ঢাকা ১১:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শতাধিক মামলা আর ১শ দিনের রিমান্ড : মন্ত্রীর চেয়ারে কারাগারে তারুণ্য বিলানো রাজিব

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:৪৬:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৭৬ Time View
১৬৭

ডেস্ক রিপোর্ট : মাত্র ৪৭ বছরের জীবনে তারুণ্যের পুরো সময়টাই কেটেছে মামলা জেলখানা আদালতের বারান্দা আর লুকিয়ে-পালিয়ে থেকে। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়ে প্রায় ৪ বছর ছিলেন কারাগারে। রিমান্ডে নিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতনের শিকার হওয়া প্রশ্নেও ভেঙেছেন রেকর্ড।

 

১৭ বছরে ১২৩ দিন সইতে হয়েছে পুলিশি রিমান্ডের অত্যাচার। সঙ্গে ছিল যেকোনো মুহূর্তে গুম-খুন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক।

 

আজন্ম বিএনপি করা সেই রাজিব আহসান এখন বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী। দায়িত্ব পেয়েছেন সড়ক-সেতু-রেলপথ ও নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের।

 

যোগাযোগ প্রশ্নে চরম অবহেলিত বরিশাল অঞ্চলে রাজিব আহসানের এ প্রাপ্তিতে খুশি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পুরোটা সময় সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকা এই নেতার কাছে তাই অনেক প্রত্যাশাও তাদের।

 

বরিশালের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মেহেন্দীগঞ্জে জন্ম রাজিব আহসানের। বাবা মিজানুর রহমান ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। উপজেলার পাতারহাট জুবলী ও টিটিসি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেষ করেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া। এরপর জুবলী ইনস্টিটিউিশনে মাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন পাতারহাট আরসি কলেজে। এই আরসি কলেজ থেকেই শুরু রাজনৈতিক জীবন। ছাত্রদলের কলেজ কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। এখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে স্নাতকের লেখাপড়া শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 

বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করার পাশাপাশি ছিলেন ক্যাম্পাসের তুখোড় ছাত্রনেতা। প্রথমে কবি জসীম উদদীন হলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পরে সভাপতি। ছাত্রদলের হেলাল-বাবু কমিটিতে সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের মধ্যদিয়ে আসেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে। এরপর পালন করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের প্রচার ও সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব।

 

২০১৫ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি করা হয় তাকে। সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর পান স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। বর্তমানে এ দায়িত্বেই আছেন তিনি।

 

দেশের যে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা আওয়ামী শাসনামলে সবচেয়ে বেশি অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন- তার মধ্যে অন্যতম রাজিব। ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট আমলে ১৩০টির বেশি মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রায় প্রতিদিনই বাসায় চলতো পুলিশের হানা। ২ বোন আর মাকে নিয়ে থাকা রাজিবের ছোট্ট পরিবারকে নিয়মিত হেনস্তা করত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

একমাত্র ছোট ভাইয়ের জন্য যেমন সারাক্ষণই আতঙ্কে থাকত দুই বোন তেমনি ছেলের যেন কিছু না হয় সেই মোনাজাতে জায়নামাজে কাটত বৃদ্ধা মায়ের দিনরাত। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়ে প্রায় ৪ বছর জেলে থেকেছেন রাজিব। জেলে থাকার এ সময়ে চলত রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার।

 

তার স্কুলজীবনের বন্ধু বরিশাল (উত্তর) জেলা যুবদলের আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন পিপলু বলেন, সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। গ্রেফতার এড়িয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করতে কোথায় না লুকিয়েছেন রাজিব আহসান। এলাকায় আসতে পারতেন না। এলেও থাকতে হতো পালিয়ে। কত রাত কেটেছে নদীর মধ্যে ভাসমান জেলে নৌকায়। একবার পটুয়াখালীতে রাজিব আর আমিসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আমাদের থেকে আলাদা করে গোপন কোনো জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় রাজিবকে। পরিকল্পনা চলছিল তাকে খুন করে লাশ গুম করার। নিজের কানে শুনেছি সেই পরিকল্পনার আলোচনা। প্রায় ৫ ঘণ্টা নিখোঁজ করে রাখা হয় তাকে। বিষয়টি জানতে পেরে গ্রেফতারের খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন সাংবাদিকরা। জানাজানি হয়ে যাওয়ায় পরে গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।

