ঢাকা ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্গম চর থেকে সংসদে নুর

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:২৭:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১১৩ Time View
২৯৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার মানচিত্রে চরবিশ্বাস নামের ইউনিয়ন খুব সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। নদীর বুকে ভেসে থাকা এই জনপদ বছরের পর বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে। চরবিশ্বাস থেকে উপজেলা সদরে যোগাযোগের একমাত্র নৌপথ। এই দুর্গম চরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নুরুল হক নুরের।

 

শৈশবে স্কুলে যাওয়াটাই ছিল তার জন্য বড় পরীক্ষা। অজপাড়া গাঁয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়াশোনা। তবু মা-বাবার একটাই কথা ‘পড়াশোনা ছাড়বি না’। সেই কথাই হয়ে ওঠে তার জীবনের দিশা।

 

অজপাড়া গাঁয়ের এই ছেলেটি একসময় পৌঁছান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশাল ক্যাম্পাসে প্রথম পা রাখার দিন মনে হয়েছিল, তিনি যেন আরেক পৃথিবীতে এসে পড়েছেন। এখানেই তিনি যুক্ত হন কোটা সংস্কার আন্দোলনে। সহপাঠীদের অধিকারের প্রশ্নে রাস্তায় নামা এই তরুণ অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন আন্দোলনের মুখ।

হাজারো কণ্ঠের ভেতর তার কণ্ঠ আলাদা হয়ে ওঠে দৃঢ়তা আর সততায়।

 

নুরের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায়। তার বাবা ইদ্রিস হাওলাদার ও মা মরহুম নিলুফা বেগম। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে নুর দ্বিতীয়। তার বাবা কৃষক ইদ্রিস হাওলাদার একসময় চরবিশ্বাস ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন।

রাজনীতির শুরু যেভাবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নুরুল হক নুর ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে রাজপথের আন্দোলনে নামেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী নুর একসময় মুহসীন হলে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছিলেন। পরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে ছাত্রলীগ থেকে ছিটকে পড়েন। এরপর থেকেই একজন দক্ষ রাজনীতিক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়া শুরু করেন।

 

ডাকসুর ভিপি নির্বাচন

২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক পথচলা শুরু নুরের। সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ‘সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’ প্যানেলের প্রার্থী হয়ে। এরপর রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের আসন আরো পাকাপোক্ত করেন। গঠিত হয় তার দল গণ অধিকার পরিষদ।

 

নুরের ওপর যত হামলা

নুরুল হক নুরের ওপর হামলার শুরুটা সেই কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকেই। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দফায় দফায় হামলা, মামলা, নির্যাতন যেন পিছু ছাড়ছে না তার। গত কয়েকবছর বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিগত সাত বছরের শাসনামলে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ বার হামলার শিকার হন নুর। এসব হামলার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তাকেই বেশ কয়েকবার মামলা আর ধরপাকড়ের শিকার হতে হয়েছে।

 

 

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০১৮ সালের ৩০ জুন নুরের ওপর প্রথম হামলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে নুরসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। এরপর হামলার শিকার হন ২০১৯ সালের ১১ মার্চ, ডাকসু নির্বাচনের দিন। নির্বাচনে ভোট কারচুপির প্রতিবাদ করতে গিয়ে রোকেয়া হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হন নুর। হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। সেখানে বসেই ভিপি পদে জয়ের সংবাদ পান তিনি।

 

 

ভিপি হয়ে ক্যাম্পাসে গিয়েও হামলার মুখে পড়েন নুর। পরদিন ১২ মার্চ ক্যাম্পাসে ঢোকার পর নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তার ওপর হামলা চালায়। এ ছাড়াও ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল এক ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে এসএম হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন নুর। সেখানেও তাকে কিলঘুষি মারা হয়।

 

সংসদ সদস্য প্রার্থী ও নির্বাচন

নুরুল হক নুর বলেন, আমি চর থেকেই এসেছি, চরেই ফিরতে চাই।’ সংসদ ভবনের ব্যস্ততা শেষে গ্রামের মাটিতে পা রাখলে তার চোখে ভেসে ওঠে নিজের শৈশব। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অন্যতম শরীক দল ছিল গণঅধিকার পরিষদ। এ দলটির নেতৃত্বে সভাপতি ছিলেন নুরুল হক নুর।

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের আসন সমঝোতা হয়। এর মধ্যে নুরুল হক নুরকে পটুয়াখালী-৩ আসন ছেড়ে দেওয়া হয়। এ আসনে নুরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নির্বাহী সদস্য আরেক ছাত্র নেতা হাসান মামুন। তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।

 

গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতার মধ্য দিয়ে বিজয়ের হাসি হাসেন নুরুল হক নুর। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বির চেয়ে ১৬ হাজার ৮২৪ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রাপ্ত ভোট ৯৬ হাজার ৪৪৩ এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুন ৭৯ হাজার ৬১৯ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।

 

নুরের এ বিজয়ের পথটা পথটা সহজ ছিল না। মামলা, হুমকি, অবিশ্বাস সবকিছুর মুখোমুখি হয়েছেন। তবু পিছু হটেননি। প্রতিটি আঘাতকে শক্তিতে রূপান্তর করে এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে। অবশেষে দীর্ঘ সংগ্রামের পর তিনি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য হিসেবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বরিশালে ইউনিলিভার অফিসের সামনে থেকে অটোগাড়ি চুরির অভিযোগ

