নিজস্ব প্রতিবেদক : গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার হাজারো কৃষকের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী টরকী-বাশাইল খাল আজ অস্তিত্ব সংকটে। দীর্ঘদিন পুনঃখনন না হওয়া, নাব্যতা হ্রাস, অবৈধ দখল ও দূষণের কারণে একসময়ের খরস্রোতা এই খাল এখন মৃতপ্রায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দরের পালরদী নদীসংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু হয়ে ধানডোবা, রাজাপুর, সাদ্দাম বাজার, মোক্তার বাজার ও চেঙ্গুটিয়া গ্রাম অতিক্রম করে খালটি আগৈলঝাড়া উপজেলার বাশাইল বাজারের প্রধান খালের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এটি ‘টরকী-বাশাইল খাল’ নামে পরিচিত। যুগ যুগ ধরে এ খালের পানির ওপর নির্ভর করেই কৃষিকাজ করে আসছেন দুই উপজেলার হাজারো কৃষক।
আগৈলঝাড়া শাখার পরিবেশকর্মী সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম রুবেল বলেন, নদী ও খালের নাব্যতা কমে যাওয়ায় পালরদী নদী থেকে টরকী-বাশাইল খালে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণ, অপরিকল্পিত সেতু, খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, সংস্কারের অভাবে খালটি ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে খালটি প্রায় শুকিয়ে যায়। ফলে বোরো মৌসুমে ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে সেচ দিতে কৃষকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
বর্তমানে পালরদী নদী থেকে পাম্পের মাধ্যমে পানি তুলে খালে সরবরাহ করা হয়। কয়েক ধাপ মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘুরে সেই পানি কৃষকের জমিতে পৌঁছায়। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি ২০ শতক জমিতে সেচের জন্য চার শতক জমির সমপরিমাণ ধান দিতে হয়। ফলে অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে পান চাষ কিংবা মাছের ঘেরের দিকে ঝুঁকছেন। প্রতি বছর বাড়ছে অনাবাদি জমির পরিমাণ।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, একসময় টরকী-বাশাইল খালে শতাধিক প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে খালটি প্রায় স্রোতহীন হয়ে পড়ায় মাছের প্রজনন ও আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে। স্থির পানিতে মশা ও বিভিন্ন রোগজীবাণুর বিস্তারও বাড়ছে।
সাবেক ইউপি সদস্য ছাদেল আলী সরদার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একসময় এই খাল এতটাই গভীর ও স্রোতস্বিনী ছিল যে সাঁতরে পার হওয়া কঠিন ছিল। এখন পানির অভাবে মানুষ হেঁটেই খাল পার হতে পারে।
তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত খাল পুনঃখননের কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন বলেন, নদী ও খালের নাব্যতা কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং জনগুরুত্বপূর্ণ খালগুলো পুনঃখননের জন্য দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশিষ্ট সমাজসেবক  এইচ.এম.তারিকুল ইসলাম কাফী বলেন, “টরকী-বাশাইল খাল দ্রুত পুনঃখনন ও দখলমুক্ত করা না হলে এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর আরও মারাত্মক প্রভাব পড়বে। খালটি শুধু একটি জলধারা নয়, এটি দুই উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একসময়ের প্রাণবন্ত এই খাল আজ মৃত্যুর প্রহর গুনছে। দ্রুত পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টরকী-বাশাইল খালকে ফিরিয়ে আনার দাবি এখন দুই উপজেলার হাজারো মানুষের।