ঢাকা ০১:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে ২ কোটি মানুষ বহন করছে থ্যালাসেমিয়ার জিন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:৫৯:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
  • ৬১ Time View
১০৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বের থ্যালাসেমিয়া প্রবণ অঞ্চলের মধ্যে একটি দেশ বাংলাদেশ, বংশগত রক্তস্বল্পতার এই রোগটি ধীরে ধীরে ‘নীরব হুমকি’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে।

প্রতিবছর দেশে ৬ থেকে ৮ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। বর্তমানে দেশে এ রোগীর সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ হাজার। তবে আক্রান্ত শিশুর জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট (অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন) করে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব। সচেতন হলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সহজ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া হলো একটি বংশগত রক্তস্বল্পতার রোগ, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত বা স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। ফলে রোগীরা দীর্ঘমেয়াদে রক্তস্বল্পতায় ভোগে এবং বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়। থ্যালাসেমিয়া কোনো সংক্রামক রোগ নয়, বরং জেনেটিকভাবে বাবা-মা থেকে সন্তানের মধ্যে ছড়ায়। তাই এটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব এবং কিছু দেশ এই পদ্ধতিতে সফলভাবে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক সংখ্যা প্রায় ২৫০ মিলিয়ন। বাংলাদেশে প্রায় ১০ থেকে ১২ ভাগ মানুষই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। বিশ্বে প্রতি বছর ১ লাখ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

‘অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেস’-এ প্রকাশিত বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) এক রিভিউ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১০.৯ থেকে ১৩.৩ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক, অর্থাৎ প্রায় ১.৭ থেকে ২.২ কোটি মানুষ এই জিন বহন করছে। সচেতনতার অভাব ও দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ন্যাশনাল থ্যালাসেমিয়া সার্ভে ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। বিভাগীয় হারে রংপুরে ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে আছে রাজশাহীতে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে আছে চট্টগ্রামে ১১ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া ময়মনসিংহে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। খুলনা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ঢাকা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। বরিশাল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। সিলেটে সব চেয়ে কম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমান জানান, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। এ রোগে হিমোগ্লোবিনের গঠন নির্ধারণকারী জিন ত্রুটিযুক্ত হয়। এই জিনের একটি অংশ যদি ত্রুটিযুক্ত হয়, তখন সেই ব্যক্তি হবেন বাহক। তাই বাবা ও মা দুজনই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, শুধু তখনই তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি থাকে। একজন বাহক কিন্তু অন্যজন বাহক না হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।

তিনি বলেন, শিশুর জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই এই রোগের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। যেমন শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হওয়া, শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ঘন ঘন রোগসংক্রমণ, খেতে না চাওয়া, ওজন না বাড়া, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি। এ রোগে অনেক সময় শিশুর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যেতে পারে।

চিকিৎসার চেয়ে সচেতনতার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা বেশি সহজ উল্লেখ করে সৈয়দা মাসুমা রহমান বলেন, বাহককে জানতে হবে যে, তিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক। তিনি এমন একজনকে বিয়ে করবেন, যিনি বাহক নন। তাহলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার কোনো ভয় থাকবে না। এর জন্য বিয়ের আগে দুজনকেই একটি রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। এটিকে বলা হয় সিবিসি টেস্ট বা কমপ্লিট ব¬াড কাউন্ট টেস্ট। এ ছাড়া রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বিশ্লেষণ করে অথবা ডিএনএ বা জেনেটিক পরীক্ষা মাধ্যমেও থ্যালাসেমিয়ার বাহক শনাক্ত করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, যিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক, তিনি কিন্তু রোগী নন। এটি অবশ্যই ভালো যে রোগটির কোনো লক্ষণই বাহকের শরীরে প্রকাশ পায় না। কিন্তু বাহক যদি না জেনে আরেকজন বাহককে বিয়ে করেন, তাহলে তাদের সন্তান গুরুতর থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মাতে পারে। এটি প্রতিরোধে তাই ব্যক্তিপর্যায়ের জনসচেতনতা প্রয়োজন।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে তরুণদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে সৈয়দা মাসুমা রহমান বলেন, ‘বিয়ের আগে একটি ছোট্ট পরীক্ষাই পারে আপনার ভবিষ্যৎ পরিবারকে রক্ষা করতে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জলাবদ্ধতা নিরসন, রাস্তা সংস্কার, দান-অনুদানে প্রশংসায় ভাসছে যুবনেতা আতিক ওসমানী 

