ঢাকা ০১:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কীর্তনখোলার বাঁধ ঘেঁষে পাকা ভবন নির্মাণ! এলাকায় তুলকালাম

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৩৬:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
  • ৫২ Time View
১০১

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা নদীর ত্রিশ গোডাউন এলাকায় নদীর ফোরশোর ও শহর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে বহুতল ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় ঠিকাদার মো. মতিয়ার রহমান ওরফে ‘ট্রাঙ্ক মতি’র বিরুদ্ধে সেখানে বিম, কলাম ও ছাদ ঢালাইয়ের মাধ্যমে পাকা ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। একই এলাকায় আরও অর্ধশতাধিক ব্যক্তি স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

নদীর তীরবর্তী সংরক্ষিত এলাকায় এ ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের বৈধতা নিয়ে ইতোমধ্যে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন, আইন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কীর্তনখোলা নদীর ফোরশোর এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কার্যক্রম নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশের ভারসাম্য এবং শহর রক্ষা বাঁধের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)’র প্রতিনিধি লিংকন বায়েন বলেন, জোয়ারের পানির সর্বোচ্চ সীমা থেকে ২০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। নদীর ফোরশোর এলাকায় এ ধরনের নির্মাণ পরিবেশ আইন ও পানি আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর প্রতিনিধি মো. রফিকুল আলম বলেন, নদী ও পরিবেশ রক্ষায় এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করলে ভবিষ্যতে কীর্তনখোলা নদী আরও সংকটে পড়বে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮০-এর দশকে জেলা প্রশাসকের কার্ডের মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া জমি পরবর্তীতে একাধিকবার ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বর্তমানে মো. মতিয়ার রহমানের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। পরে তিনি ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণকাজ শুরু করেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর নদীবন্দর নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জমির মালিকানা রেকর্ড অনুযায়ী থাকতে পারে। তবে নদী সংক্রান্ত জরিপ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জরিপ শেষে প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম বলেন, রেকর্ডীয় মালিকানা থাকলেই ভবন নির্মাণ বৈধ হয়ে যায় না। নির্মাণের অনুমোদন ও বৈধতার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের আওতাধীন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. ফরিদা সুলতানা জানান, বিষয়টি যাচাই-বাছাই ছাড়া মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

এদিকে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সোহেল মাহমুদ বলেন, সরেজমিন পরিদর্শনের পর বিষয়টি পরিবেশ আইনের আওতায় পড়ে কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, এলাকাটি একসময় কীর্তনখোলা নদীর শহর রক্ষা বাঁধের অংশ ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানের রেকর্ড পরিবর্তন হয়েছে। পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ঘটনাস্থলে গিয়ে ঠিকাদার মো. মতিয়ার রহমানকে পাওয়া না গেলেও তার ছেলে অন্তর দাবি করেন, “সব ধরনের নির্মাণকাজ বৈধভাবেই করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়া হয়েছে।”

পরিবেশবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, পানি আইন ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী নদীর ফোরশোর এলাকায় অনুমতি ছাড়া স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই কীর্তনখোলা নদীর তীরে চলমান নির্মাণকাজের বৈধতা দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

নগরবাসীর আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে নদীর তীর দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা আরও বাড়বে। এতে একদিকে যেমন কীর্তনখোলা নদীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে, অন্যদিকে শহর রক্ষা বাঁধও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে ইউনিলিভার অফিসের সামনে থেকে অটোগাড়ি চুরির অভিযোগ

কীর্তনখোলার বাঁধ ঘেঁষে পাকা ভবন নির্মাণ! এলাকায় তুলকালাম

Update Time : ০২:৩৬:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
১০১

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা নদীর ত্রিশ গোডাউন এলাকায় নদীর ফোরশোর ও শহর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে বহুতল ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় ঠিকাদার মো. মতিয়ার রহমান ওরফে ‘ট্রাঙ্ক মতি’র বিরুদ্ধে সেখানে বিম, কলাম ও ছাদ ঢালাইয়ের মাধ্যমে পাকা ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। একই এলাকায় আরও অর্ধশতাধিক ব্যক্তি স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

নদীর তীরবর্তী সংরক্ষিত এলাকায় এ ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের বৈধতা নিয়ে ইতোমধ্যে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন, আইন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কীর্তনখোলা নদীর ফোরশোর এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কার্যক্রম নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশের ভারসাম্য এবং শহর রক্ষা বাঁধের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)’র প্রতিনিধি লিংকন বায়েন বলেন, জোয়ারের পানির সর্বোচ্চ সীমা থেকে ২০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। নদীর ফোরশোর এলাকায় এ ধরনের নির্মাণ পরিবেশ আইন ও পানি আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর প্রতিনিধি মো. রফিকুল আলম বলেন, নদী ও পরিবেশ রক্ষায় এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করলে ভবিষ্যতে কীর্তনখোলা নদী আরও সংকটে পড়বে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮০-এর দশকে জেলা প্রশাসকের কার্ডের মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া জমি পরবর্তীতে একাধিকবার ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বর্তমানে মো. মতিয়ার রহমানের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। পরে তিনি ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণকাজ শুরু করেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর নদীবন্দর নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জমির মালিকানা রেকর্ড অনুযায়ী থাকতে পারে। তবে নদী সংক্রান্ত জরিপ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জরিপ শেষে প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম বলেন, রেকর্ডীয় মালিকানা থাকলেই ভবন নির্মাণ বৈধ হয়ে যায় না। নির্মাণের অনুমোদন ও বৈধতার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের আওতাধীন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. ফরিদা সুলতানা জানান, বিষয়টি যাচাই-বাছাই ছাড়া মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

এদিকে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সোহেল মাহমুদ বলেন, সরেজমিন পরিদর্শনের পর বিষয়টি পরিবেশ আইনের আওতায় পড়ে কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, এলাকাটি একসময় কীর্তনখোলা নদীর শহর রক্ষা বাঁধের অংশ ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানের রেকর্ড পরিবর্তন হয়েছে। পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ঘটনাস্থলে গিয়ে ঠিকাদার মো. মতিয়ার রহমানকে পাওয়া না গেলেও তার ছেলে অন্তর দাবি করেন, “সব ধরনের নির্মাণকাজ বৈধভাবেই করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়া হয়েছে।”

পরিবেশবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, পানি আইন ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী নদীর ফোরশোর এলাকায় অনুমতি ছাড়া স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই কীর্তনখোলা নদীর তীরে চলমান নির্মাণকাজের বৈধতা দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

নগরবাসীর আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে নদীর তীর দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা আরও বাড়বে। এতে একদিকে যেমন কীর্তনখোলা নদীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে, অন্যদিকে শহর রক্ষা বাঁধও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।