ঢাকা ০৬:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাবার যক্ষ্মা, মায়ের শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা, হারিয়েছে চাকরি – একটি কর্মসংস্থানের আশায় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি আরিয়ান

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:০১:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
  • ৫৫ Time View
১০৩
সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি: জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘর। বর্ষা এলেই চালার ফাঁক গলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। একদিকে দীর্ঘ আট বছর ধরে যক্ষ্মা (টিবি) রোগে আক্রান্ত বাবা, অন্যদিকে শ্রবণ প্রতিবন্ধী মা। সংসারে নেই কোনো নিয়মিত আয়ের উৎস। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে ছোটবেলা থেকেই কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে পুরো সংসারের দায়িত্ব। কিন্তু যে চাকরির আয়ে কোনো রকমে চলছিল পরিবার, সেটিও হারিয়েছেন তিনি। এখন দুবেলা খাবারের সংস্থান করাই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।
এমন বাস্তবতার মধ্যেই দিন কাটছে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চর হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি আরিয়ান আহমেদ সাগরের (২১)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আরিয়ানের বাবা দীর্ঘদিন অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। প্রায় আট বছর আগে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। নিজস্ব কোনো কৃষিজমি না থাকায় পরিবারের আয়ের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে আরিয়ানের মা শ্রবণ প্রতিবন্ধী। পরিবারের একমাত্র ছোট ভাই (১২) বর্তমানে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।
অভাব-অনটনের কারণে আরিয়ান দক্ষিণ চর হোগলপাতিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেই শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিতে বাধ্য হন। অল্প বয়সেই তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।
সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে একসময় ঢাকায় যান আরিয়ান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে অসুস্থ বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের ভরণপোষণ চালিয়ে আসছিলেন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সেই চাকরিটিও হারিয়ে ফেলেন। এরপর আর কোনো কর্মসংস্থান না পেয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ বেকার।
কণ্ঠে অসহায়ত্বের সুর নিয়ে আরিয়ান বলেন, অনেক কষ্টে দিন কাটছে। বাবার চিকিৎসা, সংসারের খরচ; সবই আমার ওপর ছিল। চাকরিটাও চলে যাওয়ার পর কীভাবে পরিবার চালাব, বুঝতে পারছি না। যদি একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো, তাহলে অন্তত পরিবারটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম।
তিনি আরও বলেন, জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাস করে ছাত্রদলের রাজনীতি করেছি। আজ অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে। আমার অসুস্থ বাবা-মাকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য একটি চাকরি চাই। আমি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ দলের নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দের মানবিক দৃষ্টি কামনা করছি।
আরিয়ানের দাবি, পরিবারের জন্য একটি কর্মসংস্থানের আশায় বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতার কাছেও তিনি সহযোগিতা চেয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা পাননি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল মালেক শিকদার বলেন, আরিয়ানের পারিবারিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। দলের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা চাই, তার জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হোক, যাতে সে পরিবারের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. আতিকুর রহমান আল আমিন বলেন, আরিয়ানের বিষয়টি আমি খোঁজখবর নিয়েছি। তার পরিবারের অবস্থা অত্যন্ত মানবিক। আমরা চেষ্টা করছি, তার জন্য একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে। আশা করছি, খুব শিগগিরই ইতিবাচক ফল আসবে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, আরিয়ানের বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলে সরকারি বিধি অনুযায়ী কী ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া সমাজসেবা ও অন্যান্য সরকারি সহায়তার সুযোগ থাকলে সেগুলোও বিবেচনা করা হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আরিয়ান কোনো বিলাসী জীবনের স্বপ্ন দেখেন না। তার একমাত্র চাওয়া ; অসুস্থ বাবা-মায়ের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়া, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া, জরাজীর্ণ বসতঘরটি মেরামত করা এবং একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ।
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পেলে হয়তো নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে পরিবারটি। একটি চাকরি কিংবা নিয়মিত আয়ের সুযোগই হতে পারে আরিয়ান আহমেদ সাগর ও তার পরিবারের জীবনে নতুন আশার আলো।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে ইউনিলিভার অফিসের সামনে থেকে অটোগাড়ি চুরির অভিযোগ

