিল্পী হালদারকে ম্যানেজ করে তিনি ইচ্ছেমতো অফিস করছেন। তবে এসব অনিয়মের মধ্যেও উপজেলার অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে উপজেলায় ৫ জন পরিদর্শক, ২২ জন পরিবার কল্যাণ সহকারী, ৫ জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা এবং একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (এসএসিএমও) নিয়মিতভাবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি কার্যত একটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। পরিদর্শক সোহাগ হাওলাদারকে ঘিরে দেবর, ভাবী ও বোন এই তিনজন মিলে পুরো দপ্তর পরিচালনার চিত্র সামনে এসেছে। সোহাগ হাওলাদারের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন ব্যক্তিকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে পরিবার কল্যাণ সহকারী শারমিন আক্তার স্বামী সন্তানসহ ঢাকায় অবস্থান করেও কীভাবে নিয়মিত তেলিখালীতে অফিস করেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
একই অফিসে কর্মরত আয়া নাজমা আক্তার, যিনি সোহাগের বোন, তার বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরে অফিসে অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গত ২৫ মার্চ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে পরিদর্শনে এসে এসব অনিয়মের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে দায় এড়ানোর অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
এদিকে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শিল্পী হালদারের বিরুদ্ধেও আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অর্থ ইউনিট থেকে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের আওতায় উপজেলা ওয়ারি (নন-ক্লিনিক) খাতে কর্মচারীদের ভ্রমণ ভাতা ও দাপ্তরিক আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্ধারিত কোড অনুযায়ী ব্যয়ের নির্দেশনা থাকলেও, বরাদ্দের হার্ড কপি হাতে পাওয়ার আগেই তিনি ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবিএএস) থেকে প্রায় ৫৯ হাজার টাকা ভ্রমণ ভাতা হিসেবে উত্তোলন করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, বরাদ্দের তালিকায় তার নামে কোনো অর্থ না থাকলেও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার টাকা তাদের না দিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া অফিসের নামে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল অকেজো থাকা সত্ত্বেও তার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, তিনি ঝালকাঠীতে অবস্থান করেও ইচ্ছেমতো অফিস পরিচালনা করেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে জমা দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম থেকে রক্ষা পেতে তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শিল্পী হালাদার তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন টাকা উত্তোলন করতে কোন কিছুর প্রয়োজন হয় না। কর্মচারীদের অনুপস্থিতের ব্যাপারে তিনি বলেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না পেলে কি ভাবে ব্যবস্থা নিবো। মাসকে মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও সংশ্লিস্ট ইউনিয়নের দায়িত্বে যিনি থাকবেন তিনি ব্যবস্থা নিবেন। সে ক্ষেত্রে তার কোন দায়িত্ব নেই।
এ বিষয়ে উপ-পরিচালক তুহিন কান্তি ঘোষ বলেন, ইন্টিগ্রেটেট বাজেট এন্ড একাউন্টিং সিস্টেম (আইবিএএস) বরাদ্দ দিলেও বরাদ্দর চিঠি বিবাজনের আগেই উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শিল্পী হালাদার টাকা উত্তোলন করেন। মাঠপর্যায় কর্মীদের দেখবাল করার দায়িত্বে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার। তিনি রিপোর্ট করলে আমি জানতে পারব তখন আমি ব্যবস্থা নিব।
এব্যাপারে বিভাগী পরিচালক আবুল কালামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, প্রাথমিক একটি রির্পোট পেয়েছি। উক্ত কমিটির তদন্ত রির্পোটে অসংগতি থাকায় উচ্চ পর্যায় আর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সে রির্পোট পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অনিয়ম ও দুনীর্তি করে কেউ পার পাবে না।
উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ভা-ারিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরে পারিশ্রমিক ও ভ্রমণ ভাতায় কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক তুহিন কান্তি ঘোষ প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে পরিবার পরিকল্পনা সহকারী হাসিনা খানমকে ভা-ারিয়া থেকে নেছারাবাদ উপজেলায় বদলি করেন। ঘটনাটি নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে দীর্ঘ ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আলোর মুখ দেখেনি, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
Reporter Name 













