ঢাকা ০২:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেছারাবাদে সমবায়ের নামে প্রতারণা : টাকা চাইলে মিলছে শুধু হুমকি!

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:০৮:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • ১১২ Time View
২৩০

নিজস্ব প্রতিবেদক : নেছারাবাদ উপজেলার পূর্ব জলাবাড়ী গ্রামের অঞ্জলি রানী। বয়স চল্লিশের কোঠায়। স্বামীহারা এই নারী দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় জমিয়েছিলেন দেড় লাখ টাকা। লক্ষ্য ছিল, মেয়েদের বিয়ে। কিন্তু দ্বিগুণ লাভের লোভ দেখিয়ে আটঘর কুড়িয়ানা এলাকার আতা গ্রামের উত্তম মিস্ত্রীর পরিচালিত “আতা বহুমুখী সমবায় সমিতি”-তে টাকা জমা রেখে আজ তিনি চরম বিপদে। লাভ তো দূরের কথা, নিজের আসল টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না। বারবার চাইলে শুধু সময় দেওয়া হচ্ছে, আর অপমানজনক কথাও শুনতে হচ্ছে তাকে।

 

একই অবস্থা রিপন হালদারের (৪২)। ছোট ব্যবসায়ী রিপন একটি ভালো ঘর নির্মাণ ও ব্যবসা বাড়ানোর স্বপ্নে ওই সমিতিতে সাত লাখ টাকা জমা দেন। এখন সেই টাকা ফেরত না পেয়ে তিনি দিশেহারা। টাকা চাইতে গেলে তাকে দেওয়া হচ্ছে হুমকি ও নানা অজুহাত।

 

শুধু অঞ্জলি বা রিপন নন; নিমাই, সুখরঞ্জন, সুরুজ আলীসহ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন। তারা জমানো টাকা চাইতে গেলে টাকার পরিবর্তে তাদের দেয়া হচ্ছে বাধাহীন সময় আর সময়। গত তিন বছর ধরে বিভিন্ন মেয়াদে (দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক) আমানত সংগ্রহ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, “সময় লাগবে” এই আশ্বাস দিয়েই ঘুরানো হচ্ছে সবাইকে।

 

অভিযোগ রয়েছে, উত্তম মিস্ত্রী সমবায় সমিতির লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যাংকিং কার্যক্রমের মতো করে মোটা অংকের আমানত সংগ্রহ করেছেন। গ্রামের দরিদ্র ও বেকার মানুষদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এবং দ্বিগুণ লাভের লোভ দেখিয়ে অন্তত শত কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত লোকদের মাধ্যমে। সংগ্রকত সেই টাকায় দেশের উপজেলার মাদ্রা, আতা, বরিশাল এমনকি ভারতের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে জমি-বাড়ি গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তিনটি লাইটার জাহাজ কেনার কথাও বলছেন স্থানীয়রা।

 

বর্তমানে অভিযোগ রয়েছে, তিনি গা-ঢাকা দিয়ে আছেন এবং ভুক্তভোগীদের চাপ বাড়ায় সম্পদ গোপনে বিক্রি করছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় তিনি সব সম্পদ বিক্রি করে পালিয়ে যেতে পারেন।

 

উত্তমের সমিতিতে চাকরি করা মানিক লাল রায় অভিযোগ করেন, তিনি তার সমিতিতে দীর্ঘ আট বছর চাকরি করতেন। তার দায়িত্ব ছিল কেবল বড় বড় আমানতকারি সংগ্রহ করা। তিনি সে অনুযায়ি তার নিজ গ্রাম পূর্ব জলাবাড়ীসহ ভিবিন্ন এলাকা থেকে একাই তিন হাজার সদস্য সংগ্রহ করেন। তাদের কাছে আমনত জমা নিয়ে উত্তমকে দিয়েছেন। এখন উত্তম গত তিন বছর ধরে কাউকেই আমানত ফেরৎ দিচ্ছেনা। লোকজন টাকা না পেয়ে সবাই আমার কাছে আসছে। আমি এখন দিশেহারা। পাওনাদারদের চাপে ঠিকমত বাড়ীঘরেও থাকতে পারছিনা।

 

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য উত্তমকে না পেয়ে তার নম্বরে ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরছেন না। জানাগেছে তিনি একাধিক সময়বায় সমিতি খুলে প্রায় বার হাজার গ্রাহকদের নিকট মেয়াদি এবং সঞ্চায়ি আকারে শত কোটি টাকারও বেশি আমানত নিয়েছেন। যে গ্রাহকদের এক তৃতীয়াংশদের আমানত ফেরৎ দেয়া হয়নি। এমনকি যাদের আমানত ফেরৎ দেয়া হয়েছে তারাও মুল টাকার সব পায়নি।

 

নেছারাবাদ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মোঃ রিয়াদ খান বলেন, উত্তমের সমিতে লেনদপন ঝুকি সংক্রান্তসহ নানা অভিযোগে আমাদের জেলা থেকে সমবায়ের নামে একটি লাইসেন্স ছিল। সেটি বাদ দেয়া হয়েছে। অন্যকোন সমিতি থাকলে তা আমাদের জেলার লাইসেন্সে নয়। তাহলে সমবায় সমিতি লাইসেন্স এনে উপজেলায় বসে অবৈধভাবে আমানত সংগ্রহ করে ফেরৎ না দেয়ার বিষয়ে আপনাদের কিছু করনীয় আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন এখানে কিছু করার নেই।

 

ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের একটাই দাবি—কষ্টের উপার্জিত টাকা যেন দ্রুত ফেরত পাওয়া যায় এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে ইউনিলিভার অফিসের সামনে থেকে অটোগাড়ি চুরির অভিযোগ

নেছারাবাদে সমবায়ের নামে প্রতারণা : টাকা চাইলে মিলছে শুধু হুমকি!

