ঢাকা ০৭:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাণ্ডারিয়ায় জেলে পেশায় বহুমুখী সংকট : থমকে আছে অর্ধশত ট্রলার

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:৫১:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
  • ৫৩ Time View
৮৫

তরিকুল ইসলাম,ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি: মাছ ধরার মৌসুম চললেও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় উপজেলা ভাণ্ডারিয়ায় গভীর সংকটে পড়েছেন সমুদ্রগামী জেলেরা। একের পর এক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ায় উপজেলার শতাধিক ফিশিং বোট ও প্রায় ১১ শতাধিক জেলে থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৫০টির মতো বোট সমুদ্রে ফিশিংয়ের জন্য যাচ্ছে। তবে এসব বোটও নানা সংকটে থমকে আছে, ফলে জেলেরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। অধিকাংশ জেলে নিয়মিত সমুদ্রে যেতে পারছেন না। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এসব জেলেদের পরিবারসহ প্রায় চার হাজার মানুষ। জীবিকার তাগিদে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদলে দিনমজুরের কাজ করছেন।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভাণ্ডারিয়ায় মোট ৭২টি ফিশিং বোটের লাইসেন্স রয়েছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও লাইসেন্সবিহীন মিলিয়ে উপজেলায় প্রায় ১১০টি ফিশিং বোট রয়েছে। এসব বোটের সঙ্গে প্রায় ১১ শতাধিক জেলে সমুদ্রগামী জীবিকার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাস্তবে সব বোট নিয়মিতভাবে মাছ ধরার জন্য সমুদ্রে যায় না।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের নানা সংকটে তাদের মাছ ধরার কার্যক্রম এখন প্রায় অচল অবস্থায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। একটি বোট সমুদ্রে যেতে গড়ে ৭ থেকে ৮ ব্যারেল জ্বালানি প্রয়োজন হলেও বর্তমানে জ্বালানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। আর পাওয়া গেলেও প্রতি ২০০ লিটারের ব্যারেলে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। ফলে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক জেলে এখন সমুদ্রে যেতে সাহস হারিয়ে ফেলছেন।

অন্যদিকে, ১০ থেকে ১২ দিনের একটি মাছ ধরার ট্রিপে গড়ে প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হলেও ফিরে এসে মাছ বিক্রি করে আয় হয় মাত্র ২ লাখ টাকার মতো। এতে প্রতিবারই লোকসানে পড়তে হচ্ছে জেলেদের। টানা ক্ষতির কারণে অনেকেই ঋণের বোঝা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

জেলেরা অভিযোগ করেন, সমুদ্রে বড় আকারের ইস্পাত বডির ট্রলিং জাহাজের কারণে তারা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব জাহাজ জাল ফেলে টেনে নেওয়ার সময় ছোট বোটের জাল ছিঁড়ে ফেলে বা নষ্ট করে দেয়। এতে কয়েক লাখ টাকার জাল মুহূর্তেই অচল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ট্রলারগুলোর ট্রলিং বোর্ডের কারণে নির্দিষ্ট স্থানে জাল ফেলতেও পারছেন না তারা।

আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমুদ্রে পাতা হাজার হাজার বাঁধা জাল। এসব জালের কারণে স্বাভাবিকভাবে মাছ ধরার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে জাল ফেলতে হয়, যা আবার ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, ভারতীয় জেলেরা প্রায়ই বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে অবৈধভাবে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি অবরোধকালীন সময়েও তারা নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি বোটে ক্যামেরা, জিপিএস, ওয়্যারলেসসহ নানা সরঞ্জাম থাকে। শতাধিক বোট একসঙ্গে প্রবেশ করে বাংলাদেশি জেলেদের ভয়ভীতি দেখানো ও মারধরের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জেলেরা আরও জানান, ভারতীয় জেলেরা তাদের নৌবাহিনীর সহায়তা পেয়ে থাকে। সমুদ্রে কোনো বড় ধরনের বিপদে পড়লে তাদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়, যা বাংলাদেশের সাধারণ জেলেদের কাছে সম্পূর্ণ কল্পনাতীত। এ ধরনের বাস্তবতায় নিজেদেরকে তারা চরম অসহায় ও অনিরাপদ মনে করছেন।

এর পাশাপাশি জেলেরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি আবার নতুন করে জলদস্যুদের উৎপাত বাড়তে শুরু করেছে, যা তাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আগে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও এখন তা নিয়মিত হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে মাঝপথে লুটপাট, জাল ও মাছ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এমনকি অনেক সময় ট্রলার আটকে মাঝিদের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ দাবি করার ঘটনাও ঘটছে।

এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রে যাওয়া এখন শুধু লোকসানের নয়, জীবনের ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে অনেক জেলে সমুদ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন, যা পুরো মৎস্য খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চরখালী এলাকার এফবি মায়ের দোয়া বোটের মাঝি আমির হোসেন বলেন, এক সময় নিয়মিত সমুদ্রে যেতাম, তখন আয়-রোজগার দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালানো যেত। কিন্তু এখন খরচই উঠে না। প্রতিটি ট্রিপেই লোকসান হচ্ছে। বাধ্য হয়ে ঋণ করে চলছি, কিন্তু এভাবে আর কতদিন টিকে থাকা যাবে জানি না।

একই এলাকার আরেক মাঝি সবুজ হোসেন জানান, আমাদের জন্য জালই সবচেয়ে বড় পুঁজি। সমুদ্রে গিয়ে জাল নষ্ট হলে আমরা একেবারে পথে বসে যাই। কিন্তু কোনো সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ আমরা পাই না।

এফবি ইমন এন্টারপ্রাইজ বোটের মাঝি মনির উকিল বলেন, সমুদ্রে এখন নিরাপত্তা নেই। বড় ট্রলার আর বিদেশি জেলেদের কারণে আমরা টিকতে পারছি না।

এফবি আল্লাহর দান বোটের মাঝি বশির তালুকদার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। একের পর এক সমস্যা, লোকসান আর নিরাপত্তাহীনতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে চললে বাধ্য হয়েই জেলে পেশা ছেড়ে দিতে হবে।

স্থানীয় জেলেরা দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ ট্রলিং বন্ধ, সমুদ্রসীমা রক্ষা, জলদস্যু দমন এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

পিরোজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত জানান, আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এ সময়ে সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে, ফলে জ্বালানির প্রয়োজনও থাকবে না। বর্তমানে যারা সমুদ্রে অবস্থান করছেন, তাদের দ্রুত উপকূলে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সমুদ্রে ট্রলিং সম্পূর্ণ অবৈধ। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় একটি ট্রলিং বোটের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন। এছাড়া অন্যান্য ট্রলিং বোটের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের আওতার বাইরে হলেও, এলাকাভিত্তিকভাবে এসবের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জলাবদ্ধতা নিরসন, রাস্তা সংস্কার, দান-অনুদানে প্রশংসায় ভাসছে যুবনেতা আতিক ওসমানী 

ভাণ্ডারিয়ায় জেলে পেশায় বহুমুখী সংকট : থমকে আছে অর্ধশত ট্রলার

Update Time : ০৩:৫১:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
৮৫

তরিকুল ইসলাম,ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি: মাছ ধরার মৌসুম চললেও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় উপজেলা ভাণ্ডারিয়ায় গভীর সংকটে পড়েছেন সমুদ্রগামী জেলেরা। একের পর এক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ায় উপজেলার শতাধিক ফিশিং বোট ও প্রায় ১১ শতাধিক জেলে থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৫০টির মতো বোট সমুদ্রে ফিশিংয়ের জন্য যাচ্ছে। তবে এসব বোটও নানা সংকটে থমকে আছে, ফলে জেলেরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। অধিকাংশ জেলে নিয়মিত সমুদ্রে যেতে পারছেন না। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এসব জেলেদের পরিবারসহ প্রায় চার হাজার মানুষ। জীবিকার তাগিদে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদলে দিনমজুরের কাজ করছেন।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভাণ্ডারিয়ায় মোট ৭২টি ফিশিং বোটের লাইসেন্স রয়েছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও লাইসেন্সবিহীন মিলিয়ে উপজেলায় প্রায় ১১০টি ফিশিং বোট রয়েছে। এসব বোটের সঙ্গে প্রায় ১১ শতাধিক জেলে সমুদ্রগামী জীবিকার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাস্তবে সব বোট নিয়মিতভাবে মাছ ধরার জন্য সমুদ্রে যায় না।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের নানা সংকটে তাদের মাছ ধরার কার্যক্রম এখন প্রায় অচল অবস্থায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। একটি বোট সমুদ্রে যেতে গড়ে ৭ থেকে ৮ ব্যারেল জ্বালানি প্রয়োজন হলেও বর্তমানে জ্বালানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। আর পাওয়া গেলেও প্রতি ২০০ লিটারের ব্যারেলে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। ফলে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক জেলে এখন সমুদ্রে যেতে সাহস হারিয়ে ফেলছেন।

