নিজস্ব প্রতিবেদক : ঝালকাঠি শহরের বুক চিড়ে প্রবাহিত বাসন্ডা নদীতে ঐতিহ্যবাহী অতুল মাঝির খেয়া ঘাটটি ভেঙে পড়েছে। এটি এখন যাতায়াতকারীদের মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীসহ প্রতিদিন শতশত মানুষ এ খেয়াঘাটটি পারপার হয়ে গন্তব্যে পৌছে।

 

যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও এলাকাবাসী। মূলত অতুল মাঝির খেয়াঘাট বা পৌর খেয়াঘাট ঝালকাঠির মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের সাক্ষী এবং মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি বিজড়িত একটি স্থান। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহরের পশ্চিম ঝালকাঠি, কেফাইতনগর এবং ওমেশগঞ্জসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই খেয়াঘাট। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ঘাট ব্যবহার করে নদী পার হয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ঘাটের ঢালাই অংশ ভেঙে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল ও গর্ত তৈরি হয়েছে। ফলে খেয়ার নৌকায় ওঠানামা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

 

স্থানীয়রা জানান, ভাঙা খেয়াঘাটের পাশেই একটি বিকল্প স্থানে অস্থায়ীভাবে নৌকা ভিড়িয়ে যাত্রীদের পারাপার করা হচ্ছে। তবে সেখানেও স্থায়ী অবকাঠামো বা নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়েই পারাপার করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম বা বৃষ্টির সময় ঘাটের চারপাশ পিচ্ছিল হয়ে পড়ে, তখন দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। অনেক সময় যাত্রীরা পা পিছলে পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খেয়াঘাটের ইজারাদার স্বপন মজুমদার (৬০) জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে প্রায় দুইশত বছর ধরে এঘাটটি চলে আসছে। বংশ পরম্পরায় আমরা চার পুরুষ ধরে রক্ষাণাবেক্ষণে রয়েছি।

 

 

দু’প্রান্তের সিঁড়ি তখন যেভাবে তৈরী করা হয়েছিলো, তা এখনও শক্ত। কিন্তু পানির চাপে সিঁড়ির গোড়ার মাটি সরে গিয়ে ভেঙে গেছে। একাধিকবার পৌরসভার লোকজন এসে মেপে নকশা করে নিয়ে গেছে। তবুও কোন কাজ শুরু হয়নি। এখন ঝুকি নিয়ে প্রতিদিন শতশত লোকজন পারাপার হচ্ছে। তিনি আরো জানান, এঘাটটিতে মুক্তিযুদ্ধেরও অনেক স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে। আমার বয়স যখন ৪/৫বছর, তখন এখানে অনেকের লাশ ভাসতে দেখেছি। পাকবাহিনীর উপস্থিতি টের পেলে বড় ভাই আমাকে কাঁধে নিয়ে দৌড়াতেন। তখনও এই ঘাটলাটিই ছিলো, যা আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে।

 

ওই সময়ে ১৬টি নৌকায় মানুষ পারাপার করা হতো। যা বর্তমানে ৬টি নৌকা পর্যন্ত এসে পৌছেছে। যার চারটি দিনে এবং দুটি রাতে লোকজন পারাপার করে। মুদি দোকানদার আব্দুর রাজ্জাক মৃধা জানান, ঘাটটি কবে নির্মাণ করা হয়েছিলো তা জানা নেই। যুগযুগ ধরে এটি এলাকার মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘাটটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক নেতা মো. আবুল কালাম বেপারি জানান, এই খেয়াঘাটটি আমাদের এলাকার মানুষের প্রধান যাতায়াতের পথ। কিন্তু এখন ঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিদিন ভয় নিয়ে পারাপার করতে হয়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি খুবই বিপজ্জনক।

 

আরেক বাসিন্দা রিমা খানম বলেন, আমাদের সন্তানরা প্রতিদিন এই ঘাট দিয়ে স্কুলে যায়। ঘাটটি ভেঙে যাওয়ায় খুব দুশ্চিন্তায় থাকি। দ্রুত সংস্কার করা না হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।” খেয়া মাঝি লিটু জানান, ভাঙা ঘাটের কারণে নৌকা ঘাটে ঠিকভাবে ভেড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে যাত্রীদের ওঠানামা করতে গিয়ে প্রায়ই বিপাকে পড়তে হয়। মাঝিরা আরও বলেন, “ঘাটটি সংস্কার হলে পারাপার অনেক নিরাপদ হবে এবং যাত্রীদের ভোগান্তিও কমবে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘাটটি মেরামত বা নতুন করে নির্মাণের জন্য বহুবার সংশ্লিষ্ট পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়েই নদী পার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

 

এ বিষয়ে এলাকাবাসী দ্রুত খেয়াঘাটটি সংস্কার অথবা নতুন করে নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই ঘাটটি সংস্কার করা হলে এলাকার মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে এবং দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে। পৌরসভার প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, পালবাড়ি অতুল মাঝি নামের খেয়াঘাটটি পৌরসভার অধীনেই ইজারা দেয়া হয়। এটির ঘাট নাজুক হওয়ায় আমরা একটি প্রকল্পে এটাকে যুক্ত করেছি। ওই প্রকল্পে চারটি বড় ঘাটলা নির্মানের বরাদ্ধ থাকবে। যা থেকে ওখানে খেয়াঘাটের দু’পাড়ের জন্য দুটি বরাদ্দ থাকবে। আশা করি শিঘ্রই টোন্ডার দিয়ে কাজ শুরু করাতে পারবো বলেও জানান তিনি।