ঢাকা ১০:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশালের ৬টি আসনেই বিএনপির সামনে নানামুখী চ্যালেঞ্জ! প্রশাসনও নিরপেক্ষ থাকার আশ্বাস

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৩০:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৮১ Time View
৩৩৯

জিহাদ রানা।। ​ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তাল দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র বরিশাল। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবার বরিশালের ৬টি আসনেই কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বরিশাল সফরের পর নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। বিভক্তি ভুলে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে মরিয়া তৃণমূল। তবে মাঠের সমীকরণ বলছে, শুধু ঐক্য নয়, বিদ্রোহী প্রার্থী, জামায়াত-ইসলামী আন্দোলনের শক্তিশালী অবস্থান এবং আওয়ামী লীগের বিশাল ‘সাইলেন্ট’ ভোট ব্যাংক সামলানোই হবে বিএনপির জন্য বড় পরীক্ষা।

​
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া): ঘরের শত্রু সামলানোই প্রধান কাজ এই আসনে বিএনপির কাণ্ডারি সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দীন স্বপন। তিনি দিনরাত এক করে প্রচারণা চালালেও তাঁর পথে প্রধান কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন নিজ দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান।

​২০০১ পরবর্তী ঘটনার জেরে সংখ্যালঘু ভোটের একটি বড় অংশ স্বপনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সোবাহানের দিকে ঝুঁকছে।
​
ভোটাররা দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ায় ধানের শীষের নিশ্চিত জয় কিছুটা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এখানে আওয়ামী লীগের ভোটাররা কাকে সমর্থন দেয়, সেটিই হবে জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি।
​
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া): জামায়াত ও দলীয় কোন্দলের চাপ বিএনপির প্রার্থী এস সরফুদ্দীন আহম্মেদ সান্টু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকলেও সাংগঠনিকভাবে চাপে আছেন।

বানারীপাড়ার কয়েকশ নেতাকর্মী হঠাৎ জামায়াতে যোগ দিয়ে তাদের প্রার্থী আব্দুল মান্নানের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। এছাড়া কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু ও দুলাল হোসেনের মতো কেন্দ্রীয় নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা সান্টুর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। শেষ পর্যন্ত লড়াই হতে পারে বিএনপি বনাম জামায়াতের মধ্যে।

​

বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী): হেভিওয়েট প্রার্থীর সামনে ত্রিমুখী লড়াই ​বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এই আসনের প্রার্থী। শুরুতে ধীরগতিতে এগোলেও এখন তিনি পূর্ণ শক্তিতে মাঠে।

​জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপুর (লাঙল) কারাবন্দী ইমোশন এবং এবি পার্টির তরুণ তুর্কি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের (ঈগল) জনপ্রিয়তা এখানে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। জামায়াত এখানে এবি পার্টিকে সমর্থন দেওয়ায় বিএনপিকে বাড়তি ঘাম ঝরাতে হবে।
​
সুষ্ঠু ভোট হলে এখানে বিএনপি, জাপা ও এবি পার্টির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল।
​

বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ): বিভাজন বনাম জামায়াত সেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান এখানে বিএনপির প্রতীক।
​

সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দীন ফরহাদের অনুসারীরা রাজিবকে মেনে নিতে না পারায় দলের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায় জামায়াতের আব্দুল জব্বার।
​

দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ প্রশমন করতে না পারলে এখানে ধানের শীষের জন্য লড়াই কঠিন হবে।
​

বরিশাল-৫ (সদর-মহানগর): মর্যাদার লড়াইয়ে হাতপাখার ঝাপটা বরিশালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার।
​

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম (হাতপাখা) এখানে বড় ফ্যাক্টর। জামায়াত এখানে হাতপাখাকে সমর্থন দেওয়ায় সরোয়ারের জন্য পথটা কণ্টকাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এছাড়া মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এখনো পুরোপুরি মেটেনি।

​হাতপাখার বাতাসে কি দুলবে ধানের শীষ? এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ ভোটারদের মুখে। তবে সরোয়ারের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোটের বড় অংশ পেলে জয় সম্ভব।

​বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ): সমীকরণের মারপ্যাঁচ
​এখানে বিএনপির আবুল হোসেন খান লড়ছেন ইসলামী আন্দোলনের ফয়জুল করীম ও জামায়াতের মাহমুদুন্নবীর বিপক্ষে।

​জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী না থাকায় তাদের ভোট ব্যাংকটি কোন দিকে যায়, সেটিই মূল প্রশ্ন। ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত একে অপরের ভোট ভাগাভাগি করলে সুবিধা পেতে পারে বিএনপি।
​
এদিকে ভোটের মাঠে বড় ফ্যাক্ট ​আওয়ামী লীগের ভোট, দল নির্বাচনে না থাকলেও তাদের বিশাল কর্মী-সমর্থক বাহিনী কাকে ভোট দেবে বা ভোটকেন্দ্রে যাবে কি না, তা যেকোনো আসনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে।

​এদিকে বরিশাল ক্যাম্প কমান্ডার মেজর সৈকত নিশ্চিত করেছেন, সেনাবাহিনী কোনো দলের পক্ষে নয়, বরং জনগণের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করবে।

​সবমিলিয়ে বরিশালের ৬টি আসনেই বিএনপির জন্য প্রধান শক্তি তাদের ‘ধানের শীষ’ প্রতীক ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে বিদ্রোহী ও জোটের প্রার্থীদের মোকাবিলা করতে পারলেই দক্ষিণাঞ্চলের এই দুর্গ পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে ইউনিলিভার অফিসের সামনে থেকে অটোগাড়ি চুরির অভিযোগ

