ঢাকা ০১:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশালে ২০ বছর ধরে এমবিবিএস ছাড়াই ভুয়া চিকিৎসকের চেম্বার!

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:১২:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫৭ Time View
১৩২
রাহাদ সুমন, বিশেষ প্রতিনিধি: বরিশালের গৌরনদীতে কোনো এমবিবিএস ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চোখের চিকিৎসা দিয়ে আসার বিষয়টি নিজেই অকপটে স্বীকার করেছেন মোঃ ইব্রাহিম খলিল (৬০) নামে এক কথিত ডাক্তার। রোগী দেখার সময় তিনি ফোনে এক চিকিৎসক ‘স্যার’ এর সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন, যা নিয়ে জনমনে গভীর শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ভুরঘাটা বাজার সংলগ্ন একটি ফার্মেসিতে সপ্তাহে তিন দিন রোগী দেখেন তিনি। বাকি সময় নিজ বাসা ইল্লায় বসেই রোগীদের চিকিৎসা দেন। চোখের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা তার কাছে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, রোগীদের বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক প্রেসক্রিপশন পর্যালোচনা করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দেখা গেছে, ব্যবহৃত প্রেসক্রিপশন প্যাডের ওপরের অংশে ডান পাশে ইব্রাহিম খলিলের নাম এবং বাম পাশে এফ আর হাবীবের নাম উল্লেখ রয়েছে। এতে চিকিৎসা কার্যক্রমের ধরন ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রেসক্রিপশন দেওয়ার পর প্যাডে থাকা এফ আর হাবীবের নাম ও নম্বর মার্কার দিয়ে মুছে ফেলেন ইব্রাহিম খলিল।
এ ছাড়া জানা গেছে, ইব্রাহিম খলিলের ফার্মেসির ড্রাগ লাইসেন্স থাকলেও বাসায় চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক সেবার বাইরে যাওয়ার কোনো অনুমতি নেই। অথচ তিনি নিয়মিত রোগী দেখে ওষুধ প্রদান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বললে ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘আমি এমবিবিএস ডাক্তার না। বাংলাদেশ স্টেট মেডিকেল থেকে প্যারামেডিকেল কোর্স করেছি। রোগী এলে মাঝে মাঝে আমার ‘স্যার’-কে ফোন করি, তিনি যেভাবে চিকিৎসা দিতে বলেন, আমি সেই অনুযায়ী ওষুধ দেই।’ তিনি জানান, তার ওই স্যারের নাম এফ আর হাবীব, যিনি ঢাকার একটি আই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এফ আর হাবীব বলেন, ‘তিনি মাঝে মাঝে ফোন করেন। তখন কিছু পরামর্শ দিই, তবে সব সময় নয়।’
এই দুই বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরাসরি রোগী না দেখে ফোনে পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয় বলে মনে করছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে এমন পদ্ধতি রোগীর জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এ ধরনের কার্যক্রম প্রচলিত চিকিৎসা নীতিমালার পরিপন্থী বলেও মত দিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ‘অনেকেই তাকে চিকিৎসক মনে করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি চিকিৎসক নন এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, চোখের মতো সংবেদনশীল অঙ্গের চিকিৎসায় সামান্য ভুলও স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। সরাসরি পরীক্ষা ছাড়া ফোনের মাধ্যমে পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি রোগীকে অন্ধত্ববরণও করা লাগতে পারে।
এ বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ ফকরুল ইসলাম মৃধা বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি চিকিৎসা দিলে তা আইনত দণ্ডনীয়।
এ বিষয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, ‘এমবিবিএস ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অডিও বা ভিডিও কলের মাধ্যমেও পল্লী চিকিৎসকের এ ধরনের ওষুধ দেওয়ার অধিকার নেই।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে ইউনিলিভার অফিসের সামনে থেকে অটোগাড়ি চুরির অভিযোগ

বরিশালে ২০ বছর ধরে এমবিবিএস ছাড়াই ভুয়া চিকিৎসকের চেম্বার!

Update Time : ০১:১২:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
১৩২
রাহাদ সুমন, বিশেষ প্রতিনিধি: বরিশালের গৌরনদীতে কোনো এমবিবিএস ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চোখের চিকিৎসা দিয়ে আসার বিষয়টি নিজেই অকপটে স্বীকার করেছেন মোঃ ইব্রাহিম খলিল (৬০) নামে এক কথিত ডাক্তার। রোগী দেখার সময় তিনি ফোনে এক চিকিৎসক ‘স্যার’ এর সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন, যা নিয়ে জনমনে গভীর শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ভুরঘাটা বাজার সংলগ্ন একটি ফার্মেসিতে সপ্তাহে তিন দিন রোগী দেখেন তিনি। বাকি সময় নিজ বাসা ইল্লায় বসেই রোগীদের চিকিৎসা দেন। চোখের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা তার কাছে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, রোগীদের বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক প্রেসক্রিপশন পর্যালোচনা করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দেখা গেছে, ব্যবহৃত প্রেসক্রিপশন প্যাডের ওপরের অংশে ডান পাশে ইব্রাহিম খলিলের নাম এবং বাম পাশে এফ আর হাবীবের নাম উল্লেখ রয়েছে। এতে চিকিৎসা কার্যক্রমের ধরন ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রেসক্রিপশন দেওয়ার পর প্যাডে থাকা এফ আর হাবীবের নাম ও নম্বর মার্কার দিয়ে মুছে ফেলেন ইব্রাহিম খলিল।
এ ছাড়া জানা গেছে, ইব্রাহিম খলিলের ফার্মেসির ড্রাগ লাইসেন্স থাকলেও বাসায় চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক সেবার বাইরে যাওয়ার কোনো অনুমতি নেই। অথচ তিনি নিয়মিত রোগী দেখে ওষুধ প্রদান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বললে ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘আমি এমবিবিএস ডাক্তার না। বাংলাদেশ স্টেট মেডিকেল থেকে প্যারামেডিকেল কোর্স করেছি। রোগী এলে মাঝে মাঝে আমার ‘স্যার’-কে ফোন করি, তিনি যেভাবে চিকিৎসা দিতে বলেন, আমি সেই অনুযায়ী ওষুধ দেই।’ তিনি জানান, তার ওই স্যারের নাম এফ আর হাবীব, যিনি ঢাকার একটি আই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এফ আর হাবীব বলেন, ‘তিনি মাঝে মাঝে ফোন করেন। তখন কিছু পরামর্শ দিই, তবে সব সময় নয়।’
এই দুই বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরাসরি রোগী না দেখে ফোনে পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয় বলে মনে করছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে এমন পদ্ধতি রোগীর জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এ ধরনের কার্যক্রম প্রচলিত চিকিৎসা নীতিমালার পরিপন্থী বলেও মত দিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ‘অনেকেই তাকে চিকিৎসক মনে করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি চিকিৎসক নন এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, চোখের মতো সংবেদনশীল অঙ্গের চিকিৎসায় সামান্য ভুলও স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। সরাসরি পরীক্ষা ছাড়া ফোনের মাধ্যমে পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি রোগীকে অন্ধত্ববরণও করা লাগতে পারে।
এ বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ ফকরুল ইসলাম মৃধা বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি চিকিৎসা দিলে তা আইনত দণ্ডনীয়।
এ বিষয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, ‘এমবিবিএস ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অডিও বা ভিডিও কলের মাধ্যমেও পল্লী চিকিৎসকের এ ধরনের ওষুধ দেওয়ার অধিকার নেই।