খেলা ডেস্ক : আচমকা এক গোলে ম্যাচের শুরুতেই পিছিয়ে পড়লো আর্জেন্টিনা। কিছুক্ষণ পরই সেই ভুল শুধরে নেবার সুযোগ পেলেন লিওনেল মেসি। আবারও পেনাল্টি মিস হতাশায় ঢেকে দিল আলবিসেলেস্তাদের মুখ। দ্বিতীয়ার্ধে দ্বিতীয় গোল হজমে তাদের মনে ছিটকে পড়ার শঙ্কাও উঁকি দিল জোরেশোরে। তবে, ফুটবলের জাদুকর ঠিকই জ্বলে উঠলেন। লড়াইয়ে ফেরার গোলে অবদান রেখে, পরক্ষণেই নিজে করলেন গোল। পথ পেয়ে গেল আর্জেন্টিনা। যোগ করা সময়ে ফের জালে বল জড়িয়ে, নাটকীয় জয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠল বিশ^ চ্যাম্পিয়নরা। গতকাল রাতে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর শ্বাসরুদ্ধরকর ম্যাচটি ৩-২ গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা। জয়ী দলের হয়ে একটি করে গোল করেছেন মেসি, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও এনজো ফার্নান্দেস। মিসরের হয়ে দুটি গোল ইয়াসের ইব্রাহিম ও মোস্তফা জিকোর।

শেষ বাঁশি বাজল যোগ করা সময়ের ১২তম মিনিটে। অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে আর্জেন্টিনা উঠে গেল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। কাঁদছেন মেসি। সতীর্থদের আলিঙ্গনে সেই কান্না যেন আরও বেড়ে চলেছে। মেসি কাঁদছেন দর্শকের দিকে তাকিয়েও। তার কান্নায় শরিক সতীর্থ থেকে শুরু করে দর্শক, বিশ^জোড়া কোটি ভক্তরাও। এই কান্না যে আনন্দের, স্বস্তির! কারণটাও অনুমেয়। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়েছিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পথ ছিল মাত্র কয়েক মিনিট দূরে। এরপরই আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন, আর তা জাদুকর মেসির হাত ধরেই।

ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে মেসির অ্যাসিস্টে একটি গোল শোধ দিলেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। এসময় ডান প্রান্ত থেকে দুর্দান্ত এক ক্রস ভাসিয়ে দেন মেসি। সেই বলের দারুণ ব্যবহার করেন রোমেরো। কোনো বাধা ছাড়াই জোরালো হেডে বল পাঠিয়ে দেন জালে। ৮৩ মিনিটে মেসি এবার স্বয়ং ত্রাতার ভূমিকায়। তাকে ঘিরে আক্রমণ গড়ে তোলার সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন লাওতারো মার্তিনেজ। বলটি বদলি খেলোয়াড় গঞ্জালো মন্তিয়েলের গায়ে লেগে চলে আসে মেসির সামনে। পেনাল্টি মিসের দায়টা তো ছিলই। সুযোগ পেয়েই শট নেন তিনি। মিসরের গোলরক্ষক মোস্তাফা শোবাইর বলে হাত ছোঁয়াতে পারলেও তা পুরোপুরি ঠেকাতে পারেননি। বল ক্রসবারের নিচের অংশে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। মূলত, তখনই ‘লাইফলাইন’ পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা, জেগে ওঠে মেসির বিশ্বকাপে টিকে থাকার সম্ভাবনাও।

এই গোলে প্রায় শত বছর আগের এক কীর্তি স্পর্শ করলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। চলতি আসরে তার গোল হলো আটটি। দ্বিতীয় আর্জেন্টাইন ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের এক আসরে আট গোল করলেন মেসি। ১৯৩০ সালে উদ্বোধনী আসরে এই কীর্তি গড়েন গিয়ের্মো স্তাবিলে। সেই সাথে একটি অনন্য কীর্তিও গড়েছেন রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডিঅ’র জয়ী। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে নকআউট পর্বে টানা ছয় ম্যাচে গোল করলেন মেসি। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এগিয়ে গেলেন আবার। একটি করে গোল কম কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ডের। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার মোট গোল হলো ২১টি। আর জাতীয় দলের হয়ে তার মোট গোল হলো ১২৫টি, ২০৪ ম্যাচে। বিশ্বকাপে এই নিয়ে টানা ৯ ম্যাচে গোল করলেন মেসি। ছয় ম্যাচের বেশি নেই আর কারো। তবে ম্যাচের এই শেষ সময়ে নিজের কীর্তি চাইতে দলের প্রয়োজনটাই যে তার কাছে বড় সেটি না বললেও চলে। ‘জীবন’ পেয়ে মেসিও নেমে পড়লেন সেই মিশনে।

আক্রমণের ধার বাড়ালেন। একের পর এক পাসে অবদান রাখতে লাগলেন সতীর্থদের দিয়েও গোল করানোর চেষ্টায়। অবশেষে এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। শেষ বাঁধি বজাতে আর খুব একটা বাকি নেই। রেফারি জানিয়ে দিয়েছেন ‘অক্সিজেন’ (পড়–ন ম্যাচের সময়) আছে আর মাত্র ৭ মিনিট। যোগ করা সেই সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের ক্রসে এনজো ফার্নান্দেজের হেড করে দেয় বাকি কাজটা। ৩-২ গোলে জিতে আর্জেন্টিনা উঠে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে, মেসিও বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকলেন আরও কিছুটা সময়। অন্তত ৪৮ দলের এই উত্তার আমেরিকার বিশ^কাপের শেষ আটের লড়াই পর্যন্ত। যেখানে মেসিদের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড-কলম্বিয়া ম্যাচের জয়ী দল। এতক্ষণে নিশ্চয়ই জেনেও গেছেন সেটি কারা।

জয়টা যে কতটা কাক্সিক্ষত হয়ে উঠেছিল, কতটা দুরূহ পথ পাড়ি দিয়ে মিলল, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে শেষ বাঁশি বাজার পর। কান্নায় ভেঙে পড়েন মেসি, যে কান্না তার থামছিলই না। দুই চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছিল পানি। যে কান্না আনন্দের! ডাগআউটে কোচ লিওনেল স্কালোনির চোখ দিয়েও ঝরল আনন্দাশ্রু। ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে এই স্কালোনি বলেছিলেন, ম্যাচ নিজেদের পক্ষে না থাকলেও শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার দৃঢ়তা ও মানসিকতা তার দলের আছে। কোচের কথাকে সত্যি প্রমাণ করে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে আর্জেন্টিনা। এর আগে বিশ্বকাপ ইতিহাসে কখনোই দুই গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচ জিতে ফিরতে পারেনি আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে নিজেদের ইতিহাসটা তাই নতুন করেই লিখতে হতো আকাশী-সাদাদের। এই মেসিরা তো ইতিহাস নতুন করে লিখেই অভ্যস্ত!

ক্যাপশন : ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২ গোলে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পথ ছিল মাত্র কয়েক মিনিট দূরে। এরপরই দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন, সেটিও জাদুকর লিওনেল মেসির হাত ধরেই। তাকে আকাশে তুলে রাখতে চাইবেই আর্জেন্টিনা! গতকাল আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে -এক্স