 

পরীক্ষিত এই নেতাকে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। ৫৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে এমপি হন তিনি। তারপর তাকে ঠাঁই দেওয়া হয় মন্ত্রিসভায়। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সড়ক সেতু রেলপথ আর নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।

 

প্রতিমন্ত্রী পদে রাজিবের এ নিয়োগে দারুণ খুশি তার নির্বাচনি এলাকা তথা বরিশালের মানুষ। বরিশাল নাগরিক পরিষদের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, সড়ক আর নৌ-যোগাযোগ প্রশ্নে সব সরকারের আমলেই অবহেলিত বরিশাল বিভাগ। এর আগে এই জেলায় আর কখনো সড়ক সেতু কিংবা নৌমন্ত্রী করা হয়নি কোনো এমপিকে। নতুন এই প্রতিমন্ত্রীর কাছে তাই অনেক প্রত্যাশা। বিশেষ করে ঢাকা-কুয়াকাটা এক্সপ্রেস সড়ক, কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন, ভোলা-বরিশাল সেতু, ঢাকা-কুয়াকাটা রেললাইন এখন সবচেয়ে জরুরি। এসব বিষয়ে তিনি নজর দেবেন সেটাই প্রত্যাশা।

 

মন্ত্রিত্ব পাওয়া নিয়ে আলাপকালে রাজিব আহসান বলেন, প্রথমেই কৃতজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি। তিনি আমাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার যোগ্য মনে করেছেন। কতদূর কী পারব জানি না, তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে মানুষের ইচ্ছা পূরণের। সূত্র : যুগান্তর

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে ইউনিলিভার অফিসের সামনে থেকে অটোগাড়ি চুরির অভিযোগ

শতাধিক মামলা আর ১শ দিনের রিমান্ড : মন্ত্রীর চেয়ারে কারাগারে তারুণ্য বিলানো রাজিব

Update Time : ০৩:৪৬:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
১৬৭

ডেস্ক রিপোর্ট : মাত্র ৪৭ বছরের জীবনে তারুণ্যের পুরো সময়টাই কেটেছে মামলা জেলখানা আদালতের বারান্দা আর লুকিয়ে-পালিয়ে থেকে। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়ে প্রায় ৪ বছর ছিলেন কারাগারে। রিমান্ডে নিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতনের শিকার হওয়া প্রশ্নেও ভেঙেছেন রেকর্ড।

 

১৭ বছরে ১২৩ দিন সইতে হয়েছে পুলিশি রিমান্ডের অত্যাচার। সঙ্গে ছিল যেকোনো মুহূর্তে গুম-খুন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক।

 

আজন্ম বিএনপি করা সেই রাজিব আহসান এখন বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী। দায়িত্ব পেয়েছেন সড়ক-সেতু-রেলপথ ও নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের।

 

যোগাযোগ প্রশ্নে চরম অবহেলিত বরিশাল অঞ্চলে রাজিব আহসানের এ প্রাপ্তিতে খুশি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পুরোটা সময় সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকা এই নেতার কাছে তাই অনেক প্রত্যাশাও তাদের।

 

বরিশালের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মেহেন্দীগঞ্জে জন্ম রাজিব আহসানের। বাবা মিজানুর রহমান ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। উপজেলার পাতারহাট জুবলী ও টিটিসি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শেষ করেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া। এরপর জুবলী ইনস্টিটিউিশনে মাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন পাতারহাট আরসি কলেজে। এই আরসি কলেজ থেকেই শুরু রাজনৈতিক জীবন। ছাত্রদলের কলেজ কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। এখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে স্নাতকের লেখাপড়া শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 

বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করার পাশাপাশি ছিলেন ক্যাম্পাসের তুখোড় ছাত্রনেতা। প্রথমে কবি জসীম উদদীন হলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পরে সভাপতি। ছাত্রদলের হেলাল-বাবু কমিটিতে সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের মধ্যদিয়ে আসেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে। এরপর পালন করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের প্রচার ও সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব।

 

২০১৫ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি করা হয় তাকে। সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর পান স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। বর্তমানে এ দায়িত্বেই আছেন তিনি।

 

দেশের যে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা আওয়ামী শাসনামলে সবচেয়ে বেশি অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন- তার মধ্যে অন্যতম রাজিব। ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট আমলে ১৩০টির বেশি মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রায় প্রতিদিনই বাসায় চলতো পুলিশের হানা। ২ বোন আর মাকে নিয়ে থাকা রাজিবের ছোট্ট পরিবারকে নিয়মিত হেনস্তা করত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

একমাত্র ছোট ভাইয়ের জন্য যেমন সারাক্ষণই আতঙ্কে থাকত দুই বোন তেমনি ছেলের যেন কিছু না হয় সেই মোনাজাতে জায়নামাজে কাটত বৃদ্ধা মায়ের দিনরাত। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়ে প্রায় ৪ বছর জেলে থেকেছেন রাজিব। জেলে থাকার এ সময়ে চলত রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার।

 

তার স্কুলজীবনের বন্ধু বরিশাল (উত্তর) জেলা যুবদলের আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন পিপলু বলেন, সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। গ্রেফতার এড়িয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করতে কোথায় না লুকিয়েছেন রাজিব আহসান। এলাকায় আসতে পারতেন না। এলেও থাকতে হতো পালিয়ে। কত রাত কেটেছে নদীর মধ্যে ভাসমান জেলে নৌকায়। একবার পটুয়াখালীতে রাজিব আর আমিসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আমাদের থেকে আলাদা করে গোপন কোনো জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় রাজিবকে। পরিকল্পনা চলছিল তাকে খুন করে লাশ গুম করার। নিজের কানে শুনেছি সেই পরিকল্পনার আলোচনা। প্রায় ৫ ঘণ্টা নিখোঁজ করে রাখা হয় তাকে। বিষয়টি জানতে পেরে গ্রেফতারের খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন সাংবাদিকরা। জানাজানি হয়ে যাওয়ায় পরে গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।

 

পরীক্ষিত এই নেতাকে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। ৫৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে এমপি হন তিনি। তারপর তাকে ঠাঁই দেওয়া হয় মন্ত্রিসভায়। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সড়ক সেতু রেলপথ আর নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।

 

প্রতিমন্ত্রী পদে রাজিবের এ নিয়োগে দারুণ খুশি তার নির্বাচনি এলাকা তথা বরিশালের মানুষ। বরিশাল নাগরিক পরিষদের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, সড়ক আর নৌ-যোগাযোগ প্রশ্নে সব সরকারের আমলেই অবহেলিত বরিশাল বিভাগ। এর আগে এই জেলায় আর কখনো সড়ক সেতু কিংবা নৌমন্ত্রী করা হয়নি কোনো এমপিকে। নতুন এই প্রতিমন্ত্রীর কাছে তাই অনেক প্রত্যাশা। বিশেষ করে ঢাকা-কুয়াকাটা এক্সপ্রেস সড়ক, কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন, ভোলা-বরিশাল সেতু, ঢাকা-কুয়াকাটা রেললাইন এখন সবচেয়ে জরুরি। এসব বিষয়ে তিনি নজর দেবেন সেটাই প্রত্যাশা।

 

মন্ত্রিত্ব পাওয়া নিয়ে আলাপকালে রাজিব আহসান বলেন, প্রথমেই কৃতজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি। তিনি আমাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার যোগ্য মনে করেছেন। কতদূর কী পারব জানি না, তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে মানুষের ইচ্ছা পূরণের। সূত্র : যুগান্তর