ঢাকা ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত জুলাই শহীদের স্বজনেরা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:০০:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
  • ৪ Time View
১০

নিজস্ব প্রতিবেদক : চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সন্তান হারানো মায়ের কান্না, বাবার দীর্ঘশ্বাস, ভাইয়ের আহাজারি আর আহত যোদ্ধাদের বেদনায় আজ ভারী হয়ে ওঠে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র।

জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছর শাসনের পতনের ২ বছর পর এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের না-বলা কষ্ট, দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। অনেকেই বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।

শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুল রব মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জুলাই এলেই চোখের পানির বাঁধ ভাঙে। ৫ আগস্ট আমার ছেলের বুক গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পুলিশ। আমি এক হতভাগা বাবা এই অন্যায়ের বিচার চাই, প্রতিটি জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।’

চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, ‘আমার ছেলে আর ফিরে আসবে না। কিন্তু আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়। এখন সরকারের কাছে দাবি, জুলাই যোদ্ধা যারা হাত পা হারিয়েছে তাদের সহায়তা করুন। তারা যেনো কষ্টে না থাকে।’

আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ভাই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন দিয়েছে। তার অনুপ্রেরণায় আরও অনেকে শহীদ হয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তাদের পাশে সরকারের দাঁড়াতে হবে। আমার ভাই হত্যার দ্রুত বিচার চাই। পাশাপাশি সারা দেশে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণেরও দাবি করছি।’

শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ‘আমার বড় ছেলে জাহিদ মারা যাওয়ার পরে আমার ছোট ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়ে। আমি অসহায় অবস্থায়, ওই সময় এমন কোনো দরজায় নেই যেখানে যাইনি, কিন্তু সহায়তা পাইনি। তবে ‘আমারা বিএনপি পরিবার’-এর প্রত্যেকটি সদস্য আমাদের পাশে ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থেকে আমাদের খোঁজ নিয়েছেন, সহায়তা করেছেন। এখন বিএনপি সরকারের কাছে একটাই দাবি- সকল জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার চাই। আমি যেভাবে বিএনপির কাছে সহায়তা পেয়েছি অন্য জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরাও যেনো সহায়তা পায়। আমার সন্তানকে তো আর ফিরে পাবো না, তবে সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন।’

শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

শহীদ আলভীর বাবা আবুল হাসান বলেন, ‘আমার ছেলে আগস্টের ৪ তারিখ মিরপুরে মারা যায়। দুই বছর পার হলেও অন্তবর্তী সরকার বিচারের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিচারের জন্য রাস্তায় আন্দোলন করেছি কিন্তু দৃশ্যমান কিছুই হয়নি। আমরা তখন আশায় বুক বেঁধে ছিলাম, তারেক রহমান দেশে ফিরবেন, ক্ষমতায় বসবেন আমাদের সন্তান হত্যার বিচার করবেন। আমরা আশা রাখি, তিনি আমাদের চোখের পানির মূল্য দেবেন।’

দুই পা হারানো জুলাই যোদ্ধা শাহীন মালু বলেন, ‘গত ১৭ বছর জিয়া পরিবার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দেশকে ভালো রাখতে হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে থাকুন। শহীদ পরিবার যদি চান তবে তারেক রহমানকে সহায়তা করুন। এই দেশ তার কাছেই নিরাপদ। আজকে বুকটা ভরে যায়; দুইটা পা হারিয়েছি দু:খ নেই, তবে জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার যেনো দেখতে পারি।’

আহত জুলাই যোদ্ধা মিল্লাত হোসেন বলেন, ‘আমি একজন আহত জুলাই যোদ্ধা।  ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের দাবিতে নয়াপল্টন থেকে মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাব যাওয়ার সময় আমি গুলিবিদ্ধ হই। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়, কিন্তু কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা পর্যন্ত পাইনি। প্রথমে আমার পরিবারকে বলা হয় আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছি। এরপর থেকে আমার বাবা অসুস্থ হয়ে শয্যাশয়ী হয়, পরে মারা যান। আমরা শুধু জুলাই যোদ্ধা নই গত ১৭ বছরের যোদ্ধা।  আমি সকল জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।’

