জনতার কন্ঠ অনুসন্ধানী ডেস্ক : কিংবদন্তি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা চরম অস্থিরতা, লুটপাট ও দখলদারিত্ব কাটিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি ছত্রছায়ায় ডা. নাজিমুদ্দিন আহমেদ যে ‘অন্ধকার সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছিলেন, ছাত্র-জনতার অদম্য আন্দোলনে তার পতন ঘটেছে। বর্তমানে নতুন নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটিতে ফিরছে শৃঙ্খলা ও সেবার প্রকৃত পরিবেশ।
মৃত্যুর ১০ দিনেই দখলের নীল নকশা
২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর মাত্র ১০ দিনের মাথায় শুরু হয় ক্ষমতার পালাবদল। অনুসন্ধানে জানা যায়, নিজেকে একমাত্র সক্রিয় প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি দাবি করে ডা. নাজিমুদ্দিন আহমেদ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সরাসরি সমর্থনে স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে তিনি অন্য ট্রাস্টি ও পুরনো কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে ফেলেন। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গড়ে তোলা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে হটিয়ে সেখানে শুরু হয় ‘ব্যক্তিগত রাজত্ব’।
আয়ের টাকা ব্যাংকে নয়, যেত সন্ত্রাসীদের হাতে
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। ডা. নাজিমুদ্দিনের দখলে থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের আয়ের টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে জমা হওয়ার পরিবর্তে সরাসরি তাঁর পালিত সন্ত্রাসীদের হাতে যেত। এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ডা. নাজিমুদ্দিনের নিজস্ব এক ক্যাডার বাহিনী হাসপাতালের ক্যাশ কাউন্টার থেকে শুরু করে প্রতিটি বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করত। গোপন ক্যামেরা ও নিবিড় তদন্ত করলে এই আর্থিক তছরুপের শতভাগ সত্যতা পাওয়া যাবে বলে এলাকাবাসী নিশ্চিত করেছেন। সাধারণ মানুষের সেবার টাকা ব্যাংকে না গিয়ে সরাসরি পৌঁছে যেত ‘হায়েনা সিন্ডিকেট’-এর পকেটে।
অনিয়ম ও অপকর্মের পাহাড়
নাজিমুদ্দিনের আমলের অনিয়ম কেবল আর্থিক লুটপাটে সীমাবদ্ধ ছিল না বন ও পরিবেশ ধ্বংস: সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের সাজানো বন কেটে উজাড় করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের অমূল্য সম্পদ বিক্রির ষড়যন্ত্রের খবরও পাওয়া যায়।
সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য: তাঁর আশ্রয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে কিশোর গ্যাং ও বহিরাগতদের আড্ডা তৈরি হয়েছিল। প্রতিবাদ করলে সাধারণ চিকিৎসাকর্মী ও কর্মকর্তাদের শারীরিক নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হতো। এনিয়ে আশুলিয়ায় অভিযোগ করা হলেও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক ঘনিষ্ট ম্যানেজারের মাধ্যমে তা ধামাচাপা দিয়ে বিচারে বাধা দেয়া হতো।
স্বেচ্ছাচারী নিয়োগ: নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে একটি নিজস্ব ‘লুটেরা চক্র’ তৈরি করেছিলেন তিনি। যার (ডকুমেন্টস মানবসম্পদ বিভাগে সংরক্ষিত)
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও পতন
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত আগস্টে ডা. নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক এবং সাধারণ কর্মীরা একযোগে বিক্ষোভে নামেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্রয়-প্রশ্রয় হারিয়ে ডা. নাজিমুদ্দিন কোণঠাসা হয়ে পড়েন। অবশেষে ২৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আন্দোলনের মুখে তিনি ট্রাস্টি বোর্ড থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন। কিন্তু কথিত কিছু মিডিয়া তা মব বলে গণঅব্ভুথ্যানকে অপমানিত করা শুরু করেন। যা নিয়ে ইতিমধ্যে জুলােই আন্দোলনকারীরে মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
শিরিন হকের নেতৃত্বে নতুন পথচলা
অন্ধকার অধ্যায় শেষে বর্তমানে প্রখ্যাত নারী নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী শিরিন হক-এর নেতৃত্বে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠিত হয়েছে। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটিতে আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে:
১. আয়ের প্রতিটি টাকা এখন সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে জমা হচ্ছে।
২. ক্যাডারমুক্ত পরিবেশে রোগীরা আবারও কম খরচে সুচিকিৎসা পাচ্ছেন।
৩. প্রতিষ্ঠানের হারানো সম্পদ রক্ষা এবং প্রতিটি খাতের জন্য স্বচ্ছ অডিট (নিরীক্ষা) শুরু হয়েছে।
বিচারের দাবি
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ এবং এলাকাবাসীর দাবি—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডা. নাজিমুদ্দিন যে লুটপাট চালিয়েছেন, তার একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই ডা. জাফরুল্লাহর আত্মা শান্তি পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ একটা প্রশ্ন জনমনে থেকেই যায়, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পর পরই ডাঃ নাজিমউদ্দীনের পুরো গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলে নেয়ার দরকার কেন ছিলো? আর ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী জীবিত থাকাকালীন কেন সে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে যায়নি। ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কার নিয়ন্ত্রণে ছিলো তা নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে তার অন্ধকার সাম্রাজ্যের আরও লোমহর্ষ কাহিনী।
এছাড়াও একজন ট্রাষ্টি সদস্য কোন ট্রাষ্টি বোর্ডের আইনে কথিত সিইও, কথিত পরিচালক নিয়োগ প্রদান করেছেন। এবং ডাঃ নাজিমউদ্দীন আহমেদ এর স্বাক্ষরিত বেশকিছু ডকুমেন্টস রয়েছে যা আইনবহির্ভূত লঙ্ঘন। এবং তার নিয়ন্ত্রণে থাকাকালীন নতুন নিয়োগ এসব নথিপত্র পর্যালোচনা করলেই বেরিয়ে আসবে তার আসল রূপ। আমরা আসছি (৩য় পর্ব নিয়ে) অনুসন্ধান চলমান।