ঢাকা ১২:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

থমকে আছে পটুয়াখালীর আলোচিত সাপের খামার

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:১৬:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • ২৭ Time View
৫২

নিজস্ব প্রতিবেদক : পটুয়াখালীতে একটি নিবন্ধিত সাপের খামারে নিয়মিত ভেনম (সাপের বিষ) সংগ্রহের সক্ষমতা গড়ে উঠলেও দীর্ঘ ২৬ বছরেও বাজারজাত ও শিল্পে ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগ কার্যত থমকে আছে। খামার কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ পাওয়া গেলে  দেশীয় ভেনম ব্যবহার করে ভবিষ্যতে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

প্রসঙ্গত : বাংলাদেশে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এখনো মূলত বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস প্রায় ২৬ বছর ধরে বিষধর সাপ সংরক্ষণ, উদ্ধার, প্রজনন ও ভেনম সংগ্রহের কাজ করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ খামারটি সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেয়েছে। এর মাধ্যমে বৈধভাবে সাপ পালন ও ভেনম সংগ্রহের অনুমোদন মিললেও উৎপাদিত ভেনম বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি। বর্তমানে খামারটিতে কিং কোবরা, রাসেলস ভাইপার, কেউটে, সাদা গোখরা, পদ্ম গোখরা, পাইথন, পঙ্খীরাজ, দাঁড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির আড়াই শতাধিক সাপ রয়েছে। নিরাপদ পরিবেশে এসব সাপ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার পাশাপাশি নিয়মিত ভেনম সংগ্রহ করা হচ্ছে।

খামারের উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, প্রবাসজীবন শেষে ২০০০ সালে সীমিত পরিসরে সাপ পালন শুরু করেন তিনি। পরে লোকালয়ে চলে আসা কিংবা আহত সাপ উদ্ধার করে সংরক্ষণের মাধ্যমে খামারটি ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমোদনের জন্য চেষ্টা চালানোর পর অবশেষে নিবন্ধন মিলেছে। তবে বিষাদ কন্ঠে বলেন,  এ অনুমোদনের পিছনে দীর্ঘ বছর ব্যয় এবং বিভিন্ন সময় একেক অফিস ঘুরতে ঘুরতে আর্থিক অপচয় করার পর নিজ সন্তান বাবা মা হারিয়ে আজ তিনি নিঃস্ব।

তাঁর ভাষ্য, খামার গড়ে তোলা ও পরিচালনায় এখন পর্যন্ত এক কোটির বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে। সাপের খাবার, পরিচর্যা, নিরাপত্তা ও কর্মীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্য অর্থ প্রয়োজন হয়। ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করেও খামারটি চালিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু সরকারি নিবন্ধন পাওয়ার পরও আর্থিক কিংবা কারিগরি সহায়তা না থাকায় কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, তাঁদের খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড ভেনম সংগ্রহের সক্ষমতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য কয়েক কোটি টাকা হলেও কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করার পরই তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহারযোগ্য হয়। তিনি দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

খামারের কর্মী হৃদয় বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত বেতন পাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে সীমিত আয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, দেশের মানুষের চিকিৎসা সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এই সাপের খামারটি। এমন একটি উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা।

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, সাপের বিষ সংগ্রহের সক্ষমতা তৈরি হলেও অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের জন্য নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পরই ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, দেশে উৎপাদিত ভেনম ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনমের কাঁচামাল নিশ্চিত করা গেলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসা আরও সহজ হবে। তবে এ ধরনের খামার পরিচালনায় জৈব নিরাপত্তা, প্রাণিকল্যাণ, প্রশিক্ষিত জনবল ও সরকারি তদারকি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধ শিল্পের সমন্বিত উদ্যোগ এ খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

জলাবদ্ধতা নিরসন, রাস্তা সংস্কার, দান-অনুদানে প্রশংসায় ভাসছে যুবনেতা আতিক ওসমানী 

থমকে আছে পটুয়াখালীর আলোচিত সাপের খামার

Update Time : ০৪:১৬:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
৫২

নিজস্ব প্রতিবেদক : পটুয়াখালীতে একটি নিবন্ধিত সাপের খামারে নিয়মিত ভেনম (সাপের বিষ) সংগ্রহের সক্ষমতা গড়ে উঠলেও দীর্ঘ ২৬ বছরেও বাজারজাত ও শিল্পে ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগ কার্যত থমকে আছে। খামার কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ পাওয়া গেলে  দেশীয় ভেনম ব্যবহার করে ভবিষ্যতে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

প্রসঙ্গত : বাংলাদেশে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এখনো মূলত বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস প্রায় ২৬ বছর ধরে বিষধর সাপ সংরক্ষণ, উদ্ধার, প্রজনন ও ভেনম সংগ্রহের কাজ করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ খামারটি সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেয়েছে। এর মাধ্যমে বৈধভাবে সাপ পালন ও ভেনম সংগ্রহের অনুমোদন মিললেও উৎপাদিত ভেনম বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি। বর্তমানে খামারটিতে কিং কোবরা, রাসেলস ভাইপার, কেউটে, সাদা গোখরা, পদ্ম গোখরা, পাইথন, পঙ্খীরাজ, দাঁড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির আড়াই শতাধিক সাপ রয়েছে। নিরাপদ পরিবেশে এসব সাপ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার পাশাপাশি নিয়মিত ভেনম সংগ্রহ করা হচ্ছে।

খামারের উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, প্রবাসজীবন শেষে ২০০০ সালে সীমিত পরিসরে সাপ পালন শুরু করেন তিনি। পরে লোকালয়ে চলে আসা কিংবা আহত সাপ উদ্ধার করে সংরক্ষণের মাধ্যমে খামারটি ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমোদনের জন্য চেষ্টা চালানোর পর অবশেষে নিবন্ধন মিলেছে। তবে বিষাদ কন্ঠে বলেন,  এ অনুমোদনের পিছনে দীর্ঘ বছর ব্যয় এবং বিভিন্ন সময় একেক অফিস ঘুরতে ঘুরতে আর্থিক অপচয় করার পর নিজ সন্তান বাবা মা হারিয়ে আজ তিনি নিঃস্ব।

তাঁর ভাষ্য, খামার গড়ে তোলা ও পরিচালনায় এখন পর্যন্ত এক কোটির বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে। সাপের খাবার, পরিচর্যা, নিরাপত্তা ও কর্মীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্য অর্থ প্রয়োজন হয়। ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করেও খামারটি চালিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু সরকারি নিবন্ধন পাওয়ার পরও আর্থিক কিংবা কারিগরি সহায়তা না থাকায় কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, তাঁদের খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড ভেনম সংগ্রহের সক্ষমতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য কয়েক কোটি টাকা হলেও কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করার পরই তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহারযোগ্য হয়। তিনি দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

খামারের কর্মী হৃদয় বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত বেতন পাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে সীমিত আয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, দেশের মানুষের চিকিৎসা সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এই সাপের খামারটি। এমন একটি উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা।

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, সাপের বিষ সংগ্রহের সক্ষমতা তৈরি হলেও অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের জন্য নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পরই ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, দেশে উৎপাদিত ভেনম ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনমের কাঁচামাল নিশ্চিত করা গেলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসা আরও সহজ হবে। তবে এ ধরনের খামার পরিচালনায় জৈব নিরাপত্তা, প্রাণিকল্যাণ, প্রশিক্ষিত জনবল ও সরকারি তদারকি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধ শিল্পের সমন্বিত উদ্যোগ এ খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।