বাবার যক্ষ্মা, মায়ের শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা, হারিয়েছে চাকরি – একটি কর্মসংস্থানের আশায় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি আরিয়ান

Update Time : ০১:০১:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
১০৩
সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি: জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘর। বর্ষা এলেই চালার ফাঁক গলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। একদিকে দীর্ঘ আট বছর ধরে যক্ষ্মা (টিবি) রোগে আক্রান্ত বাবা, অন্যদিকে শ্রবণ প্রতিবন্ধী মা। সংসারে নেই কোনো নিয়মিত আয়ের উৎস। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে ছোটবেলা থেকেই কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে পুরো সংসারের দায়িত্ব। কিন্তু যে চাকরির আয়ে কোনো রকমে চলছিল পরিবার, সেটিও হারিয়েছেন তিনি। এখন দুবেলা খাবারের সংস্থান করাই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।
এমন বাস্তবতার মধ্যেই দিন কাটছে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চর হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি আরিয়ান আহমেদ সাগরের (২১)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আরিয়ানের বাবা দীর্ঘদিন অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। প্রায় আট বছর আগে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। নিজস্ব কোনো কৃষিজমি না থাকায় পরিবারের আয়ের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে আরিয়ানের মা শ্রবণ প্রতিবন্ধী। পরিবারের একমাত্র ছোট ভাই (১২) বর্তমানে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।
অভাব-অনটনের কারণে আরিয়ান দক্ষিণ চর হোগলপাতিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেই শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিতে বাধ্য হন। অল্প বয়সেই তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।
সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে একসময় ঢাকায় যান আরিয়ান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে অসুস্থ বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের ভরণপোষণ চালিয়ে আসছিলেন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সেই চাকরিটিও হারিয়ে ফেলেন। এরপর আর কোনো কর্মসংস্থান না পেয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ বেকার।
কণ্ঠে অসহায়ত্বের সুর নিয়ে আরিয়ান বলেন, অনেক কষ্টে দিন কাটছে। বাবার চিকিৎসা, সংসারের খরচ; সবই আমার ওপর ছিল। চাকরিটাও চলে যাওয়ার পর কীভাবে পরিবার চালাব, বুঝতে পারছি না। যদি একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো, তাহলে অন্তত পরিবারটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম।
তিনি আরও বলেন, জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাস করে ছাত্রদলের রাজনীতি করেছি। আজ অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে। আমার অসুস্থ বাবা-মাকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য একটি চাকরি চাই। আমি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ দলের নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দের মানবিক দৃষ্টি কামনা করছি।
আরিয়ানের দাবি, পরিবারের জন্য একটি কর্মসংস্থানের আশায় বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতার কাছেও তিনি সহযোগিতা চেয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা পাননি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল মালেক শিকদার বলেন, আরিয়ানের পারিবারিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। দলের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা চাই, তার জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হোক, যাতে সে পরিবারের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. আতিকুর রহমান আল আমিন বলেন, আরিয়ানের বিষয়টি আমি খোঁজখবর নিয়েছি। তার পরিবারের অবস্থা অত্যন্ত মানবিক। আমরা চেষ্টা করছি, তার জন্য একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে। আশা করছি, খুব শিগগিরই ইতিবাচক ফল আসবে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, আরিয়ানের বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলে সরকারি বিধি অনুযায়ী কী ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া সমাজসেবা ও অন্যান্য সরকারি সহায়তার সুযোগ থাকলে সেগুলোও বিবেচনা করা হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আরিয়ান কোনো বিলাসী জীবনের স্বপ্ন দেখেন না। তার একমাত্র চাওয়া ; অসুস্থ বাবা-মায়ের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়া, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া, জরাজীর্ণ বসতঘরটি মেরামত করা এবং একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ।
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পেলে হয়তো নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে পরিবারটি। একটি চাকরি কিংবা নিয়মিত আয়ের সুযোগই হতে পারে আরিয়ান আহমেদ সাগর ও তার পরিবারের জীবনে নতুন আশার আলো।