
নিজস্ব প্রতিবেদক : কম সময়ে বেশি মাছের আশায় একশ্রেণির অসাধু জেলে বৈদ্যুতিক তার যুক্ত বিশেষ ধরনের জালি দিয়ে মেঘনা নদীর বরিশালের হিজলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শাখায় নদীতে অতিগোপনে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারে মেতে উঠেছে। এতে করে মৎস্য সম্পদসহ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পরেছে।
অবশেষে হিজলা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য অফিসার মোহাম্মদ আলম গোপন সংবাদের ভিত্তিত্বে অভিযান চালিয়ে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরার সময় রবিবার (১৫ মার্চ) দিবাগত রাতে একটি ট্রলারসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইস যন্ত্র জব্দ করেছেন। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪০ হাজার টাকা। তবে অভিযান টের পেয়ে অসাধু জেলেরা পালিয়ে গেছে।
হিজলা উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্যানুযায়ী, মেঘনা নদী ইলিশের অভায়ারণ্য। এছাড়াও মেঘনার শাখা নদী ও খালে প্রায় সব প্রজাতির মাছই মেলে। তবে ছোট মাছের মধ্যে বাঁশপাতারি, বৈরালি, বেলে, রিঠা, গলদা চিংড়িই বেশি পাওয়া যায়। আর বড় মাছের মধ্যে ইলিশ থেকে শুরু করে ৫ থেকে ১০ কেজি ওজনের পাঙাশ, বাগাড়, বোয়াল, ভেউশ মেলে। মেঘনা ও তার শাখা নদীকে ঘিরে যুগের পর যুগ ধরে কয়েক হাজার জেলে মাছ শিকারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কতিপয় অসাধু জেলে কম সময়ের মধ্যে নদীতে বিদ্যুতের শক দিয়ে মাছ ধরায় মেতে উঠেছে। অথচ বৈদ্যুতিক শকে নদীতে থাকা মাছের পোনা, ডিম এমনকি সাপ এবং ব্যাঙসহ নানা ধরনের কীটপতঙ্গ মরে যাচ্ছে। ফলে মেঘনা ও তার শাখা নদী-খালে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পরেছে।
সূত্রে আরও জানা গেছে, একশ্রেণির মানুষ রিকশা অথবা ইজিবাইকে ব্যবহৃত ব্যাটারির সাথে একটি ইনভার্টার (ব্যাটারির নির্ধারিত ভোল্টকে কয়েকগুণ বাড়ানোর যন্ত্র) যুক্ত করে বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরির মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনে মেঘনা ও তার শাখা নদী-খালে মাছ শিকারে মেতে উঠেছে। বিষয়টি টের পেয়ে উপজেলার সিনিয়র মৎস্য অফিসারকে অবহিত করা হয়েছে। হিজলা উপজেলার মৌলভীরহাট এলাকার একাধিক জেলেরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কতিপয় অসাধু জেলেরা নদী ও খালে কারেন্ট দিয়ে নিমেষেই ছোট-বড় সব মাছ মারছে। তারা গভীর রাতে মাছ ধরতে নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ মেরে ভোরে বাড়িতে ফেরে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে নদীতে কোনো মাছই থাকবে না।
হিজলা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য অফিসার মোহাম্মদ আলম তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারের পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ব্যাটারি ও ইনভার্টার থেকে দুটি তার বের করে একটি পানিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। আর অন্যটি একটি জালির সাথে যুক্ত করা হয়। বিদ্যুতায়িত ওই জালি যখন নদীর পানিতে ফেলা হচ্ছে তখন ৫ থেকে ৭ ফুট দূরত্বের মধ্যে থাকা মাছ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠা সেই মাছগুলো পরে জালি দিয়ে নৌকায় তোলা হয়। ওই পদ্ধতিতে মাছ শিকারের ফলে সাপ ও ব্যাঙ মারা পরছে।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার আরও বলেন, বিষয়টি জানার পর রবিবার (১৫ মার্চ) দিবাগত রাতে হিজলা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সাব ইন্সপেক্টর মো. শাহজাদাসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের সাথে নিয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় হিজলা উপজেলার মৌলভীরহাট নামক এলাকা থেকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ ধরার সময়ে একটি ট্রলারসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইস যন্ত্র জব্দ করা হয়েছে।
অভিযুক্ত শিকারিদের আটক করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে মোহাম্মদ আলম বলেন, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে স্থানীয়দের সচেতন করা হচ্ছে। পানি বিদ্যুতায়িত করার কারণে মাছের সাথে বিচরণরত সাপ এবং ব্যাঙসহ অন্যান্য কীটপতঙ্গ মারা পরছে জানিয়ে মৎস্য অফিসার বলেন, বৈদ্যুতিক শক থেকে মাছসহ কোনো জলজ প্রাণী বেঁচে গেলেও প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়।
ফলে আমাদের জীববৈচিত্র্যই হুমকির মুখে পরছে। তাছাড়া বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নিধন করা মাছ মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কারণ এতে তাৎক্ষণিক পচন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার মোহাম্মদ আলম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং গতিপথ পরিবর্তনসহ নানা কারণে এমনিতেই নদীতে মাছের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এরইমধ্যে বৈদ্যুতিক শক শিকারের কারণে পোনামাছ মরে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন আরও কমতে শুরু করেছে। ফলে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
Reporter Name 














