
নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়মে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক হলেও ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ১৭নং চেংগুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮৬ বছরেও খেলার মাঠ হয়নি।
এই নিয়ম ভঙ্গের পেছনে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বে চরম অবহেলাকে দায়ী করছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ৪২ শতক জমির স্কুলটিতে নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও ২০০৫-২০০৬ সালে নির্মিত পুরাতন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এখনো অপসারণ করা হয়নি। এছাড়া মাঠের মাঝখানে কয়েকটি বড় গাছ ও পাশের পুকুর ভাঙনের কারণে খেলার জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। গ্রামে বিকল্প খেলার মাঠ না থাকায় স্কুল ছুটির পর শিশু-কিশোররা সীমিত জায়গায় ঝুঁকি নিয়ে খেলে, নয়তো ঘরে বসে মোবাইলে গেমসে মগ্ন থাকে।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিরা, রাইসা, ইরা বলে, “স্কুলে খেলার জায়গা নাই, আমরা ঠিক ভাবে খেলাধুলা করতে পারিনা তাই বাড়ি গিয়া মোবাইল দেখি।” সহকারী শিক্ষক সোহেল হাওলাদার বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬ সালে এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা ইউনিয়ন পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বিশেষ করে মাঠের অভাবে ঠিকভাবে চর্চা না করার কারণে উপজেলা পর্যায়ে ভালো করতে পারেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবক সৈয়দ আজাদ মাসুম বলেন, এই গ্রামে একটা খেলার মাঠ নাই। আমাদের ছেলেমেয়েরা যাবে কই? স্কুলের জায়গাতেই মাঠ করা সম্ভব। পুরান বিল্ডিংটা ভাঙলেই হয়। না হলে আমাদের বাচ্চাগুলা সব মোবাইল দেখে নষ্ট হয়ে যাবে। স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবক মহাসিন হোসেন তালুকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি নিয়মে মাঠ বাধ্যতামূলক। অথচ ৮৬ বছর ধরে ৩টা প্রজন্ম পার হয়ে গেল। ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষা অফিস, জনপ্রতিনিধি কেউ নিয়ম বাস্তবায়ন করলো না এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিরিন সুলতানা বলেন, “শিক্ষার্থীরা সংকীর্ণ জায়গায় খেলতে গিয়ে ছোট-বড় দুর্ঘটনায় আহত হয়। ৪২ শতাংশ জমিতে পরিকল্পিতভাবে পুরাতন ভবন ভেঙে, গাছ সরিয়ে ও পুকুর ভাঙন রোধ করলেই এখানে একটি আদর্শ মাঠ করা সম্ভব। এই মাঠ হলে শুধু স্কুলের ১৮০ জন নয়, গ্রামের শত শত শিশু-কিশোর উপকৃত হবে। তাদের মোবাইল আসক্তিও কমবে। এছাড়াও স্কুলের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ও একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা জরুরি।” এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আমজাদ হোসেন বলেন, আমি অতি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি, বিষয়টি আমার নজরে এসেছে।
নিয়ম অনুযায়ী মাঠ বাধ্যতামূলক। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ ও মাঠের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবো। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. ইলিয়াছ তালুকদার বলেন, স্কুলের মাঠের বিষয়টি আমার নজরে আছে। জনগণের দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিখন বনিক বলেন, সরকারি নিয়ম ভেঙে ৮৬ বছর ধরে একটি স্কুল মাঠ না পাওয়া দুঃখজনক। কারও একার নয়, এটা সম্মিলিত ব্যর্থতা। ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষা অফিস, প্রকৌশল বিভাগ ও জনপ্রতিনিধি সবাইকে নিয়ে জরুরি সভা করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ ও মাঠ উন্নয়নে দ্রুত সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্কুলের মাঠ হলে গ্রামের শিশুদেরও খেলার সুযোগ হবে। শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও শুধু তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে চেংগুটিয়ার মতো শত শত স্কুল মাঠবিহীন রয়ে গেছে। এতে শিশুদের মোবাইল আসক্তি, স্থূলতা ও মানসিক সমস্যা মহামারী আকার ধারণ করছে। একটি গ্রামে খেলার মাঠ না থাকা শুধু স্কুলের সমস্যা নয়, সামাজিক সংকট। এর ফলে শিশু-কিশোররা মাদক ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
Reporter Name 













