নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালের ৬টি সংসদীয় আসনে বৃহস্পতিবারের গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ৮ লাখ ৪ হাজার ৪৩৩ ভোটের বিপরীতে ‘না’-এর পক্ষে ৩ লাখ ৭১,১৮৯ ভোট পড়েছে। যা ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রায় ৪৬ শতাংশ। বরিশালের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. খায়রুল আলম সুমন শুক্রবার রাতে সরকারিভাবে এ তথ্য প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ‘না’-এর পক্ষে বিপুল সংখ্যক ভোটে বিস্ময় প্রকাশ করলেও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে হিসেব-নিকেশ শুরু হয়েছে। বরিশালের মতো সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলেই ‘না’-এর পক্ষে বিপুল সংখ্যক ভোটকে ‘চিহ্নিত পতিত শক্তির নিরব ভোট বিপ্লব’ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক মহল। এমনকি এ পতিত শক্তি কৌশলগত কারণে ভোটকে বাধাগ্রস্ত করার পথ থেকে সরে এসে ‘না’-এর পক্ষে ভোট দেওয়া সহ জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতিপক্ষকে ভোট দিয়ে অঘটন ঘটানোরও অপচেষ্টা করেছে বলে মনে করছেন তারা।
রিটার্নিং কর্মকর্তার হিসেব মতে, বরিশাল জেলার ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৮ ভোটারের ৫৬.৬৭ শতাংশ এবারের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নেন। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে বরিশাল-৫ বিভাগীয় সদরের আসনে। এখানে ১,৭৬,৬৬৮ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করলেও ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৬৯,৩৯৪ জন। তবে ‘না’-এর পক্ষে সর্বাধিক ভোট দিয়েছেন উজিরপুর ও বানারীপাড়া নিয়ে গঠিত বরিশাল-২ আসনে। এখানে ‘না’-এর পক্ষে ৮০,৯৬৬ ভোটার ভোট প্রদান করেছেন। তবে এ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ১,৩৪,২৭৮ জন।
অন্যদিকে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সর্বনিম্ন ভোটদান করেছেন গৌরনদী-আগৈলঝাড়া নিয়ে গঠিত বরিশাল-১ আসনের ভোটারগণ। এ আসনের ১,১২,২০৮ জন ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিলেও ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৭৩,৯৮২ জন। তবে ‘না’-এর পক্ষে সর্বনিম্ন সংখ্যক ভোট দিয়েছেন বাবুগঞ্জ-মুলাদী নিয়ে গঠিত বরিশাল-৩ আসনের ভোটারগণ। এ আসনে ৪০,৬৩৬ ভোটার ‘না’-এর পক্ষে ভোট দিলেও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন ১,২২,৩০৫ জন।
এবারের সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও মাঠ পর্যায়ে প্রার্থীদের তরফ থেকে সে সম্পর্কে ভোটারদের মাঝে সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়নি। কোনো দলীয় নেতা-কর্মীদের তরফ থেকেও গণভোট নিয়ে ভোটারদের কাছে কোনো বার্তা যায়নি। এমনকি ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর পার্থক্য এবং এতে দেশ ও জাতির কী সুবিধা-অসুবিধা, সে বিষয়টিও কেউ ভোটারদের অবহিত করেননি।
পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর পক্ষে সিল দেওয়ার স্থানটি নিয়েও ভোটারদের মাঝে কিছুটা বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা গেছে। যে বিষয়টি ভোটের আগে খুব ভালোভাবে অবহিত ও প্রদর্শন করা হয়নি বলেও বুথ ফেরত অনেক ভোটার অভিযোগ করেছেন। এমনকি বিষয়টি সম্পর্কে ভোটকেন্দ্রের আশেপাশেও তেমন কোনো প্রদর্শনী ও প্রচারণা ছিল না। ফলে এবারের গণভোটে বরিশালে প্রদত্ত ১১,৭৫,৬২২ ভোটের মধ্যে ১,০৫,২৪২ ভোটই বাতিল হয়ে গেছে; যা প্রদত্ত ভোটের প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি।
অন্যদিকে নিরবে ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালানো হলেও তা প্রতিরোধ ও সে রহস্য উদঘাটনেও কারও আগ্রহ লক্ষ্যণীয় ছিল না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বরিশাল-৫ আসনে যেভাবে অতীতে বারবার জামানত হারানো একটি দলের প্রার্থীকে পতিত গোষ্ঠী নিরবে বিপুল ভোটে এগিয়ে নিয়েছে, তারাই নানা অপতথ্য দিয়ে ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। ফলে এ আসনটিসহ দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্রই বিপুল সংখ্যক ‘না’ ভোট সবার মনে নানা প্রশ্ন জন্ম দিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে সমাজে পিছিয়ে পড়া এবং শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকা মানুষকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়েছে।
এমনকি বরিশাল-৫ আসনে ১,৭৬,৬৬৮ জন ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিলেও ৬৯,৩৯৪ জন ‘না’ ভোট দিয়েছেন। এ আসনে বিএনপির প্রতিপক্ষ ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী এবার ৯৫,০৪৪ ভোট পেয়েছেন, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলেও বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। মূলত এ আসনে পরাজিত দলটির ভোট অতীতে কখনোই ৩০ হাজার অতিক্রম করেনি। এমনকি এ আসনে আরও এক প্রার্থী প্রায় ২৩ হাজার ভোট পেয়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছেন। তবে এ আসনে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিএনপির কোনো কোনো কর্মীর দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি একটি পতিত দলের কর্মী-সমর্থকগণ জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতিপক্ষের ভোটবাক্স সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি একান্ত দলীয় স্বার্থেই ‘না’ ভোট দিয়ে গেছেন নিরবে; যা বিএনপির নেতা-কর্মীরা ভোটের দিনেও উপলব্ধি করতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।