দুর্গম চর থেকে সংসদে নুর

Update Time : ০৮:২৭:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
২৯৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার মানচিত্রে চরবিশ্বাস নামের ইউনিয়ন খুব সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। নদীর বুকে ভেসে থাকা এই জনপদ বছরের পর বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে। চরবিশ্বাস থেকে উপজেলা সদরে যোগাযোগের একমাত্র নৌপথ। এই দুর্গম চরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নুরুল হক নুরের।

 

শৈশবে স্কুলে যাওয়াটাই ছিল তার জন্য বড় পরীক্ষা। অজপাড়া গাঁয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়াশোনা। তবু মা-বাবার একটাই কথা ‘পড়াশোনা ছাড়বি না’। সেই কথাই হয়ে ওঠে তার জীবনের দিশা।

 

অজপাড়া গাঁয়ের এই ছেলেটি একসময় পৌঁছান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশাল ক্যাম্পাসে প্রথম পা রাখার দিন মনে হয়েছিল, তিনি যেন আরেক পৃথিবীতে এসে পড়েছেন। এখানেই তিনি যুক্ত হন কোটা সংস্কার আন্দোলনে। সহপাঠীদের অধিকারের প্রশ্নে রাস্তায় নামা এই তরুণ অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন আন্দোলনের মুখ।

হাজারো কণ্ঠের ভেতর তার কণ্ঠ আলাদা হয়ে ওঠে দৃঢ়তা আর সততায়।

 

নুরের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায়। তার বাবা ইদ্রিস হাওলাদার ও মা মরহুম নিলুফা বেগম। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে নুর দ্বিতীয়। তার বাবা কৃষক ইদ্রিস হাওলাদার একসময় চরবিশ্বাস ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন।

রাজনীতির শুরু যেভাবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নুরুল হক নুর ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে রাজপথের আন্দোলনে নামেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী নুর একসময় মুহসীন হলে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছিলেন। পরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে ছাত্রলীগ থেকে ছিটকে পড়েন। এরপর থেকেই একজন দক্ষ রাজনীতিক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়া শুরু করেন।

 

ডাকসুর ভিপি নির্বাচন

২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক পথচলা শুরু নুরের। সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ‘সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’ প্যানেলের প্রার্থী হয়ে। এরপর রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের আসন আরো পাকাপোক্ত করেন। গঠিত হয় তার দল গণ অধিকার পরিষদ।

 

নুরের ওপর যত হামলা

নুরুল হক নুরের ওপর হামলার শুরুটা সেই কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকেই। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দফায় দফায় হামলা, মামলা, নির্যাতন যেন পিছু ছাড়ছে না তার। গত কয়েকবছর বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিগত সাত বছরের শাসনামলে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ বার হামলার শিকার হন নুর। এসব হামলার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তাকেই বেশ কয়েকবার মামলা আর ধরপাকড়ের শিকার হতে হয়েছে।

 

 

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০১৮ সালের ৩০ জুন নুরের ওপর প্রথম হামলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে নুরসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। এরপর হামলার শিকার হন ২০১৯ সালের ১১ মার্চ, ডাকসু নির্বাচনের দিন। নির্বাচনে ভোট কারচুপির প্রতিবাদ করতে গিয়ে রোকেয়া হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হন নুর। হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। সেখানে বসেই ভিপি পদে জয়ের সংবাদ পান তিনি।

 

 

ভিপি হয়ে ক্যাম্পাসে গিয়েও হামলার মুখে পড়েন নুর। পরদিন ১২ মার্চ ক্যাম্পাসে ঢোকার পর নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তার ওপর হামলা চালায়। এ ছাড়াও ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল এক ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে এসএম হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন নুর। সেখানেও তাকে কিলঘুষি মারা হয়।

 

সংসদ সদস্য প্রার্থী ও নির্বাচন

নুরুল হক নুর বলেন, আমি চর থেকেই এসেছি, চরেই ফিরতে চাই।’ সংসদ ভবনের ব্যস্ততা শেষে গ্রামের মাটিতে পা রাখলে তার চোখে ভেসে ওঠে নিজের শৈশব। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অন্যতম শরীক দল ছিল গণঅধিকার পরিষদ। এ দলটির নেতৃত্বে সভাপতি ছিলেন নুরুল হক নুর।

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের আসন সমঝোতা হয়। এর মধ্যে নুরুল হক নুরকে পটুয়াখালী-৩ আসন ছেড়ে দেওয়া হয়। এ আসনে নুরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নির্বাহী সদস্য আরেক ছাত্র নেতা হাসান মামুন। তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।

 

গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতার মধ্য দিয়ে বিজয়ের হাসি হাসেন নুরুল হক নুর। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বির চেয়ে ১৬ হাজার ৮২৪ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রাপ্ত ভোট ৯৬ হাজার ৪৪৩ এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুন ৭৯ হাজার ৬১৯ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।

 

নুরের এ বিজয়ের পথটা পথটা সহজ ছিল না। মামলা, হুমকি, অবিশ্বাস সবকিছুর মুখোমুখি হয়েছেন। তবু পিছু হটেননি। প্রতিটি আঘাতকে শক্তিতে রূপান্তর করে এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে। অবশেষে দীর্ঘ সংগ্রামের পর তিনি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য হিসেবে।