অন্যদিকে, ১০ থেকে ১২ দিনের একটি মাছ ধরার ট্রিপে গড়ে প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হলেও ফিরে এসে মাছ বিক্রি করে আয় হয় মাত্র ২ লাখ টাকার মতো। এতে প্রতিবারই লোকসানে পড়তে হচ্ছে জেলেদের। টানা ক্ষতির কারণে অনেকেই ঋণের বোঝা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

জেলেরা অভিযোগ করেন, সমুদ্রে বড় আকারের ইস্পাত বডির ট্রলিং জাহাজের কারণে তারা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব জাহাজ জাল ফেলে টেনে নেওয়ার সময় ছোট বোটের জাল ছিঁড়ে ফেলে বা নষ্ট করে দেয়। এতে কয়েক লাখ টাকার জাল মুহূর্তেই অচল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ট্রলারগুলোর ট্রলিং বোর্ডের কারণে নির্দিষ্ট স্থানে জাল ফেলতেও পারছেন না তারা।

আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমুদ্রে পাতা হাজার হাজার বাঁধা জাল। এসব জালের কারণে স্বাভাবিকভাবে মাছ ধরার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে জাল ফেলতে হয়, যা আবার ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, ভারতীয় জেলেরা প্রায়ই বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে অবৈধভাবে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি অবরোধকালীন সময়েও তারা নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি বোটে ক্যামেরা, জিপিএস, ওয়্যারলেসসহ নানা সরঞ্জাম থাকে। শতাধিক বোট একসঙ্গে প্রবেশ করে বাংলাদেশি জেলেদের ভয়ভীতি দেখানো ও মারধরের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জেলেরা আরও জানান, ভারতীয় জেলেরা তাদের নৌবাহিনীর সহায়তা পেয়ে থাকে। সমুদ্রে কোনো বড় ধরনের বিপদে পড়লে তাদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়, যা বাংলাদেশের সাধারণ জেলেদের কাছে সম্পূর্ণ কল্পনাতীত। এ ধরনের বাস্তবতায় নিজেদেরকে তারা চরম অসহায় ও অনিরাপদ মনে করছেন।

এর পাশাপাশি জেলেরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি আবার নতুন করে জলদস্যুদের উৎপাত বাড়তে শুরু করেছে, যা তাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আগে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও এখন তা নিয়মিত হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে মাঝপথে লুটপাট, জাল ও মাছ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এমনকি অনেক সময় ট্রলার আটকে মাঝিদের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ দাবি করার ঘটনাও ঘটছে।

এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রে যাওয়া এখন শুধু লোকসানের নয়, জীবনের ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে অনেক জেলে সমুদ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন, যা পুরো মৎস্য খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চরখালী এলাকার এফবি মায়ের দোয়া বোটের মাঝি আমির হোসেন বলেন, এক সময় নিয়মিত সমুদ্রে যেতাম, তখন আয়-রোজগার দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালানো যেত। কিন্তু এখন খরচই উঠে না। প্রতিটি ট্রিপেই লোকসান হচ্ছে। বাধ্য হয়ে ঋণ করে চলছি, কিন্তু এভাবে আর কতদিন টিকে থাকা যাবে জানি না।

একই এলাকার আরেক মাঝি সবুজ হোসেন জানান, আমাদের জন্য জালই সবচেয়ে বড় পুঁজি। সমুদ্রে গিয়ে জাল নষ্ট হলে আমরা একেবারে পথে বসে যাই। কিন্তু কোনো সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ আমরা পাই না।

এফবি ইমন এন্টারপ্রাইজ বোটের মাঝি মনির উকিল বলেন, সমুদ্রে এখন নিরাপত্তা নেই। বড় ট্রলার আর বিদেশি জেলেদের কারণে আমরা টিকতে পারছি না।

এফবি আল্লাহর দান বোটের মাঝি বশির তালুকদার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। একের পর এক সমস্যা, লোকসান আর নিরাপত্তাহীনতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে চললে বাধ্য হয়েই জেলে পেশা ছেড়ে দিতে হবে।

স্থানীয় জেলেরা দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ ট্রলিং বন্ধ, সমুদ্রসীমা রক্ষা, জলদস্যু দমন এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

পিরোজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত জানান, আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এ সময়ে সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে, ফলে জ্বালানির প্রয়োজনও থাকবে না। বর্তমানে যারা সমুদ্রে অবস্থান করছেন, তাদের দ্রুত উপকূলে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সমুদ্রে ট্রলিং সম্পূর্ণ অবৈধ। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় একটি ট্রলিং বোটের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন। এছাড়া অন্যান্য ট্রলিং বোটের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের আওতার বাইরে হলেও, এলাকাভিত্তিকভাবে এসবের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।