আরেক আহত জুলাই যোদ্ধা সুজন মোল্লা বলেন, ‘লন্ডন থেকে তারেক রহমান  একদফার ঘোষনা দিয়েছিলেন। এই  জন্যই আন্দোলন করেছিলাম। এই একদফা বাস্তবায়ন হয়েছে বলেই স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। জুলাই শহীদ পরিবার থেকে শুরু করে দেশের মানুষ নিরাপদে বাস করছে। তবে আমাদের আক্ষেপ থেকেই গেছে। শহীদ যোদ্ধাদের হত্যার বিচার এখনো হয়নি। তবে রাষ্ট্রযন্ত্র আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে, তিনি চাইলেই পারবেন দ্রুত জুলাই হত্যাকান্ডের বিচার করতে। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।’

আহত আলামিন বলেন, ‘আমার একটা হাত নেই, ব্যাথায় মাঝেমধ্যে কাঁপতে থাকে। চিকিৎসা করতে পারিনা। আমার মতো আরও কতশত যোদ্ধা এমন হাত-পা হারিয়েছেন ঠিক নেই। আমি সরকারের কাছে দাবি করবো, আমার মতো হাত-পা হারানো যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।’

জুলাই যোদ্ধা মেহেদী হাসান মিরাজ বলেন, শুধু মাত্র জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থক হওয়ার কারনে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। জুলাই যোদ্ধা হিসেবেও তেমন কোনো সহায়তা পাইনি।

সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। মঞ্চের ব্যানারে লেখা, ‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা; ৪ জুলাইয়ের এই দিন হোক সবার অনুপ্রেরণা; যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’

সকাল সোয়া ১০টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে হাত নেড়ে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে আগত শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে হাত নেড়ে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে আগত শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন। এ সময় শহীদ মিরাজের বাবা আব্দুল রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, আহত জুলাই যোদ্ধা আল মিরাজ এবং জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্মারক গ্রহণ করেন। পরে উপস্থিত অন্য পরিবারগুলোর কাছেও স্মারক পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

পরে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেও একটি স্মৃতি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সরকারের মন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল ও সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত গড়ে ওঠে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন। পরে তা সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।

সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪। তবে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মির্জাগঞ্জে বিএনপির উদ্যোগে বাজেট সম্পর্কিত মতবিনিময়

প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত জুলাই শহীদের স্বজনেরা

Update Time : ০১:০০:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
১০

নিজস্ব প্রতিবেদক : চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সন্তান হারানো মায়ের কান্না, বাবার দীর্ঘশ্বাস, ভাইয়ের আহাজারি আর আহত যোদ্ধাদের বেদনায় আজ ভারী হয়ে ওঠে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র।

জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছর শাসনের পতনের ২ বছর পর এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের না-বলা কষ্ট, দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। অনেকেই বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।

শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুল রব মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জুলাই এলেই চোখের পানির বাঁধ ভাঙে। ৫ আগস্ট আমার ছেলের বুক গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পুলিশ। আমি এক হতভাগা বাবা এই অন্যায়ের বিচার চাই, প্রতিটি জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।’

চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, ‘আমার ছেলে আর ফিরে আসবে না। কিন্তু আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়। এখন সরকারের কাছে দাবি, জুলাই যোদ্ধা যারা হাত পা হারিয়েছে তাদের সহায়তা করুন। তারা যেনো কষ্টে না থাকে।’

আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ভাই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন দিয়েছে। তার অনুপ্রেরণায় আরও অনেকে শহীদ হয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তাদের পাশে সরকারের দাঁড়াতে হবে। আমার ভাই হত্যার দ্রুত বিচার চাই। পাশাপাশি সারা দেশে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণেরও দাবি করছি।’

শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ‘আমার বড় ছেলে জাহিদ মারা যাওয়ার পরে আমার ছোট ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়ে। আমি অসহায় অবস্থায়, ওই সময় এমন কোনো দরজায় নেই যেখানে যাইনি, কিন্তু সহায়তা পাইনি। তবে ‘আমারা বিএনপি পরিবার’-এর প্রত্যেকটি সদস্য আমাদের পাশে ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থেকে আমাদের খোঁজ নিয়েছেন, সহায়তা করেছেন। এখন বিএনপি সরকারের কাছে একটাই দাবি- সকল জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার চাই। আমি যেভাবে বিএনপির কাছে সহায়তা পেয়েছি অন্য জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরাও যেনো সহায়তা পায়। আমার সন্তানকে তো আর ফিরে পাবো না, তবে সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন।’

শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

শহীদ আলভীর বাবা আবুল হাসান বলেন, ‘আমার ছেলে আগস্টের ৪ তারিখ মিরপুরে মারা যায়। দুই বছর পার হলেও অন্তবর্তী সরকার বিচারের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিচারের জন্য রাস্তায় আন্দোলন করেছি কিন্তু দৃশ্যমান কিছুই হয়নি। আমরা তখন আশায় বুক বেঁধে ছিলাম, তারেক রহমান দেশে ফিরবেন, ক্ষমতায় বসবেন আমাদের সন্তান হত্যার বিচার করবেন। আমরা আশা রাখি, তিনি আমাদের চোখের পানির মূল্য দেবেন।’

দুই পা হারানো জুলাই যোদ্ধা শাহীন মালু বলেন, ‘গত ১৭ বছর জিয়া পরিবার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দেশকে ভালো রাখতে হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে থাকুন। শহীদ পরিবার যদি চান তবে তারেক রহমানকে সহায়তা করুন। এই দেশ তার কাছেই নিরাপদ। আজকে বুকটা ভরে যায়; দুইটা পা হারিয়েছি দু:খ নেই, তবে জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার যেনো দেখতে পারি।’

আহত জুলাই যোদ্ধা মিল্লাত হোসেন বলেন, ‘আমি একজন আহত জুলাই যোদ্ধা।  ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের দাবিতে নয়াপল্টন থেকে মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাব যাওয়ার সময় আমি গুলিবিদ্ধ হই। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়, কিন্তু কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা পর্যন্ত পাইনি। প্রথমে আমার পরিবারকে বলা হয় আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছি। এরপর থেকে আমার বাবা অসুস্থ হয়ে শয্যাশয়ী হয়, পরে মারা যান। আমরা শুধু জুলাই যোদ্ধা নই গত ১৭ বছরের যোদ্ধা।  আমি সকল জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।’

আরেক আহত জুলাই যোদ্ধা সুজন মোল্লা বলেন, ‘লন্ডন থেকে তারেক রহমান  একদফার ঘোষনা দিয়েছিলেন। এই  জন্যই আন্দোলন করেছিলাম। এই একদফা বাস্তবায়ন হয়েছে বলেই স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। জুলাই শহীদ পরিবার থেকে শুরু করে দেশের মানুষ নিরাপদে বাস করছে। তবে আমাদের আক্ষেপ থেকেই গেছে। শহীদ যোদ্ধাদের হত্যার বিচার এখনো হয়নি। তবে রাষ্ট্রযন্ত্র আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে, তিনি চাইলেই পারবেন দ্রুত জুলাই হত্যাকান্ডের বিচার করতে। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।’

আহত আলামিন বলেন, ‘আমার একটা হাত নেই, ব্যাথায় মাঝেমধ্যে কাঁপতে থাকে। চিকিৎসা করতে পারিনা। আমার মতো আরও কতশত যোদ্ধা এমন হাত-পা হারিয়েছেন ঠিক নেই। আমি সরকারের কাছে দাবি করবো, আমার মতো হাত-পা হারানো যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।’

জুলাই যোদ্ধা মেহেদী হাসান মিরাজ বলেন, শুধু মাত্র জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থক হওয়ার কারনে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। জুলাই যোদ্ধা হিসেবেও তেমন কোনো সহায়তা পাইনি।

সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। মঞ্চের ব্যানারে লেখা, ‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা; ৪ জুলাইয়ের এই দিন হোক সবার অনুপ্রেরণা; যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’

সকাল সোয়া ১০টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে হাত নেড়ে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে আগত শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

শনিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে হাত নেড়ে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে আগত শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন। এ সময় শহীদ মিরাজের বাবা আব্দুল রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, আহত জুলাই যোদ্ধা আল মিরাজ এবং জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্মারক গ্রহণ করেন। পরে উপস্থিত অন্য পরিবারগুলোর কাছেও স্মারক পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

পরে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেও একটি স্মৃতি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সরকারের মন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল ও সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত গড়ে ওঠে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন। পরে তা সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।

সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪। তবে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।