বরিশালের ৬টি আসনেই বিএনপির সামনে নানামুখী চ্যালেঞ্জ! প্রশাসনও নিরপেক্ষ থাকার আশ্বাস

Update Time : ০২:৩০:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৩৩৯

জিহাদ রানা।। ​ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তাল দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র বরিশাল। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবার বরিশালের ৬টি আসনেই কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বরিশাল সফরের পর নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। বিভক্তি ভুলে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে মরিয়া তৃণমূল। তবে মাঠের সমীকরণ বলছে, শুধু ঐক্য নয়, বিদ্রোহী প্রার্থী, জামায়াত-ইসলামী আন্দোলনের শক্তিশালী অবস্থান এবং আওয়ামী লীগের বিশাল ‘সাইলেন্ট’ ভোট ব্যাংক সামলানোই হবে বিএনপির জন্য বড় পরীক্ষা।

​
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া): ঘরের শত্রু সামলানোই প্রধান কাজ এই আসনে বিএনপির কাণ্ডারি সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দীন স্বপন। তিনি দিনরাত এক করে প্রচারণা চালালেও তাঁর পথে প্রধান কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন নিজ দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান।

​২০০১ পরবর্তী ঘটনার জেরে সংখ্যালঘু ভোটের একটি বড় অংশ স্বপনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সোবাহানের দিকে ঝুঁকছে।
​
ভোটাররা দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ায় ধানের শীষের নিশ্চিত জয় কিছুটা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এখানে আওয়ামী লীগের ভোটাররা কাকে সমর্থন দেয়, সেটিই হবে জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি।
​
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া): জামায়াত ও দলীয় কোন্দলের চাপ বিএনপির প্রার্থী এস সরফুদ্দীন আহম্মেদ সান্টু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকলেও সাংগঠনিকভাবে চাপে আছেন।

বানারীপাড়ার কয়েকশ নেতাকর্মী হঠাৎ জামায়াতে যোগ দিয়ে তাদের প্রার্থী আব্দুল মান্নানের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। এছাড়া কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু ও দুলাল হোসেনের মতো কেন্দ্রীয় নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা সান্টুর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। শেষ পর্যন্ত লড়াই হতে পারে বিএনপি বনাম জামায়াতের মধ্যে।

​

বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী): হেভিওয়েট প্রার্থীর সামনে ত্রিমুখী লড়াই ​বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এই আসনের প্রার্থী। শুরুতে ধীরগতিতে এগোলেও এখন তিনি পূর্ণ শক্তিতে মাঠে।

​জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপুর (লাঙল) কারাবন্দী ইমোশন এবং এবি পার্টির তরুণ তুর্কি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের (ঈগল) জনপ্রিয়তা এখানে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। জামায়াত এখানে এবি পার্টিকে সমর্থন দেওয়ায় বিএনপিকে বাড়তি ঘাম ঝরাতে হবে।
​
সুষ্ঠু ভোট হলে এখানে বিএনপি, জাপা ও এবি পার্টির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল।
​

বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ): বিভাজন বনাম জামায়াত সেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান এখানে বিএনপির প্রতীক।
​

সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দীন ফরহাদের অনুসারীরা রাজিবকে মেনে নিতে না পারায় দলের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায় জামায়াতের আব্দুল জব্বার।
​

দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ প্রশমন করতে না পারলে এখানে ধানের শীষের জন্য লড়াই কঠিন হবে।
​

বরিশাল-৫ (সদর-মহানগর): মর্যাদার লড়াইয়ে হাতপাখার ঝাপটা বরিশালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার।
​

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম (হাতপাখা) এখানে বড় ফ্যাক্টর। জামায়াত এখানে হাতপাখাকে সমর্থন দেওয়ায় সরোয়ারের জন্য পথটা কণ্টকাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এছাড়া মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এখনো পুরোপুরি মেটেনি।

​হাতপাখার বাতাসে কি দুলবে ধানের শীষ? এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ ভোটারদের মুখে। তবে সরোয়ারের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোটের বড় অংশ পেলে জয় সম্ভব।

​বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ): সমীকরণের মারপ্যাঁচ
​এখানে বিএনপির আবুল হোসেন খান লড়ছেন ইসলামী আন্দোলনের ফয়জুল করীম ও জামায়াতের মাহমুদুন্নবীর বিপক্ষে।

​জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী না থাকায় তাদের ভোট ব্যাংকটি কোন দিকে যায়, সেটিই মূল প্রশ্ন। ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত একে অপরের ভোট ভাগাভাগি করলে সুবিধা পেতে পারে বিএনপি।
​
এদিকে ভোটের মাঠে বড় ফ্যাক্ট ​আওয়ামী লীগের ভোট, দল নির্বাচনে না থাকলেও তাদের বিশাল কর্মী-সমর্থক বাহিনী কাকে ভোট দেবে বা ভোটকেন্দ্রে যাবে কি না, তা যেকোনো আসনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে।

​এদিকে বরিশাল ক্যাম্প কমান্ডার মেজর সৈকত নিশ্চিত করেছেন, সেনাবাহিনী কোনো দলের পক্ষে নয়, বরং জনগণের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করবে।

​সবমিলিয়ে বরিশালের ৬টি আসনেই বিএনপির জন্য প্রধান শক্তি তাদের ‘ধানের শীষ’ প্রতীক ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে বিদ্রোহী ও জোটের প্রার্থীদের মোকাবিলা করতে পারলেই দক্ষিণাঞ্চলের এই দুর্গ পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।