ঢাকা ০৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তালতলীতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৪৩:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
  • ১৭ Time View
২৭

নিজস্ব প্রতিবেদক : মোগো প্রেত্যেকের শইল্লে চুলকানি। খাউজাইতে খাউজাইতে ক্ষ্যাত হইয়া যাইতেছে। জ্বালাপোড়ায় আর বাঁচতে পারতেছি না। এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটা হওয়ার পর থেইক্কা এই সমস্যা। চুলকানিতে আমাগো মাইয়াগো চেহারা নষ্ট হইয়া যায়। একারণে এহন এই গ্রামের মাইয়াগোরে কেউ বিয়াও করতে চায় না। শুধু খাউজানি চুলকানি না- ক’দিন পর পর আমাগো ডায়রিয়া অয়। আরো কত সমস্যা যে মোগো জীবনসঙ্গী হইয়া গেছে বলে শেষ করা যাইতোনা।”

কথাগুলো বলেছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের বড় অংকুজানপাড়া এলাকার নারীরা। শনিবার (২০ জুন) বিকেলে তালতলী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে নতুন পাড়া গ্রামে এক উঠান বৈঠকে অংশ নিয়ে গ্রামের নারীরা এই অভিযোগ করেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া ২১ জন নারীর মধ্যে ১৭ জনেরই নিজের শরীরে এলার্জি জনিত রোগ রয়েছে বলে উঠান বৈঠকে জানান। কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা শীর্ষক এই উঠান বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করেছে পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রীর জন্য আমরা (ধরা), মিশন গ্রিন বাংলাদেশ এবং পায়রা নদী ইলিশ রক্ষা কমিটি।

উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন মিশন গ্রিন বাংলাদেশের পরিচালক, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক সাংবাদিক কেফায়েত শাকিল। বিশেষ অতিথি ছিলেন ধরিত্রীর জন্য আমরা (ধরা) এর তালতলী-আমতলী অঞ্চল সমন্বয়ক রহমান আরিফ এবং তালতলী উপজেলা সদস্য সচিব মো. মোস্তাফিজ আকন। উঠান বৈঠকে অংশ নেওয়া নারীরা জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য জোরপূর্বক আমাদের বাড়িঘর ভেঙে দিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করেছে। আজ পর্যন্ত আমরা ক্ষতিপূরণ পাইলাম না, জমিও পাইলাম না। এখন বিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পর থেকে নদীতে গরম পানি ছাড়ায়। এ কারনে আমাদের নদীতে মাছ নাই। অথচ আমাদের এলাকার পুরুষদের অধিকাংশের পেশা ছিল জেলে। তারা এখন মাছ না পেয়ে বেকার হয়ে গেছে। আমরা সবাই অর্থ সংকটে ভুগছি। এর মধ্যে আবার সবার শরীরে এলার্জিসহ নানান রোগ বাসা বেঁধেছে। আমরা কিভাবে এখন চিকিৎসা করবো? আমাদেরতো খাবারেরই টাকা নাই।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কেফায়েত শাকিল বলেন, “পুরো বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। ঠিক তখন কারো আপত্তিকে আমলে না নিয়ে সরকার চাইনিজ কোম্পানিকে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল। অথচ যে চায়না কোম্পানি বাংলাদেশে এসে এই দূষণকারী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে তারা নিজেদের দেশেও এমন জীবন বিধ্বংসী প্রকল্প জীবনেও নিতে পারতো না। নতুন সরকারের উচিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রহমান আরিফ বলেন, “এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরো তালতলীর মানুষের জীবন বিপন্ন করে দিয়েছে। এটি কোনো আইন মেনে নির্মাণ করা হয়নি। পরিবেশ আইনকে মোটেও তোয়াক্কা করা হয়নি। এখনো এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কোনো আইন মানে না। তারা না ঢেকে কয়লা আনা নেওয়া করে, দূষিত পানি নদী/খালে ছাড়ে আর চিমনির দূষণতো আছেই। সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ করতে না পারুক অন্তত এই দূষণগুলো বন্ধ করেতো মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে।” বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. মোস্তাফিজ বলেন, “তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা ধোয়া বর্জ্য অবাধে পায়রা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে আমাদের রূপালী ইলিশের বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং নদীতে ইলিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। যা আমাদের মৎস্যসম্পদ এবং এর সাথে জড়িত হাজারো জেলের জীবিকাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া আমাদের পার্শ্ববর্তী ঐতিহ্যবাহী টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই দূষিত বাতাস শুধু বনের পশুপাখির ক্ষতি করছে না, বরং স্থানীয় এলাকার মানুষের কৃষি জমি ধ্বংস করছে এবং জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। ফুসফুসের রোগসহ নানা জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।”

“তাই অবিলম্বে কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পসহ সকল পরিবেশবিনাশী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প উৎসগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে শক্তিশালী টাইফুন ‘ডলফিন’ ১ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল!

তালতলীতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি

Update Time : ১১:৪৩:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
২৭

নিজস্ব প্রতিবেদক : মোগো প্রেত্যেকের শইল্লে চুলকানি। খাউজাইতে খাউজাইতে ক্ষ্যাত হইয়া যাইতেছে। জ্বালাপোড়ায় আর বাঁচতে পারতেছি না। এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটা হওয়ার পর থেইক্কা এই সমস্যা। চুলকানিতে আমাগো মাইয়াগো চেহারা নষ্ট হইয়া যায়। একারণে এহন এই গ্রামের মাইয়াগোরে কেউ বিয়াও করতে চায় না। শুধু খাউজানি চুলকানি না- ক’দিন পর পর আমাগো ডায়রিয়া অয়। আরো কত সমস্যা যে মোগো জীবনসঙ্গী হইয়া গেছে বলে শেষ করা যাইতোনা।”

কথাগুলো বলেছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের বড় অংকুজানপাড়া এলাকার নারীরা। শনিবার (২০ জুন) বিকেলে তালতলী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে নতুন পাড়া গ্রামে এক উঠান বৈঠকে অংশ নিয়ে গ্রামের নারীরা এই অভিযোগ করেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া ২১ জন নারীর মধ্যে ১৭ জনেরই নিজের শরীরে এলার্জি জনিত রোগ রয়েছে বলে উঠান বৈঠকে জানান। কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা শীর্ষক এই উঠান বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করেছে পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রীর জন্য আমরা (ধরা), মিশন গ্রিন বাংলাদেশ এবং পায়রা নদী ইলিশ রক্ষা কমিটি।

উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন মিশন গ্রিন বাংলাদেশের পরিচালক, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক সাংবাদিক কেফায়েত শাকিল। বিশেষ অতিথি ছিলেন ধরিত্রীর জন্য আমরা (ধরা) এর তালতলী-আমতলী অঞ্চল সমন্বয়ক রহমান আরিফ এবং তালতলী উপজেলা সদস্য সচিব মো. মোস্তাফিজ আকন। উঠান বৈঠকে অংশ নেওয়া নারীরা জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য জোরপূর্বক আমাদের বাড়িঘর ভেঙে দিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করেছে। আজ পর্যন্ত আমরা ক্ষতিপূরণ পাইলাম না, জমিও পাইলাম না। এখন বিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পর থেকে নদীতে গরম পানি ছাড়ায়। এ কারনে আমাদের নদীতে মাছ নাই। অথচ আমাদের এলাকার পুরুষদের অধিকাংশের পেশা ছিল জেলে। তারা এখন মাছ না পেয়ে বেকার হয়ে গেছে। আমরা সবাই অর্থ সংকটে ভুগছি। এর মধ্যে আবার সবার শরীরে এলার্জিসহ নানান রোগ বাসা বেঁধেছে। আমরা কিভাবে এখন চিকিৎসা করবো? আমাদেরতো খাবারেরই টাকা নাই।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কেফায়েত শাকিল বলেন, “পুরো বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। ঠিক তখন কারো আপত্তিকে আমলে না নিয়ে সরকার চাইনিজ কোম্পানিকে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল। অথচ যে চায়না কোম্পানি বাংলাদেশে এসে এই দূষণকারী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে তারা নিজেদের দেশেও এমন জীবন বিধ্বংসী প্রকল্প জীবনেও নিতে পারতো না। নতুন সরকারের উচিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রহমান আরিফ বলেন, “এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরো তালতলীর মানুষের জীবন বিপন্ন করে দিয়েছে। এটি কোনো আইন মেনে নির্মাণ করা হয়নি। পরিবেশ আইনকে মোটেও তোয়াক্কা করা হয়নি। এখনো এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কোনো আইন মানে না। তারা না ঢেকে কয়লা আনা নেওয়া করে, দূষিত পানি নদী/খালে ছাড়ে আর চিমনির দূষণতো আছেই। সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ করতে না পারুক অন্তত এই দূষণগুলো বন্ধ করেতো মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে।” বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. মোস্তাফিজ বলেন, “তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা ধোয়া বর্জ্য অবাধে পায়রা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে আমাদের রূপালী ইলিশের বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং নদীতে ইলিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। যা আমাদের মৎস্যসম্পদ এবং এর সাথে জড়িত হাজারো জেলের জীবিকাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া আমাদের পার্শ্ববর্তী ঐতিহ্যবাহী টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই দূষিত বাতাস শুধু বনের পশুপাখির ক্ষতি করছে না, বরং স্থানীয় এলাকার মানুষের কৃষি জমি ধ্বংস করছে এবং জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। ফুসফুসের রোগসহ নানা জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।”

“তাই অবিলম্বে কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পসহ সকল পরিবেশবিনাশী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প উৎসগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।