নিজস্ব প্রতিবেদক : বরগুনায় ব্যক্তিগত ঋণের নামে ব্ল্যাংক চেক ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সক্রিয় একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষের আর্থিক দুর্বলতা ও আইনি অজ্ঞতাকে পুঁজি করে খালি চেক ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে পরে তা ব্যবহার করছে প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদর, তালতলী, আমতলী, বেতাগী, বামনা ও পাথরঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। চিকিৎসা, ব্যবসা বা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত টাকা পাওয়ার আশায় অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ঋণ নিচ্ছেন। সেই সুযোগে প্রতারকরা সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে খালি ব্যাংক চেক, স্ট্যাম্প ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর আদায় করে নেয়।

 

ঋণ গ্রহণের পরপরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পূর্বে নির্ধারিত শর্ত ভেঙে চাপিয়ে দেওয়া হয় অতিরিক্ত সুদ। অনেক ক্ষেত্রে এক লাখ টাকার বিপরীতে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলেই খালি চেকে ইচ্ছামতো অঙ্ক বসিয়ে ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। চেক ডিজঅনার হওয়ার পর শুরু হয় আইনি চাপ।

 

জেলা আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব ঘটনায় নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা করা হচ্ছে। এই ধারাটি মূলত বৈধ বাণিজ্যিক লেনদেন সুরক্ষার জন্য প্রণীত হলেও প্রতারক চক্র এটিকে ব্যবহার করছে ভয়ভীতি ও চাপ সৃষ্টির কার্যকর অস্ত্র হিসেবে। প্রাথমিকভাবে চেকের স্বাক্ষর মিললেই মামলা গ্রহণ হওয়ায় টাকার প্রকৃত লেনদেন অনেক ক্ষেত্রেই যাচাই করা হচ্ছে না।

 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্বল্প অঙ্কের ঋণ নিয়ে তারা এখন কয়েকগুণ বেশি অর্থ পরিশোধে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ জমি-বাড়ি বিক্রি করে ঋণ শোধ করছেন, আবার অনেকে আইনি জটিলতা এড়াতে গোপনে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এতে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে অসংখ্য পরিবার।

 

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই প্রতারণা একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে জড়িত রয়েছে ঋণদাতা, সুদ আদায়কারী, ভাড়াটে বাদী, নোটিশ প্রস্তুতকারী এবং আদালতপাড়ার দালালচক্র। ফলে ভুক্তভোগীরা সহজেই একটি জটিল আইনি ফাঁদে আটকা পড়ে যাচ্ছেন।

 

আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচেতনতার অভাবই এই প্রতারণার বড় কারণ। অনেকেই খালি চেক বা সাদা কাগজে স্বাক্ষরের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত নন, যার সুযোগ নিচ্ছে চক্রটি।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে সচেতনতা বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত ঋণ লেনদেনে লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক করা এবং লাইসেন্সবিহীন সুদ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আদালতে মামলা গ্রহণের আগে প্রাথমিক আর্থিক লেনদেন যাচাই নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

 

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ব্ল্যাংক চেককে কেন্দ্র করে এই প্রতারণা এখন বরগুনায় নীরব সংকটে রূপ নিয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আরও বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়বে এবং এ ধরনের প্রতারণা আরও বিস্তার লাভ করবে।

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনের দুর্বল দিকগুলো কাজে লাগিয়ে পরিচালিত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কঠোরতা ও জনসচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে একমাত্র প্রতিরোধের পথ।