Update Time : ০২:০৮:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
২৩০

নিজস্ব প্রতিবেদক : নেছারাবাদ উপজেলার পূর্ব জলাবাড়ী গ্রামের অঞ্জলি রানী। বয়স চল্লিশের কোঠায়। স্বামীহারা এই নারী দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় জমিয়েছিলেন দেড় লাখ টাকা। লক্ষ্য ছিল, মেয়েদের বিয়ে। কিন্তু দ্বিগুণ লাভের লোভ দেখিয়ে আটঘর কুড়িয়ানা এলাকার আতা গ্রামের উত্তম মিস্ত্রীর পরিচালিত “আতা বহুমুখী সমবায় সমিতি”-তে টাকা জমা রেখে আজ তিনি চরম বিপদে। লাভ তো দূরের কথা, নিজের আসল টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না। বারবার চাইলে শুধু সময় দেওয়া হচ্ছে, আর অপমানজনক কথাও শুনতে হচ্ছে তাকে।

 

একই অবস্থা রিপন হালদারের (৪২)। ছোট ব্যবসায়ী রিপন একটি ভালো ঘর নির্মাণ ও ব্যবসা বাড়ানোর স্বপ্নে ওই সমিতিতে সাত লাখ টাকা জমা দেন। এখন সেই টাকা ফেরত না পেয়ে তিনি দিশেহারা। টাকা চাইতে গেলে তাকে দেওয়া হচ্ছে হুমকি ও নানা অজুহাত।

 

শুধু অঞ্জলি বা রিপন নন; নিমাই, সুখরঞ্জন, সুরুজ আলীসহ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন। তারা জমানো টাকা চাইতে গেলে টাকার পরিবর্তে তাদের দেয়া হচ্ছে বাধাহীন সময় আর সময়। গত তিন বছর ধরে বিভিন্ন মেয়াদে (দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক) আমানত সংগ্রহ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, “সময় লাগবে” এই আশ্বাস দিয়েই ঘুরানো হচ্ছে সবাইকে।

 

অভিযোগ রয়েছে, উত্তম মিস্ত্রী সমবায় সমিতির লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যাংকিং কার্যক্রমের মতো করে মোটা অংকের আমানত সংগ্রহ করেছেন। গ্রামের দরিদ্র ও বেকার মানুষদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এবং দ্বিগুণ লাভের লোভ দেখিয়ে অন্তত শত কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত লোকদের মাধ্যমে। সংগ্রকত সেই টাকায় দেশের উপজেলার মাদ্রা, আতা, বরিশাল এমনকি ভারতের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে জমি-বাড়ি গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তিনটি লাইটার জাহাজ কেনার কথাও বলছেন স্থানীয়রা।

 

বর্তমানে অভিযোগ রয়েছে, তিনি গা-ঢাকা দিয়ে আছেন এবং ভুক্তভোগীদের চাপ বাড়ায় সম্পদ গোপনে বিক্রি করছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় তিনি সব সম্পদ বিক্রি করে পালিয়ে যেতে পারেন।

 

উত্তমের সমিতিতে চাকরি করা মানিক লাল রায় অভিযোগ করেন, তিনি তার সমিতিতে দীর্ঘ আট বছর চাকরি করতেন। তার দায়িত্ব ছিল কেবল বড় বড় আমানতকারি সংগ্রহ করা। তিনি সে অনুযায়ি তার নিজ গ্রাম পূর্ব জলাবাড়ীসহ ভিবিন্ন এলাকা থেকে একাই তিন হাজার সদস্য সংগ্রহ করেন। তাদের কাছে আমনত জমা নিয়ে উত্তমকে দিয়েছেন। এখন উত্তম গত তিন বছর ধরে কাউকেই আমানত ফেরৎ দিচ্ছেনা। লোকজন টাকা না পেয়ে সবাই আমার কাছে আসছে। আমি এখন দিশেহারা। পাওনাদারদের চাপে ঠিকমত বাড়ীঘরেও থাকতে পারছিনা।

 

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য উত্তমকে না পেয়ে তার নম্বরে ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরছেন না। জানাগেছে তিনি একাধিক সময়বায় সমিতি খুলে প্রায় বার হাজার গ্রাহকদের নিকট মেয়াদি এবং সঞ্চায়ি আকারে শত কোটি টাকারও বেশি আমানত নিয়েছেন। যে গ্রাহকদের এক তৃতীয়াংশদের আমানত ফেরৎ দেয়া হয়নি। এমনকি যাদের আমানত ফেরৎ দেয়া হয়েছে তারাও মুল টাকার সব পায়নি।

 

নেছারাবাদ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মোঃ রিয়াদ খান বলেন, উত্তমের সমিতে লেনদপন ঝুকি সংক্রান্তসহ নানা অভিযোগে আমাদের জেলা থেকে সমবায়ের নামে একটি লাইসেন্স ছিল। সেটি বাদ দেয়া হয়েছে। অন্যকোন সমিতি থাকলে তা আমাদের জেলার লাইসেন্সে নয়। তাহলে সমবায় সমিতি লাইসেন্স এনে উপজেলায় বসে অবৈধভাবে আমানত সংগ্রহ করে ফেরৎ না দেয়ার বিষয়ে আপনাদের কিছু করনীয় আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন এখানে কিছু করার নেই।

 

ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের একটাই দাবি—কষ্টের উপার্জিত টাকা যেন দ্রুত ফেরত পাওয়া যায় এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হয়।