ঢাকা ০৯:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তালতলীতে জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘ভালোবাসার দোকান’

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:৫৩:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
  • ২৩ Time View
৪৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘দুইডা পাও কাইট্যা হালানোর পর মুই মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা কইর‌্যা খাইতাম। এহন আর মোর ভিক্ষা করোন লাগবে না। মুই এহন দোহানের লাভের ট্যাহা দিয়া বউ পোলা লইয়া খাইতে পারমু। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের নিকট থেকে ‘ভালোবাসার’ দোকান পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন আমতলী পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সড়ক দুর্গটনায় দুই পা হারানো মো. সিরাজুল ইসলাম।

আমতলী পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের মফেজ আকনের ছেলে মো. সিরাজুল ইসলাম আকন (৫৫)। আগে পেশায় ছিলেন ভ্যান চালক। ঢাকা শহরে বিভিন্ন দোকানে ভ্যানে মালামাল পরিবহন করে পৌঁছে দিতেন। বিনিময়ে যা পেতেন তা দিয়ে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ভালো ভাবে এবং সুখেই চলছিল তার সংসার। নগর জীবনের ব্যস্ততা ভুলতে সপ্তাহ খানের জন্য ছুটে এসে ছিলেন স্ত্রী ছেলের কাছে। কিন্তু ছুটিতে বাড়ী এসে তার জীবনে নেমে আসে এক অন্ধকারের ছায়া। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেদিন ছিল ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। ঘড়ির কাটায় বেলা তখন দুপুর সাড়ে ৩টা। ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন সিরাজ। বিধি বাম। বাসা থেকে অটো যোগে বের হয়ে আমতলী-পটুয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের কালিবাড়ি নামক স্থানে যাওয়া মাত্র বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা বরিশাল সেনানিবাসের একটি জীপের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে দুমওে মুচরে যায় অটো। গুরুতর আহত হন সিরাজ ও চালক মাঈনুলসহ ৬জন। সিরাজের দুটি এবং চালক মাঈনুলের ১টি পা ভেঙ্গে চুর্নবিচুর্ন হয়ে যায়। বরিশাল, ঢাকা পঙ্গুসহ নানা যায়গায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে সিরাজের নিজের এবং পৈত্রিক জায়গা জমি যা ছিল সব বিক্রি করতে হয়েছে। তারপরও পা দুটি ভালো না হওয়ায় এক পর্যায়ে এসে চিকিসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেটে ফেলতে হয়েছে। এখন তার পা হীন জীবন। জায়গা জমি সংসার বলতে সিরাজের জীবনে কিছুই নেই। এক পর্যায় এসে সিরাজ সংসার ও নিজের জীবন বাঁচাতে  নেমে পরেন ভিক্ষা বৃত্তিতে। মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে যা পান তা দিয়ে নিজের ওষুধ ও স্ত্রী ছেলের মুখে দুটো ভাত তুলে দেন। একদিন বিষয়টি নজরে আসে জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের সভাপতি সাংবাদিক মো. জাকির হোসেন ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা প্রবাসী জিয়াউর রহমানের। সিরাজের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকে একটি ছোট দোকান দিয়ে সহযোগিতা করার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমতলী পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজের বাসার সামনে টি পয়েন্ট নামে একটি ‘ভালোবাসার’ দোকান দিয়ে দেওয়া হয়। দোকানের মুদি মনোহরি ও চা বিস্কুটসহ ৩০ হাজার টাকার মালামাল কিনে দেন জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন।

রবিবার (২৪ মে) বিকেল চারটায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ফিতা কেটে ‘ভালোবাসার’ দোকানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মানজুরুল হক কাওছার।  দোকান পেয়ে খুশি দুই পা হারানো সিরাজ। তিনি বলেন, মোর ভিক্ষা কইর‌্যা খায়োন লাগদো। এ্যাহন আর ভিক্ষা লাগবে না। দোহান দিয়া মুই ভালো থাকতে পারমু। জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন মোর জীবনের একটা গতি কইর‌্যা দেছে। আল্লার কাছে মুই দুই আত উডাইয়া দোয়া হরি আল্লায় যেন হ্যাগো আরো তফিক দ্যায় মানুষেরে দেওয়ার লইগ্যা।

সিরাজের স্ত্রী লাকী বেগম বলেন, মোগো দোকানডা দিয়া জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন ব্যামালা হুগার হরছে। আল্লায় যেন হ্যাগো বাচাইয়া রাহে।

জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের সভাপতি সাংবাদিক জাকির হোসেন বলেন, সংগঠনটি আমাদের বাবা মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত। অসহায় দরিদ্র মানুষের সেবা করাই এই সংগঠনের মুল কাজ।

আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মানজুরুল হক কাওছার বলেন, জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন আমতলী উপজেলায় অসহায়, দরিদ্র মেধাবী শিক্ষাথীদের শিক্ষা বৃত্তি, প্রতিবন্ধীদের হুইল চেয়ারসহ নানা ধরনের সহযোগিতা করে থাকে। আমি সংগঠনটির উন্নতি কামনা করছি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

সিলেটে আ.লীগ নেতা, তার স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকার গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

