ঢাকা ০৫:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আর কত দুর্যোগ? এবার টেকসই সমাধান চায় বরগুনাবাসী

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:৪৬:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • ৩৪ Time View
৬৪

নিজস্ব প্রতিবেদক : উপকূলীয় জেলা বরগুনার মানুষের জীবন যেন এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, পানিবদ্ধতা, নিরাপদ পানির সংকট, বেকারত্ব ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় বছরের পর বছর বিপর্যস্ত এই জেলার লাখো মানুষ এখন স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছে সরকারের দিকে।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য, সাময়িক প্রকল্প বা দায়সারা উদ্যোগ নয়- বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবভিত্তিক উন্নয়নই পারে উপকূলের মানুষের ভাগ্য বদলাতে।

 

জেলার বিষখালী, বলেশ্বর, পায়রা ও খাকদোন নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিবছর শত শত পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। বিশেষ করে পাথরঘাটা, তালতলী, আমতলী, বামনা ও বেতাগী উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভাঙন এখন স্থায়ী আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও কার্যকর নদী শাসন বা স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

 

তালতলীর নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, ‘প্রতি বছর নদী একটু একটু করে ঘরবাড়ি গিলে খাচ্ছে। মানুষ সব হারিয়ে পথে বসছে। আমরা আর সাময়িক কাজ চাই না, স্থায়ী বাঁধ চাই।’

 

একই চিত্র পাথরঘাটার উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও। চরদুয়ানি এলাকার যুবক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে সব হারিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। এখানে যদি শিল্পকারখানা বা কাজের সুযোগ থাকত, তাহলে হয়তো মানুষ এত অসহায় থাকত না।’

 

বরগুনার আরেক বড় সংকট কর্মসংস্থানের অভাব। শিল্পকারখানা না থাকা, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শিল্পের সীমিত বিকাশের কারণে প্রতিবছর অসংখ্য তরুণ জীবিকার সন্ধানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। এতে পরিবার বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও স্থবির হয়ে পড়ছে।

 

বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘লেখাপড়া শেষ করেও চাকরি নেই। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঢাকায় চলে যাচ্ছে। আমরা চাই নিজের এলাকাতেই কাজের সুযোগ তৈরি হোক।’

 

স্থানীয়দের মতে, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কৃষিভিত্তিক কারখানা, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বরগুনায় নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার খুলতে পারে।

 

এ বিষয়ে পাথরঘাটা উপজেলা পানি কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন এসমে বলেন, ‘উপকূলীয় মানুষের প্রধান সংকট এখন নদীভাঙন, নিরাপদ পানির অভাব ও বেকারত্ব। প্রতিবছর মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। টেকসই নদী শাসন, স্থায়ী বেড়িবাঁধ, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’

 

সামাজিক সংগঠক ও উন্নয়নকর্মীদের মতে, বরগুনার উন্নয়নে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, খাল পুনঃখনন, আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

সচেতন মহলের অভিমত, বরগুনার সমুদ্র উপকূল, মৎস্যসম্পদ ও কৃষিখাতকে ঘিরে পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি চরাঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণেরও দাবি উঠেছে।

 

দীর্ঘদিনের অবহেলা আর দুর্ভোগে ক্লান্ত বরগুনাবাসীর এখন একটাই প্রত্যাশা- উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় যেন নেওয়া হয় বাস্তবসম্মত, কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মির্জাগঞ্জে ছাত্রদলের পাল্টাপাল্টি কমিটি, ৯ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিস

আর কত দুর্যোগ? এবার টেকসই সমাধান চায় বরগুনাবাসী

Update Time : ০১:৪৬:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
৬৪

নিজস্ব প্রতিবেদক : উপকূলীয় জেলা বরগুনার মানুষের জীবন যেন এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, পানিবদ্ধতা, নিরাপদ পানির সংকট, বেকারত্ব ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় বছরের পর বছর বিপর্যস্ত এই জেলার লাখো মানুষ এখন স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছে সরকারের দিকে।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য, সাময়িক প্রকল্প বা দায়সারা উদ্যোগ নয়- বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবভিত্তিক উন্নয়নই পারে উপকূলের মানুষের ভাগ্য বদলাতে।

 

জেলার বিষখালী, বলেশ্বর, পায়রা ও খাকদোন নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিবছর শত শত পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। বিশেষ করে পাথরঘাটা, তালতলী, আমতলী, বামনা ও বেতাগী উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভাঙন এখন স্থায়ী আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও কার্যকর নদী শাসন বা স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

 

তালতলীর নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, ‘প্রতি বছর নদী একটু একটু করে ঘরবাড়ি গিলে খাচ্ছে। মানুষ সব হারিয়ে পথে বসছে। আমরা আর সাময়িক কাজ চাই না, স্থায়ী বাঁধ চাই।’

 

একই চিত্র পাথরঘাটার উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও। চরদুয়ানি এলাকার যুবক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে সব হারিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। এখানে যদি শিল্পকারখানা বা কাজের সুযোগ থাকত, তাহলে হয়তো মানুষ এত অসহায় থাকত না।’

 

বরগুনার আরেক বড় সংকট কর্মসংস্থানের অভাব। শিল্পকারখানা না থাকা, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শিল্পের সীমিত বিকাশের কারণে প্রতিবছর অসংখ্য তরুণ জীবিকার সন্ধানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। এতে পরিবার বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও স্থবির হয়ে পড়ছে।

 

বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘লেখাপড়া শেষ করেও চাকরি নেই। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঢাকায় চলে যাচ্ছে। আমরা চাই নিজের এলাকাতেই কাজের সুযোগ তৈরি হোক।’

 

স্থানীয়দের মতে, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কৃষিভিত্তিক কারখানা, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বরগুনায় নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার খুলতে পারে।

 

এ বিষয়ে পাথরঘাটা উপজেলা পানি কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন এসমে বলেন, ‘উপকূলীয় মানুষের প্রধান সংকট এখন নদীভাঙন, নিরাপদ পানির অভাব ও বেকারত্ব। প্রতিবছর মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। টেকসই নদী শাসন, স্থায়ী বেড়িবাঁধ, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’

 

সামাজিক সংগঠক ও উন্নয়নকর্মীদের মতে, বরগুনার উন্নয়নে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, খাল পুনঃখনন, আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

সচেতন মহলের অভিমত, বরগুনার সমুদ্র উপকূল, মৎস্যসম্পদ ও কৃষিখাতকে ঘিরে পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি চরাঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণেরও দাবি উঠেছে।

 

দীর্ঘদিনের অবহেলা আর দুর্ভোগে ক্লান্ত বরগুনাবাসীর এখন একটাই প্রত্যাশা- উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় যেন নেওয়া হয় বাস্তবসম্মত, কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ।