
নিজস্ব প্রতিবেদক : বিকেলের রোদ যখন ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসে, আছরাঙ্গা দিঘির পাড়ে তখন নিঃশব্দে বয়ে যায় মাতাল হাওয়া। তাতে ভেসে বেড়ায় মিঠে গন্ধ। কোথাও চুলায় জ্বলছে নতুন গুড়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছগুলো তখন পথচারীকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
জয়পুরহাটের ক্ষেতলালকে অনেকেই বলেন তালের রাজ্য। তবে এই রাজ্যের আসল মহিমা বুঝতে হলে কাছ থেকে দেখতে হয় মানুষ ও প্রকৃতির গল্পে। সেই গল্পের নায়ক এখানে গাছিরা। ভোরের আবছা অন্ধকার ভেদ করে তারা যখন তাল গাছের সঙ্গে বাঁধা বাঁশ বেয়ে ওপরে ওঠেন, মনে হয় গাছের সিঁড়ি বেয়ে আকাশে উঠছেন।
রসুলপুর গ্রামের মোজাম সরদার এমন গল্পের একজন নায়ক। হাতে দড়ি, কোমরে হাঁড়ি—তালগাছের সঙ্গে যেন তার অদৃশ্য বন্ধন। কণ্ঠে জীবনের সরল সত্য, ‘এই রসই আমার সংসারের হাসি-কান্না’।
প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি গাছ থেকে রস নামান তিনি। বিকেলে সড়কের পাশে বসার কিছুক্ষণের মধ্যে সেই রস উধাও। তিনি জানান, অবিক্রিত রসও এখানে অপচয় হয় না। তা জ্বলে ওঠে চুলার আগুনে, হয়ে যায় গুড়। তখন গুড়ের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে।
গাছ থেকে নামিয়ে আনা রসের টানে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসে। বগুড়া থেকে আসা নাজমুল হোসেনের চোখে এই স্বাদ শুধু পানীয় নয়, যেন হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্পর্শ। এখানে এলে মনে হয় প্রকৃতি নিজ হাতে আমাকে কিছু খাওয়াচ্ছে।
তালগাছগুলো শুধু রসের আধার নয়, এই জনপদের নীরব রক্ষকও। বজ্রপাতের সময় বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, যেন আকাশের ক্রোধ নিজের বুকে নিয়ে মানুষকে আড়াল করে।
ক্ষেতলাল উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ কুমার জানান, এই গাছ এখন কৃষকের আয়ের নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। তিন মাসেই এনে দেয় এক থেকে দেড় লাখ টাকার পুঁজি।
স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও তালের রস অনন্য নিয়ামত। ইন্টারনেট থেকে জানা যায়, এই রস শরীরের জন্য প্রাকৃতিক টনিকের মতো কাজ করে। এতে থাকা ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস হাঁড়কে মজবুত করে। এর শীতলতা ক্লান্ত শরীরে এনে দেয় প্রশান্তি, যেন দিনের শেষে মায়ের স্নেহমাখা ছোঁয়া।
ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টি এস ও আলী শাহ একটু সতর্ক করে বলেন, এই রস খুব সাবধনে খেতে হবে। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। টাটকা না খেয়ে ফুটিয়ে খাওয়াই ভালো।
ক্ষেতলালের পথে পথে এক পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়। তালগাছের ছায়ায় বসে গাছিরা রস বিক্রি করছেন, আর পথচারীরা থেমে এক গ্লাস রস হাতে নিচ্ছেন। প্রথম চুমুকেই হারিয়ে ঘামঝরা শরীরের ক্লান্তি।
Reporter Name 









