অনলাইন ডেক্স : দেশের অন্যতম বৃহৎ জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র আবারও তীব্র প্রশাসনিক ও আইনি সংকটের মুখে পড়েছে। ট্রাস্টিবোর্ডের বৈধতা ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধ এবার প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে। উচ্চ আদালতের একটি অন্তর্বর্তী আদেশকে কেন্দ্র করে শনিবার (২৫ জুলাই) সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ক্যাম্পাসে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে গেলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ভাঙচুর, নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর এবং জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে অপর পক্ষ এসব অভিযোগকে ‘সাজানো’ ও ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করেছে।

জানা গেছে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টিবোর্ডের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। এর মধ্যে গত ৫ জুলাই হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চ তিনটি সম্পূরক নিবন্ধিত ট্রাস্ট দলিলের কার্যকারিতা চার মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দেন।

এই আদেশকে নিজেদের পক্ষে ব্যাখ্যা করে প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্য ডা. নাজিম উদ্দিন আহমদ সমর্থকদের নিয়ে শনিবার সকালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। কিন্তু বর্তমান ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্যরা এতে আপত্তি জানালে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

বর্তমান ট্রাস্টিবোর্ডের অভিযোগ, আদালতের আদেশের অপব্যাখ্যা করে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন ডা. নাজিম উদ্দিন। এরপর গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস এলাকায় একটি গাড়ি, সিসিটিভি ক্যামেরা ও ভবনের কাচ ভাঙচুর করা হয়। এ সময় এক নিরাপত্তাকর্মীকেও মারধরের অভিযোগ করা হয়।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক (ভূমি প্রশাসন) মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে বহিরাগতরা ফার্মাসিউটিক্যালস এলাকায় প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় এবং নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করে। তার দাবি, এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা।

তিনি আরও বলেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর ডা. নাজিম উদ্দিন নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে আর্থিক হিসাব দিতে না পারায় তিনি পদত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে আলাদা ট্রাস্টিবোর্ড গঠন করেন, যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।

তার দাবি, আদালত মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ডা. নাজিম উদ্দিনকে প্রশাসনিক বা আর্থিক কোনো কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে প্রবেশ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সম্ভাব্য দখলচেষ্টার আশঙ্কায় আগের রাতেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

বর্তমান ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারপারসন শিরীন পারভিন হক বলেন, প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকেই ডা. নাজিম উদ্দিন বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তার অভিযোগ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে নেওয়া ঋণের বিপুল অর্থ পরিশোধ এড়াতেই তিনি প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চাইছেন। দায়িত্ব পালনকালে অর্থ অপচয়, তছরুপ এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

শিরীন পারভিন হকের ভাষ্য, আদালতের আদেশ এখনো অন্তর্বর্তী পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু কর্মীদের কাছে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে যেন আদালত ইতোমধ্যেই ডা. নাজিম উদ্দিনকে প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি জানান, এ ঘটনায় তারা আদালতের শরণাপন্ন হবেন।

এদিকে সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ডা. নাজিম উদ্দিন আহমদ বলেন, আদালতের আদেশ এবং ১৯৭২ ও ১৯৮০ সালের ট্রাস্ট ডিড অনুযায়ী তিনিই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালনার বৈধ ব্যক্তি। প্রশাসন ও পুলিশকে আদালতের আদেশের কপি দেখিয়েই তিনি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন।

তার দাবি, বর্তমান ট্রাস্টিবোর্ড ট্রাস্ট ডিড লঙ্ঘন করে গঠন করা হয়েছে। ২০২৪ সালে তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। আদালত সম্পূরক দলিলগুলোর কার্যকারিতা স্থগিত করায় তিনি আইনগতভাবে পুনরায় দায়িত্বে ফিরেছেন।

ফার্মাসিউটিক্যালসে ভাঙচুরের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, তার পক্ষের কেউ ওই এলাকায় যায়নি। বরং বর্তমান কর্তৃপক্ষ নিজেদের লোক দিয়ে ভাঙচুর চালিয়ে দায় তার সমর্থকদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত চিকিৎসা ফি নেওয়া হচ্ছিল। তাই বহির্বিভাগের ফি ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২৫০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে সিজারিয়ান অপারেশনের অতিরিক্ত ব্যয় এবং রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠানোর অভিযোগও তোলেন তিনি।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, উত্তেজনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে ডা. নাজিম উদ্দিন ও তার সমর্থকেরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।

তিনি বলেন, একটি সিসিটিভি ক্যামেরা ও দুটি কাচ ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। তবে উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোন পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি।

এদিকে ২০২৩ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর ট্রাস্টিবোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই নতুন বোর্ডের বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা করেন প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্য ডা. নাজিম উদ্দিন আহমদ। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।

আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী আদেশকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যাই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। আদালতের পূর্ণাঙ্গ শুনানি ও চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত ট্রাস্টিবোর্ডের বৈধতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র শুধু একটি হাসপাতাল নয়; এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। ফলে ট্রাস্টিবোর্ডের এই বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম, চিকিৎসাসেবা, কর্মপরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।