দেশে ২ কোটি মানুষ বহন করছে থ্যালাসেমিয়ার জিন

Update Time : ০৩:৫৯:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
১০৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বের থ্যালাসেমিয়া প্রবণ অঞ্চলের মধ্যে একটি দেশ বাংলাদেশ, বংশগত রক্তস্বল্পতার এই রোগটি ধীরে ধীরে ‘নীরব হুমকি’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে।

প্রতিবছর দেশে ৬ থেকে ৮ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। বর্তমানে দেশে এ রোগীর সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ হাজার। তবে আক্রান্ত শিশুর জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট (অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন) করে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব। সচেতন হলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সহজ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া হলো একটি বংশগত রক্তস্বল্পতার রোগ, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত বা স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। ফলে রোগীরা দীর্ঘমেয়াদে রক্তস্বল্পতায় ভোগে এবং বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়। থ্যালাসেমিয়া কোনো সংক্রামক রোগ নয়, বরং জেনেটিকভাবে বাবা-মা থেকে সন্তানের মধ্যে ছড়ায়। তাই এটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব এবং কিছু দেশ এই পদ্ধতিতে সফলভাবে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক সংখ্যা প্রায় ২৫০ মিলিয়ন। বাংলাদেশে প্রায় ১০ থেকে ১২ ভাগ মানুষই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। বিশ্বে প্রতি বছর ১ লাখ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

‘অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেস’-এ প্রকাশিত বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) এক রিভিউ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১০.৯ থেকে ১৩.৩ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক, অর্থাৎ প্রায় ১.৭ থেকে ২.২ কোটি মানুষ এই জিন বহন করছে। সচেতনতার অভাব ও দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ন্যাশনাল থ্যালাসেমিয়া সার্ভে ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। বিভাগীয় হারে রংপুরে ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে আছে রাজশাহীতে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে আছে চট্টগ্রামে ১১ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া ময়মনসিংহে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। খুলনা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ঢাকা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। বরিশাল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। সিলেটে সব চেয়ে কম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমান জানান, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। এ রোগে হিমোগ্লোবিনের গঠন নির্ধারণকারী জিন ত্রুটিযুক্ত হয়। এই জিনের একটি অংশ যদি ত্রুটিযুক্ত হয়, তখন সেই ব্যক্তি হবেন বাহক। তাই বাবা ও মা দুজনই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, শুধু তখনই তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি থাকে। একজন বাহক কিন্তু অন্যজন বাহক না হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।

তিনি বলেন, শিশুর জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই এই রোগের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। যেমন শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হওয়া, শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ঘন ঘন রোগসংক্রমণ, খেতে না চাওয়া, ওজন না বাড়া, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি। এ রোগে অনেক সময় শিশুর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যেতে পারে।

চিকিৎসার চেয়ে সচেতনতার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা বেশি সহজ উল্লেখ করে সৈয়দা মাসুমা রহমান বলেন, বাহককে জানতে হবে যে, তিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক। তিনি এমন একজনকে বিয়ে করবেন, যিনি বাহক নন। তাহলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার কোনো ভয় থাকবে না। এর জন্য বিয়ের আগে দুজনকেই একটি রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। এটিকে বলা হয় সিবিসি টেস্ট বা কমপ্লিট ব¬াড কাউন্ট টেস্ট। এ ছাড়া রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বিশ্লেষণ করে অথবা ডিএনএ বা জেনেটিক পরীক্ষা মাধ্যমেও থ্যালাসেমিয়ার বাহক শনাক্ত করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, যিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক, তিনি কিন্তু রোগী নন। এটি অবশ্যই ভালো যে রোগটির কোনো লক্ষণই বাহকের শরীরে প্রকাশ পায় না। কিন্তু বাহক যদি না জেনে আরেকজন বাহককে বিয়ে করেন, তাহলে তাদের সন্তান গুরুতর থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মাতে পারে। এটি প্রতিরোধে তাই ব্যক্তিপর্যায়ের জনসচেতনতা প্রয়োজন।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে তরুণদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে সৈয়দা মাসুমা রহমান বলেন, ‘বিয়ের আগে একটি ছোট্ট পরীক্ষাই পারে আপনার ভবিষ্যৎ পরিবারকে রক্ষা করতে।