নিজস্ব প্রতিবেদক : মানবজাতির ইতিহাসে অসংখ্য মহাপুরুষ এসেছেন। কেউ ছিলেন জ্ঞানী, কেউ ছিলেন বিজয়ী, কেউ ছিলেন সমাজসংস্কারক। কিন্তু এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ রাসুল, সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ, মানবতার মুক্তিদূত এবং বিশ্বজগতের জন্য রহমত, তিনি হলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর শান, মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য কেবল মুসলমানদের বিশ্বাসের বিষয় নয়; বরং স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে তাঁর মর্যাদা ঘোষণা করেছেন। সহিহ হাদিসেও তাঁর সম্মান, অনুসরণ ও ভালোবাসার গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

বিশ্বজগতের জন্য রহমত : আল্লাহ তাআলা বলেন : আমি তো আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। (সুরা আল-আম্বিয়া : ১০৭)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের মাধ্যমে মানুষ শিরক, কুসংস্কার ও জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ পেয়েছে। তাঁর শিক্ষা শুধু ধর্মীয় বিধান নয়; বরং মানবিকতা, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও শান্তির এক পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন।
মহান চরিত্রের অধিকারী : আল্লাহ বলেন : নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। (সুরা আল-কলম : ৪)। হজরত আয়েশা (রা.)-কে যখন রাসুল (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন,তাঁর চরিত্রই ছিল কোরআন। (সহিহ মুসলিম : ৭৪৬)। অর্থাৎ কোরআনের প্রতিটি আদর্শ তিনি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে সম্বোধন করে বলেন, নিশ্চয়ই আপনি সরল পথের দিকে আহ্বান করেন। (সুরা আশ-শুরা : ৫২)। তিনি মানুষকে কেবল ইবাদতের শিক্ষা দেননি; বরং নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আল্লাহভীতির জীবন গঠনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

উত্তম আদর্শের অনুসরণ : আল্লাহ বলেন—অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সুরা আল-আহযাব : ২১)। একজন সফল পিতা, স্বামী, প্রতিবেশী, শাসক, বিচারক, সেনাপতি ও বন্ধু সব পরিচয়েই তিনি ছিলেন সর্বোত্তম উদাহরণ। তাই মুসলমানদের জন্য তাঁর জীবনই প্রকৃত অনুসরণীয় আদর্শ। আল্লাহর ভালোবাসা লাভের পথ : আল্লাহ বলেন : বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ কর; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন। (সুরা আলে ইমরান : ৩১)। এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ ছাড়া অন্য কিছু নয়।

আল্লাহ ও ফেরেশতাদের দরুদ : আল্লাহ তাআলা বলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ কর। (সুরা আল-আহযাব : ৫৬)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করবেন। (সহিহ মুসলিম : ৪০৮)। রাসুলের আনুগত্যই আল্লাহর আনুগত্য। আল্লাহ বলেন : যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে অবশ্যই আল্লাহরই আনুগত্য করল। (সুরা আন-নিসা : ৮০)। এ কারণেই ইসলামে কোরআনের পাশাপাশি সহিহ সুন্নাহকে শরিয়তের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়।

নবীপ্রেম ঈমানের শর্ত : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই। (সহিহ বুখারি : ১৫, সহিহ মুসলিম : ৪৪)। এই ভালোবাসা বাস্তবে প্রকাশ পায় তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ এবং তাঁর শিক্ষা প্রচারের মাধ্যমে।

সর্বশেষ নবী : আল্লাহ বলেন : মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবী। (সুরা আল-আহযাব : ৪০)। তাঁর মাধ্যমে নবুয়তের ধারা সমাপ্ত হয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর আনীত ইসলামই আল্লাহর মনোনীত জীবনব্যবস্থা। কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের নেতা হব এবং আমিই সর্বপ্রথম সুপারিশ করব, আর আমার সুপারিশই সর্বপ্রথম কবুল করা হবে। (সহিহ মুসলিম : ২২৭৮)। এটি আল্লাহর কাছে তাঁর বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের অন্যতম নিদর্শন।

আমাদের করণীয় : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হলো : কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা। তাঁর সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করা। তাঁর চরিত্র, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া ও ক্ষমাশীলতা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলা। পরিবারে সন্তানদের নবীপ্রেম ও সিরাতের শিক্ষা দেওয়া। তাঁর সম্পর্কে অতিরঞ্জন বা অবমূল্যায়ন না করে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক আকিদা ধারণ করা।

পরিশেষে বলা যায়, হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ ব্যক্তিত্ব। পবিত্র কোরআনে তাঁকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত, মহান চরিত্রের অধিকারী, সর্বশেষ নবী এবং অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সহিহ হাদিসে তাঁর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য ও সম্মানকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা হয়েছে।

 

তাই প্রকৃত নবীপ্রেমের অর্থ শুধু আবেগ প্রকাশ নয়; বরং তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা, তাঁর আদর্শকে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর প্রদর্শিত পথেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, যথাযথ সম্মান এবং তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।