তালতলীতে জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘ভালোবাসার দোকান’

Update Time : ১১:৫৩:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
৪৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘দুইডা পাও কাইট্যা হালানোর পর মুই মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা কইর‌্যা খাইতাম। এহন আর মোর ভিক্ষা করোন লাগবে না। মুই এহন দোহানের লাভের ট্যাহা দিয়া বউ পোলা লইয়া খাইতে পারমু। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের নিকট থেকে ‘ভালোবাসার’ দোকান পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন আমতলী পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সড়ক দুর্গটনায় দুই পা হারানো মো. সিরাজুল ইসলাম।

আমতলী পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের মফেজ আকনের ছেলে মো. সিরাজুল ইসলাম আকন (৫৫)। আগে পেশায় ছিলেন ভ্যান চালক। ঢাকা শহরে বিভিন্ন দোকানে ভ্যানে মালামাল পরিবহন করে পৌঁছে দিতেন। বিনিময়ে যা পেতেন তা দিয়ে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ভালো ভাবে এবং সুখেই চলছিল তার সংসার। নগর জীবনের ব্যস্ততা ভুলতে সপ্তাহ খানের জন্য ছুটে এসে ছিলেন স্ত্রী ছেলের কাছে। কিন্তু ছুটিতে বাড়ী এসে তার জীবনে নেমে আসে এক অন্ধকারের ছায়া। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেদিন ছিল ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। ঘড়ির কাটায় বেলা তখন দুপুর সাড়ে ৩টা। ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন সিরাজ। বিধি বাম। বাসা থেকে অটো যোগে বের হয়ে আমতলী-পটুয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের কালিবাড়ি নামক স্থানে যাওয়া মাত্র বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা বরিশাল সেনানিবাসের একটি জীপের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে দুমওে মুচরে যায় অটো। গুরুতর আহত হন সিরাজ ও চালক মাঈনুলসহ ৬জন। সিরাজের দুটি এবং চালক মাঈনুলের ১টি পা ভেঙ্গে চুর্নবিচুর্ন হয়ে যায়। বরিশাল, ঢাকা পঙ্গুসহ নানা যায়গায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে সিরাজের নিজের এবং পৈত্রিক জায়গা জমি যা ছিল সব বিক্রি করতে হয়েছে। তারপরও পা দুটি ভালো না হওয়ায় এক পর্যায়ে এসে চিকিসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেটে ফেলতে হয়েছে। এখন তার পা হীন জীবন। জায়গা জমি সংসার বলতে সিরাজের জীবনে কিছুই নেই। এক পর্যায় এসে সিরাজ সংসার ও নিজের জীবন বাঁচাতে  নেমে পরেন ভিক্ষা বৃত্তিতে। মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে যা পান তা দিয়ে নিজের ওষুধ ও স্ত্রী ছেলের মুখে দুটো ভাত তুলে দেন। একদিন বিষয়টি নজরে আসে জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের সভাপতি সাংবাদিক মো. জাকির হোসেন ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা প্রবাসী জিয়াউর রহমানের। সিরাজের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকে একটি ছোট দোকান দিয়ে সহযোগিতা করার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমতলী পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজের বাসার সামনে টি পয়েন্ট নামে একটি ‘ভালোবাসার’ দোকান দিয়ে দেওয়া হয়। দোকানের মুদি মনোহরি ও চা বিস্কুটসহ ৩০ হাজার টাকার মালামাল কিনে দেন জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন।

রবিবার (২৪ মে) বিকেল চারটায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ফিতা কেটে ‘ভালোবাসার’ দোকানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মানজুরুল হক কাওছার।  দোকান পেয়ে খুশি দুই পা হারানো সিরাজ। তিনি বলেন, মোর ভিক্ষা কইর‌্যা খায়োন লাগদো। এ্যাহন আর ভিক্ষা লাগবে না। দোহান দিয়া মুই ভালো থাকতে পারমু। জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন মোর জীবনের একটা গতি কইর‌্যা দেছে। আল্লার কাছে মুই দুই আত উডাইয়া দোয়া হরি আল্লায় যেন হ্যাগো আরো তফিক দ্যায় মানুষেরে দেওয়ার লইগ্যা।

সিরাজের স্ত্রী লাকী বেগম বলেন, মোগো দোকানডা দিয়া জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন ব্যামালা হুগার হরছে। আল্লায় যেন হ্যাগো বাচাইয়া রাহে।

জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের সভাপতি সাংবাদিক জাকির হোসেন বলেন, সংগঠনটি আমাদের বাবা মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত। অসহায় দরিদ্র মানুষের সেবা করাই এই সংগঠনের মুল কাজ।

আমতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মানজুরুল হক কাওছার বলেন, জাহানারা লতিফ মোল্লা ফাউন্ডেশন আমতলী উপজেলায় অসহায়, দরিদ্র মেধাবী শিক্ষাথীদের শিক্ষা বৃত্তি, প্রতিবন্ধীদের হুইল চেয়ারসহ নানা ধরনের সহযোগিতা করে থাকে। আমি সংগঠনটির উন্নতি কামনা করছি।